• দেশের কস্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ: গোলাম রহমান

    | ২২ নভেম্বর ২০২১ | ৫:০১ অপরাহ্ণ

    দেশের কস্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ: গোলাম রহমান
    apps

    গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর প্রেসিডেন্ট গোলাম রহমান বলেছেন, দেশের কস্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। কোনো দেশের জন্য মানিলন্ডারিং ভালো নয়। তিনি দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন এম এ খালেক। সাক্ষাৎকারের বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো:

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : সম্প্রতি স্থানীয় বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আপত্তি উত্থাপিত হচ্ছে। আপনি ক্যাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইস্যুটিকে কিভাবে দেখছেন?

    Progoti-Insurance-AAA.jpg

    গোলাম রহমান: বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণ ব্যাখা করেছে। অবশ্য তারা জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বলেন নি তারা বলেছেন ডিজেলের মূল্য সমন্বয় নিয়ে তাদের ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যায় তারা বলেছে, বিগত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশে ডিজেল/ কেরোসিনের মূল্য অপরিবর্তিত ছিল এবং ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। এছাড়া জ¦ালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্পে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই যে সরকারি কোষাগারে ১০ হাজার কোটি টাকা জমা দেয়া হলো এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটানোর জন্য ৩৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কিভাবে এলো? আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ¦ালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল তখন তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে স্থানীয় বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য কমানো হয়নি। বেশি দামে জ¦ালানি তেল বিক্রি করার কারণেই এই বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। গত পাঁচ মাসে বিপিসি’র লোকসান হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ কোটি ৫ লাখ টাকা। তার অর্থ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য কম থাকা অবস্থায় তারা যে মুনাফা অর্জন করেছে তার তুলনায় গত পাঁচ মাসে লোকসান হয়েছে খুবই সামান্য। জ¦ালানি তেল একটি সংবেদনশীল এবং নিত্য ব্যবহার্য পণ্য। জ¦ালানি তেলের মূল্য উঠানামার উপর অনেক পণ্যের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করে। উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্যও জ¦ালানি তেলের অপরিহার্যতা রয়েছে। জ¦ালানি তেলের ব্যবসাটি সাধারণত সরকারে হাতে রাখা হয় এ কারণেই যে ব্যবসায়ীরা যাতে যখন তখন জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে গণদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে না পারে। আমরা ক্যাবের পক্ষ থেকে গত কয়েক বছর ধরেই বলে আসছি আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য কমে গেলে যে অর্থ লাভ হয় তার একটি অংশ আলাদা করে রেখে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হোক। সেই তহবিলের নামও আমরা ঠিক করে দিয়েছিলাম, ‘মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল।’ আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে এই তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে জ¦ালানি তেল আমদানি করা যেতে পারে। এটা করা হলে সরকারের কোনো লোকসান হতো না। আর ভোক্তারাও তুলনামূলক সহনীয় মূল্যে জ¦ালানি তেল ক্রয় করতে পারতো। কিন্তু আমাদের সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। বিপিসি এত বিপুল অর্থ মুনাফা করেছে জ¦ালানি তেল থেকে। এখন মূল্য বৃদ্ধির সময় সরকার জ¦ালানি তেল খাতে ভর্তুকি দিতে পারতো। বিপিসি একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মুনাফার পাশাপাশি সর্বোচ্চ জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করতে হবে। আমাদের দৃষ্টিতে বিডিসি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির তা ব্যবসায়ির উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এতে জনকল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: জ¦ালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবেশি দেশে জ¦ালানি তেলের মূল্য বেশি। তাই বাংলাদেশ থেকে জ¦ালানি তেল পাচার হবার আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্থানীয় বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই মন্তব্য সম্পর্কে আপনি কিছু বলবেন কি?
    গোলাম রহমান: কিছু মানুষ পাচার কার্যে জড়িত। সারা দেশের মানুষতো জ¦ালানি তেল পাচারের সঙ্গে যুক্ত নয়। তাহলে সারা দেশের মানুষকে কেনো দুর্ভোগে ফেলা হলো? আমি মনে করি, জ¦ালানি তেল পাচারের গল্প কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনো পণ্য পাচার হতে না পারে সে জন্য তো সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। পাচার ফেরাতে না পেরে কোনো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। জ¦ালানি তেল পাচার হবে এই আশঙ্কায় সারা দেশের মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে দেয়া তো কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা সংশ্লিষ্ট মহলের অদক্ষতাই প্রমাণ হয়।


    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : সারা বিশ^ব্যাপী মানিলন্ডারিং হচ্ছে এবং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ থেকেও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং মানিলন্ডারিং হয়। মানিলন্ডারিং আপনার দৃষ্টিতে কতটা ক্ষতিকর?

    গোলাম রহমান: মানিলন্ডারিং একটি দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ক্ষতিকর। দেশের কস্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। কোনো দেশের জন্যই মানিলন্ডারিং ভালো নয়। মানিলন্ডারিং একটি দেশের জন্য ক্ষতিকর হলেও প্রতিনিয়তই মানিলন্ডারিং হচ্ছে। কোনোভাবেই মানিলন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বরং দিন দিনই মানিলন্ডারিং বেড়ে যাচ্ছে। বিশে^ প্রতি বছর কি পরিমাণ অর্থ পাচার এবং মানিলন্ডারিং হয় তার সঠিক পরিমাণ কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। কারণ যারা মানিলন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকে তারা কখনোই তাদের টাকার পরিমাণ এবং আয়ের উৎস প্রকাশ করে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও মানিলন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচার একটি জটিল ও গুরুতর সমস্যা। কোনোভাবেই আমরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাচ্ছি না।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মানিলন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচার রোধে যে ভূমিকা রাখছে তা কি পর্যাপ্ত বলে মনে করেন?

    গোলাম রহমান: এক সময় দুদক মানিলন্ডারদের নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ ভূমিকা পালন করছিল। কিন্তু এখন দুদকের একক হাতে মানিলন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেই। আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর সবাইকে মানিলন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচার নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একাধিক প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে যুক্ত করার ফলে মানিলন্ডারিং নিয়ন্ত্রণে কিছুটা শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। গণ মাধ্যমে মুদ্রা পাচারকারী এবং মানিলন্ডারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের খুব একটা খবর আমরা দেখতে পাই না।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: আপনি যখন দুদকের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন আপনি মানিলন্ডারিং ও মুদ্রা পাচার ইস্যুটিকে কিভাবে দেখতেন?

    গোলাম রহমান: আমি যখন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলাম তখন মানিলন্ডারিং ও মুদ্রা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলন। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত আনতেও সমর্থ হয়েছিলাম।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : আপনি দুদক ত্যাগ করার আগে একটি উক্তি করেছিলেন এই বলে যে, ‘দুদক হচ্ছে নখ-দন্তবিহীন বাঘ।’ এখন কি দুদকের নখ এবং দন্ত গজিয়েছে?

    গোলাম রহমান: আমি একটি বিষয় প্রত্যক্ষ করেছিলাম যে, দুদকের মামলায় সহজে কেউ শাস্তি পায় না। বিশেষ করে যারা রাজনীতিবিদ, বিত্তবান ব্যবসায়ীদের দুদকের মামলায় খুব একটা শাস্তি হয় না। তারা বিভিন্ন ভাবে আইন প্রক্রিয়াকে ব্যবহারে করে শাস্তি পাওয়া থেকে দূরে থাকেন। তারা দিনের পর দিন মামলা ঝুঁলিয়ে রাখতে পারেন। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুদকের কার্যকারিতা তেমন একটা ছিল না। অর্থাৎ দুদক ছিল অনেকটাই অকার্যকর। মূলত এ বিষয়টি লক্ষ্য করেই আমি মন্তব্যটি করেছিলাম।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : বিদেশে অর্থ আটকের পর সেই টাকা দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে তেমন একটা সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এর কারণ কি?

    গোলাম রহমান: বিদেশে পাচারকৃত টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন। তাই চাইলেই বিদেশে পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। যে দেশে পাচারকৃত অর্থ যায় সেই দেশের আন্তরিকতার প্রয়োজন রয়েছে এ ক্ষেত্রে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না।

     

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ৫:০১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২২ নভেম্বর ২০২১

    bankbimaarthonity.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    রডের দাম বাড়ছে

    ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

    Archive Calendar

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি