• অর্থনীতির মূলস্রোতে অপ্রদর্শিত আয় বা কালোটাকা

    পান্না কুমার রায় রজত | ১৪ জুলাই ২০২১ | ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

    অর্থনীতির মূলস্রোতে অপ্রদর্শিত আয় বা কালোটাকা
    apps

    নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, সভ্যতার গোড়া থেকেই সাদা ও কালোটাকা পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলেছে, যা পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি রয়েছে একটি সীমারেখার মধ্যে। যেমন-পশ্চিমা বিশ্বে, মধ্যম আয়ের দেশ লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে, যেখানে অফশোর হিসাব বলে একটি কার্যক্রম প্রচলিত আছে। যেখানে বিশেষায়িত অঞ্চলে কালোটাকা বিনিয়োগ করলে কোনো প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয় না, যা অর্থনীতিতে একটি বৃহৎ অংশ দখল করে রয়েছে। প্রতিবছরের মতো২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। কালোটাকা সাদা করার নৈতিকতা এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। কোভিড-১৯ অতিমহামারীতে সরকারের ব্যয় চাহিদা বেড়ে গেছে।

    এই কারণে রাজস্ব আহরণের বৃদ্ধি ও প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। অপ্রদর্শিত আয় মূলধারায় নিয়ে আসার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে কর সুবিধার মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার সুবিধা দিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করবে। অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা যতদিন প্রদর্শিত না হবে, ততদিন অর্থনীতি মূলধারার গতি স্তিমিত হবে।
    অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণাপত্র Underground Economy of Bangladesh an Econometric analysis অনুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশের অর্থনীতিতে ৬২.৭৫ শতাংশ কালোটাকা ছিল। যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০১৪-১৫ সালের জাতীয় বাজেটের দ্বিগুণেরও বেশি।কালোটাকা বা কর-বহির্ভূত আয় হচ্ছে কোনো ব্যক্তি যখন আয়কর দিতে গিয়ে কোনো আয়জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে অন্তর্ভুক্ত করেন না, তখনই তা কর-বহির্ভূত আয় হয়। আয় কালো নয়, কিন্তু সেই আয়ের ওপর কর দেয়া হয়নি। নিয়ম মতো এটি কর-বহির্ভূত আয়।

    Progoti-Insurance-AAA.jpg

    জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসে প্রায় ১৮ হাজার ২২০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন ৭ হাজার ৪৪৫ জন করদাতা। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবংঅতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে সদ্য সমাপ্ত ২০২০-২০২১ অর্থবছরের ২০ হাজার ৬০০ কোটি অপ্রদর্শিত বা কালোটাকা সাদা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার করদাতা এই টাকা সাদা করেছেন। সব মিলিয়ে সরকার কর পেয়েছে ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। কালোটাকা সাদা করার তালিকায় আছেন চিকিৎসক, সরকারি চাকরিজীবী, তৈরি পোশাক রফতানিকারক, ব্যাংকের উদ্যোক্তা মালিক, স্বর্র্ণ ব্যবসায়ীসহ অনেকে। তবে ধনীরাই বেশি টাকা সাদা করেছেন।

    অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষই কালোটাকা সাদা করেছেন।২০২০-২১ অর্থবছরের যে পরিমাণ কালোটাকা সাদা হয়েছে, তার মধ্যে পুঁজিবাজারে ২৮২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও আবাসন খাতে ২ হাজার ৫১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা সাদা হয়েছে।


    তথ্য অনুসারে, ১৯৭১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অপ্রকাশিত আয়ের প্রায় ৩০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে,যা থেকে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে। করোনার কারণে বিদেশের সাথে সংযোগ সেভাবে হয়নি বা ব্যাহত হয়েছে। সে কারণে এ টাকাগুলো দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় বা অপ্রদর্শিত রাখা সম্ভব হয়নি অনেকের পক্ষে।

    তারাই দেশে বিশেষ সুবিধা নিয়ে টাক গুলো সাদা করার সুযোগ নিয়েছে।
    করোনাকালে শিল্পে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, বরং ভোগ চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো টিকে থাকতে কর্মী ছাঁটাই করছে। এ অবস্থায় শিল্পের চাকা সচল রাখতে ও কর্মসংস্থান বাড়াতে উৎপাদনশীল খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দেয়া হয়েছে। নতুন ধারা (১৯) অনুযায়ী, দেশের সব স্থানে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে। এজন্য ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। এ সুযোগ ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এ পদ্ধতিতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্য কোনো সংস্থা প্রশ্ন করবে না। ১০ শতাংশ কর দিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ায় তা বিশেষ সুবিধা বলা হচ্ছে।

    যদিও ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকেই ১০ শতাংশ কর দিয়ে ১৯ (ডিডি) শিল্পে অপ্রদর্শিত অর্র্থ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে সেটি শুধু হাইটেক পার্ক বা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ সুবিধা ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। ১ জুলাই ২০২১ সাল থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত করের অতিরিক্ত ৫ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে। এ জন্য বিদ্যমান ধারাটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ কর ২৫ শতাংশের সঙ্গে আরো ৫ শতাংশ হারে কর দিয়ে টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা যাবে। ১ দশমিক ২৫ শতাংশসহ মোট ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কর দিয়ে টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা যাবে। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত শেয়ার, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটসহ পুঁজিবাজারের বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্টে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ কর এবং মোট করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানা গুনতে হবে। অন্যদিকে ২৫ শতাংশ কর এবং করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানা দিয়ে নগদ টাকা, ব্যাংক ডিপোজিট ও সেভিংস ডিপোজিট, সেভিং ইনস্ট্রুমেন্ট, সব ধরনের ডিপোজিট ও সেভিং সার্টিফিকেট (সঞ্চয়পত্র) বৈধ প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা যাবে। এছাড়া জায়গা অনুপাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ও জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত জমি, অ্যাপার্টমেন্ট প্রশ্নাতীতভাবে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

    বাংলাদেশে কালোটাকা একটি অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা। আইএমএফ-এর ‘Shadow Economics around the world, what did we learn over the last 20 years ’ শীর্ষক ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি দলিল মতে, বাংলাদেশে কালোটাকা বা শ্যাডো ইকোনোমির আকার হচ্ছে দেশটির মোট জিডিপির ২৭.৬০ শতাংশ।কালোটাকার কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। সাধারণত কালোটাকা বলতে বুঝি হিসাবের খাতায় উল্লেখ না করে অর্জিত অর্থকে। যেমন একজন মালিক একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করলেন এক কোটি টাকায়। তিনি চেকের মাধ্যমে পেলেন ৬০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৪০ লাখ টাকা পেলেন নগদে। এই ৪০ লাখ টাকা যদি তিনি প্রাপ্তির খাতে না প্রদর্শন করেন। তবে ওই ৪০ লাখ টাকা হয়ে যাবে কালোটাকা বা আন-রেকর্ডেড মানি।

    অধ্যাপক ফ্রিডরিখ স্নেইডার তার-‘Shadow Economics allover the world new estimates for 162 countries from  (১৯৯৯-২০০৭)’ শীর্ষক সমীক্ষায় উল্লেখ করেন, কর প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে শ্যাডো মানি বা ব্ল্যাক মানি বিভিন্ন দেশে বেড়ে চলেছে। যে কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে চলে যেতে পারছে।

    অপ্রদর্শিত আয় কীভাবে তৈরি হয় এমন প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনে জাগ্রত। বাংলাদেশে পেশাজীবীদের আয় যেমন- চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থাপত্যবিদ, শিক্ষক, এনজিও খাত কিংবা অনেক পেশায় চাকরির বাইরেও পেশাগত চর্চার মাধ্যমে অর্থ আয় করেন বা সুযোগ আছে। যেমন- চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, শিক্ষকরা বিশেষ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ান, প্রকৌশলী বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী নকশা ও কাজ তদারকি করেন। এখন কোনো চিকিৎসক, শিক্ষক বা প্রকৌশলী যদি এ থেকে পাওয়া অর্থ আয়কর রিটার্নে না দেখান তাহলে সেটি কালোটাকায় পরিণত হয়। সেবাখাত, ক্রয়খাতে যেমন নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা এগুলো বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি মাদক বিক্রি করে বা অস্ত্র বিক্রি করে অর্থ আয় করে, তবে সেটি কালোটাকা আয়কর বিবরণীতে দেখানোর সুযোগ নেই। তারপর ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়, প্রতিদিন দোকানে যে বিক্রি হয় এবং যে পরিমাণ লাভ হয়, তার পুরোটা তারা প্রদর্শন করে না বলে অনেক টাকা অপ্রদর্শিত থেকে যায়। একেও কালোটাকা বলা হয়।

    অপ্রদর্শিত আয় বা কালোটাকা মূলধারার অর্থনীতিতে নিয়ে আসার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ কর সুবিধার মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার সুবিধার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বাকালোটাকা সাদা করার সুবিধা দেয়া হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করবে বলে আমি মনে করি।

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৪ জুলাই ২০২১

    bankbimaarthonity.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    অফশোর ব্যাংকিং ও বাংলাদেশ

    ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১

    Archive Calendar

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি