রবিবার ১৬ জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ২ আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ইন্স্যুরেন্সে বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণে এএসএ মুইজ

ইন্স্যুরেন্সের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আলাদা দরদ ছিল

বিবিএনিউজ.নেট   |   সোমবার, ২২ জুন ২০২০   |   প্রিন্ট   |   677 বার পঠিত

ইন্স্যুরেন্সের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আলাদা দরদ ছিল

প্রবীণ বীমাবিদ গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র কনসালট্যান্ট এ.এস.এ মুইজ (সুজন) কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকায় ‘ইন্স্যুরেন্সে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। শুরুতেই বলছিলেন, অত বড়মাপের মানুষ সম্পর্কে বলা… একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাকে আগে থেকেই একটু একটু চিনতেন। সেসময় আমাদের বাসা ছিল কাছাকাছি। আমরা থাকতাম ধানমন্ডির ২৮ নম্বরে আর তিনি ৩২ নম্বরে। গ্রেট ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স অফিসে বঙ্গবন্ধুর কাছে অনেক লোকজন আসতেন। তার পিএ (ব্যক্তিগত সহকারী) ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, ভেরি গুড স্টাফ। তখন আমি প্রবেশনারি অফিসার। ভাগ্যগুণে বঙ্গবন্ধুর পাশে ছোট্ট একটা রুমে বসতাম। তিনি আমাকে ভীষণ আদর করতেন এবং ‘ছোকরা’ বলে ডাকতেন। পিতৃস্নেহে ভালোবাসতেন। এই হলো শেখ সাহেব, আমাদের বঙ্গবন্ধু। তার সাথে দেখা করতে কোনো ফরমালিটিজ লাগতো না। তিনি ছিলেন জনগণের প্রতিনিধি। তার ছিল গ্রেটনেস ও দুর্দান্ত সাহস, এজন্যই তিনি জাতির পিতা।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ই মার্চ ভাষণ দিয়ে বাড়িতে গেলেন। তারপরও দেখা হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর আগে পাকিস্তানি আর্মি আসতে পারে জেনে আর্মিদের পথ রোধ করতে আমরা বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে রাখি। তখন তো আমরা উদ্যম-চঞ্চল। পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে বলল, ‘তুমি এদেশ ছেড়ে চলে যাও।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা সবাই চলে যাও।’ ২৫শে মার্চের পরে তার সাথে আমার আর দেখা হয়নি।
স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু, ড. কামাল হোসেন এবং গোলাম মওলা- এই তিনজন একসাথে দেশে ফেরেন। দেশ স্বাধীন হবার পর আবার আমাদের দেখা। তখন আমার মুখে দাড়ি ছিল; মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রেখেছিলাম;দেশ স্বাধীন হলে কাটবো। আমাকে দেখে বঙ্গবন্ধু বললেন, আরে তুই তো দেখছি জাসদের হাইজাকার হয়ে গেছিস! খুব মজা করতেন। ছোট-বড়- সমতুল্য সবাইকে সমান আদর করতেন, ছিলেন একস্ট্রা অর্ডিনারি। কোনো আবদার নিয়ে গেলে বলতেন, ‘তোদের জন্য আমি স্ট্রিক্ট থাকতে পারি না’। তোরা তদবির করছ আর আমাকে তা সমাধা করতে হয়। দেশ স্বাধীনের পর আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক আরো গভীর হয়। শেখ কামালের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ৯ মাসের ভাতা নিয়ে তার কাছে গেলেন রফিকুল ইসলাম, শামসুল আলম ও গোলাম মওলা। সাথে আমিও ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সাথে গোলাম মওলার বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আরে মোটকা আমার এই দুর্দিনে তুই এই টাকাটা দিলি, এটা আমার খুবই কাজে লাগবে। ইন্স্যুরেন্সের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আলাদা দরদ ছিল।

গোলাম মওলা সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফকে বঙ্গবন্ধুর এপিএস করে নিতে চাইলে পিএস টু প্রাইম মিনিস্টার নূরুল ইসলাম অনুর কাছে জানতে চাইলে তিনি দুষ্টুমী করে বললেন, আমরা যারা পিএস-সরকারি অফিসার আর এপিএস হিসেবে যাকে খুশি নিতে পারেন। পরবর্তীতে নূরুল ইসলাম অনু ইকোনোমিক কাউন্সিলর হয়ে ওয়াশিংটনে চলে যান, তিনি সিএসপি অফিসার অবস্থায় মারা গেছেন। শেখ সাহেব এখানেই শেষ নয়। বললেন, স্যারকে ডাকো। স্যার ছিলেন প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি টু প্রাইম মিনিস্টার রুহুল কুদ্দুস। বঙ্গবন্ধু বললেন, এ-রকম একটা ছেলে নিতে চাই…রুহুল কুদ্দুস বললেন, যাকে চান নিতে পারেন। এরপর পিএস হিসেবে মোহাম্মদ হানিফের অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়; তিনি পিএস হয়ে যান। এই হলো শেখ সাহেবের বদৌলতে মেয়র হানিফের উত্থান।গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সিনিয়র কনসালট্যান্ট এ.এস.এ মুইজ (সুজন) কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকায় ‘ইন্স্যুরেন্সে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক সাক্ষাৎকার শেষে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান (ডানে) ও বার্তা সম্পাদক কামারুন নাহার ফটোসেশনে যোগ দিন

১৯৬৯ সালের কথা। তখন আমার বয়স ৩০ বছর। গ্রেট ইস্টার্নের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমানের বাসায় এক ডিনারে গেলে সেখানেই প্রথম গোলাম মওলা আমাকে দেখেন। তিনি জানতে চান এই স্মার্ট ছেলেটা কে? হাফিজুর রহমান বললেন, ও গাড়ি ছাড়া চলে না, ও তো সুন্দর গাড়ি চালাতে জানে। গোলাম মওলা আমাকে তার অফিসে যেতে বললেন। হাফিজুর রহমান বললেন, আপনার অফিসে গিয়ে ও কি করবে। গোলাম মওলা আমার উদ্দেশে বললেন, এসো একবার। এরপর আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কোনো চাকরির জন্য অন্য কোথাও অ্যাপ্লাই করতে হয়নি। মতিঝিলের হাদি ম্যানশনে আমাদের অফিস ছিল। ডন পত্রিকা বিল্ডিংয়ের বিপরীতে। এমডি ছিলেন গোলাম মওলা। জেনারেল সেক্টরের এমডি। সারা কোম্পানির এমডি যিনি গ্রেট ইস্টার্নের মালিক এবং প্রতিষ্ঠাতা। আবদুস সামাদ জেনারেল ম্যানেজার সবসময়, যিনি বিজিআইসির প্রতিষ্ঠাতা। জেনারেল সেক্টরে জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন হারুন-অর রশিদ। তিনি চলে গেলেন পিআইসিতে। জয়েন করলেন সেখানে শামসুল আলম।

গ্রেট ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের অ্যাডভাইজর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এর আগে তিনি আলফা ইন্স্যুরেন্সে চাকরি করেছেন। চাকরির অভিজ্ঞতায় তিনি অ্যাডভাইজর হয়েছেন। ১৯৬৯ সালের কথা। তিনি কোম্পানির জন্য ব্যবসা আনতেন, ফোন করলে ব্যবসা দিতেন। ইন্ডাস্ট্রিকে তিনি ব্যবসা দিতে বলতেন। কেউ দিত ভয়ে, কেউ দিত খাতিরে। তখন আমি তরুণ বয়সের, টাইগার ম্যানশনে একবার আমাকে পাঠিয়েছিলেন। সাদা একটা গাড়িতে করে তিনি সকালে অফিসে আসতেন, চলে যেতেন দুপুরে। মানুষের সাথে সম্পর্ক রেখে ইন্স্যুরেন্সে কাজ করাই ছিল তার ক্যারিশমা। তিনি কারো নাম ভুলে যেতেন না, এমনকি ফোন নম্বর কম্পিউটারের মতো মনে রাখতেন। পাবলিক রিলেশনে তিনি ছিলেন এক্সট্রা অর্ডিনারি। বঙ্গবন্ধুর নামটা লাগালেই সেটা বড় হয়ে যায়। এই ইমেজকে কাজে লাগিয়েছে, ফিন্যান্সিয়াল বেনিফিট দিয়েছে। পাকিস্তানি ইউসুফ হারুন ছিলেন তার গুড ফ্রেন্ড। ইন্স্যুরেন্সে বঙ্গবন্ধুর নামটা বিক্রি হয়েছে। ইন্স্যুরেন্সের স্বার্থে, সম্মানের স্বার্থে তাকে রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না, অভাব- অনটন ছিল বেশি। টাকা-পয়সার গুরুত্ব দিতেন না। আল্লাহ্ চালিয়ে নেবেন এই অগাধ বিশ্বাসে তিনি চলতেন। তিনি জেলে গেছেন, জেল থেকে বের হয়ে আসছেন। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বউ-বাচ্চা থেকে দূরে থেকেছেন। জীবনের অর্ধেকটা বয়স তিনি জেলে কাটিয়েছেন।
তখন খোদা বক্স ইন্স্যুরেন্সের নামকরা একজন। পাকিস্তান থেকে আসতেন, খবরটা ধুমধাম পত্রিকায় ছাপা হতো। বাসা ছিল ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডে। এক ডিনার দেন, শেখ সাহেব এলেন, চলে গেলেন। এও আরেক স্মৃতি।

এমডি করলেন গোলাম মওলাকে। সাফাত আহমেদকে লাইফে দিয়ে আবদুস সামাদকে বললেন, তুমি একাডেমি বানাও। ১৯৭৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন দেশের প্রথম এবং একমাত্র রাষ্ট্রীয় বীমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমি’। নলেজ ইজ পাওয়ার। অথচ আমাদের মধ্যে নলেজের বড় অভাব। নলেজকে কাজে খাটাতে হবে, ট্যালেন্টকে কাজে লাগাতে হবে। তার (সুজনের) মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সাথে নাসির এ চৌধুরীর পরিচয়। স্বতঃস্ফূর্ত মনে হাসি হাসি মুখে অনর্গল বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে যাচ্ছিলেন মুইজ। বললেন, ওনার মেয়েরও আছে এক্সট্রা অর্ডিনারি অনেক কিছু।

বুদ্ধিদীপ্ত বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। ঘনিষ্ঠ ব্যারিস্টারদের কাউকে ডাকতেন, এই হাফ ব্যারিস্টার। আবার রিলিফের সময় টিন বেচে খেয়েছে, এমন কারো সাথে দেখা হলে বলতেন, এই রূপবান সিরাজ। এভাবে বলে তিনি বড় আনন্দ পেতেন, তাদেরকে খুশি রাখতেন, মজা করতেন। বড় মজার মানুষ ছিলেন তিনি।

হঠাৎ রিভলবিং চেয়ার ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে একটা দুর্লভ ছবি দেখালেন। যার ঘটনা এমন- ‘হঠাৎ খবর এলো, শেখ সাহেবকে পুলিশ ধরতে এসেছে। মিটিং ছেড়ে সকলে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছেন। বর্তমানে সে ছবির মানুষের মধ্যে একমাত্র বেঁচে আছেন তিনি (মুইজ)। টিস্যুতে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, জাতীয় নেতা হতে হলে যে গুণ থাকা দরকার তা তার মধ্যে ছিল। তিনি জাতির বাবা। নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা ছিল। আফসোসের সাথে বললেন , এই রাস্তাঘাট যেখানে-সেখানে তার নাম ব্যবহার করা উচিত হয়নি। তিনি অনেক বড়মাপের, রিয়েল ফাদার। সবাই স্বাধীনতা চেয়েছে, সবাই যুদ্ধ করেছে। যখন দেশ স্বাধীন হলো তখন সাত কোটি মানুষের বাস ছিল আর এখন ষোল কোটি- মিরাকেল- কেউ কোথাও থেমে নেই, না খেয়ে নেই। আমাদের মধ্যে ইউনিটি থাকলে আমরা মাথা উচুঁ করে বাঁচতে পারবো। শান্তিপূর্ণ জীবন চাই, কোটিপতি হতে চাই না। সবার জীবন সুন্দর হোক।

Facebook Comments Box
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Posted ৩:২৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২২ জুন ২০২০

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
প্রধান সম্পাদক: মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
নিউজরুম:

মোবাইল: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১

ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫, ই-মেইল: bankbima1@gmail.com

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।