শনিবার ১৮ মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

জাহাজ চুরির অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা

কেএসআরএমের কর্মকাণ্ডে দেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে ক্ষুন্ন

  |   রবিবার, ০১ আগস্ট ২০২১   |   প্রিন্ট   |   731 বার পঠিত

কেএসআরএমের কর্মকাণ্ডে দেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে ক্ষুন্ন

সরকারের প্রাপ্য ২৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকিতে জড়িত বাংলাদেশি ইস্পাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান কবির স্টিল রি-রোলিং মিল্সের (কেএসআরএম) বিরুদ্ধে এবার আরো নতুন নতুন জালিয়াতির তথ্য সামনে এসেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে চোরাই জাহাজ ক্রয় করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা চলছে। এর ফলে বিশ্ব পরিমণ্ডলে নত হয়েছে বাঙালি জাতির উন্নত শির। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরে প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত কার্যক্রম। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরেও প্রতিষ্ঠানটির নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে ভোগান্তি ও জটিলতার মুখে পড়েছে সাধারণ মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন দেশের সচেতন মহল।

জানা গেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ক্রয় করা চোরাই জাহাজটির নাম এম.টি মেডান। যা পরে এম.টি মেড নামে পরিবর্তন করা হয়। জাহাজটির আসল মালিক সিঙ্গাপুরের দায়া মেরিন (প্রা.) লিমিটেড। ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর মালয়েশিয়ার অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (রেজিস্ট্রেশন নং-এলএল ১৪৫১৪) নামের একটি সংস্থা ৮২ লাখ মার্কিন ডলারে জাহাজটি ক্রয় করতে দায়া মেরিনের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। জাহাজটি কুক দ্বীপের পতাকাতে রেজিস্ট্রেশন (নং-আইএমও ৯০০২২০৭) করা হয়।

সকল প্রক্রিয়া শেষে বিক্রয় দরের প্রথমাংশের অর্থ বাবদ ২০ লাখ মার্কিন ডলার গত বছরের ১৩ নভেম্বর দায়া মেরিনের সিঙ্গাপুরের আরএইচবি ব্যাংকের হিসাবে (হিসাব নং- ০০০০১৭৬১০২৫১২০০) প্রেরণ করে অরিন এনার্জি। এরপর ১৫ নভেম্বর মালয়েশিয়ার লিঙ্গি পোর্টে জাহাজটি হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু প্রতারণা করে দায়া মেরিন। তারা নির্ধারিত সময়ে জাহাজটি হস্তান্তর করেনি। বরং ১৬ নভেম্বর অরিন এনার্জিকে জানায়, মেরামত ও ক্রু পরিবর্তনের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় বন্দরে রয়েছে জাহাজটি। তবে এটাও যে মিথ্যা ছিল তা পরবর্তীতে জানা যায়। এরই মাঝে আফ্রিকার পোলাও গিয়ে জাহাজের নেভিগেশন সিস্টেম বন্ধ রেখে নাম পরিবর্তন করা হয়।

এদিকে জাহাজ মালয়েশিয়া না আনায় সে দেশের পুলিশের কাছে দায়া মেরিনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করে অরিন এনার্জি। পরে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে মামলাটি হস্তান্তর করা হয় (আন্তর্জাতিক মামলা নং-ড়ৎরহ/সবফধহ/২১০৫২১)। অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের পক্ষে মামলাটি করেন নির্বাহী পরিচালক ডন লয়েড। আর ওই জাহাজটি কিনে বাংলাদেশে নিয়ে আসে কেএসআরএম গ্রুপ। অবৈধভাবে জাহাজটির নাম পরিবর্তন করে কেএসআরএমকে হস্তান্তর করায় পানামার দায়ান হোল্ডিংস লিমিটেডকেও মামলায় আসামি করা হয়।

মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ২০ লাখ মার্কিন ডলার টাকা মেরে দিতে সিঙ্গাপুরের ইউএন নিবন্ধিত সংস্থা দায়া মেরিন (প্রা.) লিমিটেড ও পানামা সিটির পানামানিয়াম করপোরেশনের একটি প্রতিষ্ঠান দায়ানুয়ান হোল্ডিংস করপোরেশন এই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। তারা জাহাজটির নাম এম.টি মেডান পরিবর্তন করে এম.টি মেড করেন এবং জাল কাগজপত্র তৈরি করেন। এরপর জাহাজটি স্ক্র্যাপিংয়ের বা ভাঙার জন্য বাংলাদেশের শিল্প গ্রুপ কেএসআরএমের কাছে হস্তান্তর করে।

এদিকে জাহাজটি বাংলাদেশে আনতে সরকারের মার্কেন্টাইল মেরিন অফিসকে ভুল তথ্য দিয়ে জাহাজ ভাঙার অনাপত্তি সনদ আদায় করে কেএসআরএম। এর আগে গত ৩ জুন বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছায় এম.টি মেডান। এরপর শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৬ জুন জাহাজটিকে সমুদ্রে যাতায়াতের অনুমতি দেয় (স্মারক নং- ৩৬.০০.০০০০.০৬১.১৬.১২২.২১-৪৭৮)। পরে গত ১৯ মে ১০টি শর্তে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে জাহাজটি ভাঙার অনাপত্তি দেয়া হয়। পরে গত ২০ জুন স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য নৌ-বাণিজ্য দফতরের অনাপত্তি সনদ (এনওসি) পেতে আবেদন করা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, যেদিন অনাপত্তি সনদ পেতে আবেদন করা হয়, সেদিনই (স্মারক নং- ১৮.১৭.১৫০০.১০৫.৯৯.০০৩.২১) তা মঞ্জুর করে মার্কেন্টাইল মেরিন অফিসের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন। কোনো কিছু যাচাই না করেই অনাপত্তি দেয়ায় সে কর্মকর্তাও এই অনিয়মের জড়িত বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজের প্রয়োজনীয় সবকিছু আপডেট আছে। স্ক্র্যাপ করার মতো পরিস্থিতিও হয়নি। এরপরও জাহাজটি ভাঙার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদফতর, নৌ-বাণিজ্য দফতর থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়েছে কেএসআরএম।

তবে নৌ-অধিদফতর বলছে, জাহাজটি স্ক্র্যাপিংরে জন্য অনাপত্তিপত্র দিলেও পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়। এরপর শিপিং মাস্টারকে কেএসআরএমের প্রতারণার বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেন ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন। চিঠিতে অবৈধ জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশ করায় বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে এমনটা জানিয়ে অনাপত্তি সনদ বাতিল করতে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানা যায়। ২০ জুন জাহাজটি গ্রেফতারে আদেশ জারি করেন আদালত।

সূত্র বলছে, গত ৩০ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এম.টি মেডান জাহাজটির অবস্থান ও জাহাজটি আটক করার জন্য নৌ-পুলিশকে নির্দেশনা (স্মারক নং-৪৪৪২) দেন আদালত। একইসাথে জাহাজটির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্টের সহকারী রেজিস্ট্রার কাজী আরাফাত উদ্দিনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই নৌ-পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপার (স্মারক নং- নৌ পুঃ চঃ অঃ/অপরাধ/২০২১/১৪৭৫) চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড কুমিরা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে নির্দেশনা দেয়।

নৌ-পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আদালতের অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট পেয়ে আমরা ৯ জুলাই জাহাজটির অবস্থান নিশ্চিত হই। পরে নৌ-পুলিশের একটি টিম সীতাকুণ্ড এলাকায় কেএসআরএমের খাজা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে অভিযান চালিয়ে এম.টি মেডান জাহাজটি জব্দ করে। বর্তমানে ভাটিয়ারি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে জাহাজটিকে গ্রামপুলিশের পাহারায় রাখা হয়েছে। একইসাথে আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই জাহাজের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখতে কেএসআরএমকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে কেএসআরএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিম বলেন, আমরা যে জাহাজটি কিনেছি, সেটা এম.টি মেড; আদালতে মামলা চলছে এম.টি মেডান নিয়ে। আমাদের বিষয়ে কোনো মামলা হয়নি। তবে এম.টি মেড জাহাজটি মালিকানা বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, খারাপ উদ্দেশ্যেই দায়া মেরিন ও কেএসআরএম গ্রুপের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। এই কাজটি করায় আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

 

Facebook Comments Box
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Posted ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০১ আগস্ট ২০২১

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
প্রধান সম্পাদক: মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
নিউজরুম:

মোবাইল: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১

ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫, ই-মেইল: bankbima1@gmail.com

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।