• নভেল করোনাভাইরাস : ২০% রেমিট্যান্স কমবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৬ এপ্রিল ২০২০ | ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ

    নভেল করোনাভাইরাস : ২০% রেমিট্যান্স কমবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর
    apps

    নভেল করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তারে সাড়া বিশ্বে লকডাউন চলছে। এতে অর্থনীতি সংকটে পড়ায় চাকরি ও ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় জনসাধারণ। একই দশায় দিনাতিপাত করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকরাও। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য রেমিট্যান্স আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে, চলতি বছর শেষে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর রেমিট্যান্স আয় কমতে যাচ্ছে ২০ শতাংশ। ‘কভিড-১৯ ক্রাইসিস: থ্রু এ মাইগ্রেশন লেন্স’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

    প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশ থেকে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় শ্রমিকদের রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ চলতি বছর ৪৪৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণে এসে ঠেকতে পারে। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ ৫৫৪ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এসব দেশের রেমিট্যান্স আয় কমতে যাচ্ছে ২০ শতাংশ।

    Progoti-Insurance-AAA.jpg

    এ চিত্রের প্রতিফলন দেখা যাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তিন শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আয়ের ক্ষেত্রেও। বিশ্বব্যাংক বলছে ২০২০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৩ শতাংশ কমবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে চলতি বছর রেমিট্যান্স আসতে পারে ১৪ বিলিয়ন ডলার।

    নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী চলতি বছরের শুরু থেকেই অভিবাসন ও কর্মসংস্থান ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মজুরির ওপরও। স্বাস্থ্যবীমাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছেন অভিবাসী শ্রমিকরা। করোনার কারণে ভ্রমণে নিয়ন্ত্রণ আরোপের আগেই বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বিদেশ থেকে প্রচুর শ্রমিক ফেরত এসেছেন। বিদেশের কর্মস্থলে কাজে যোগ দিতে পারছেন না তারা। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের চলে যেতেও নির্দেশ দিয়েছে এরই মধ্যে।


    নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে চলতি এপ্রিলের প্রথম ১৬ দিনেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমেছে। যদিও পবিত্র রমজান মাস ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রবৃদ্ধি আসে। আর গত মার্চে রেমিট্যান্স কমেছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৯ সালের এপ্রিলে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৪৩ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে গড়ে ওই মাসের প্রথম ১৫ দিনে ৭১ কোটি ৭১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। চলতি এপ্রিলের প্রথম ১৬ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। এ হিসাবে চলতি এপ্রিলের প্রথম পক্ষেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমেছে।

    ২০১৯ সালের মার্চে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৪৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। চলতি বছরের মার্চে ১২৮ কোটি ৬৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এ হিসাবে আগের বছরের তুলনায় ২০২০ সালের মার্চে ১৭ কোটি ১৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স কম এসেছে। মার্চে রেমিট্যান্স কমেছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

    এর আগে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছিল আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। এ সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ২৪৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। সে সময় দেশে মোট রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। টাকার অংকে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার ২০৮ কোটিতে।

    বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। দেশটি থেকে গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩১১ কোটি ডলার। দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে এমন শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলো কুয়েত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ওমান, কাতার, ইতালি, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, লেবানন, জর্দান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও জাপান।

    নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের বৃহত্তম রেমিট্যান্স আয়ের উৎস প্রায় সব দেশেই লকডাউন চলছে। ওই সব দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের বড় অংশই বেকার হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় নিজেদের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের সামর্থ্যই হারিয়েছেন প্রবাসীরা।

    বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রকৃত চিত্র পূর্বাভাসের চেয়েও খারাপ হাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী এক কোটির বেশি বাংলাদেশীর অর্ধেকেরই এখন কোনো আয় নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী চাকরি করেন, এমন প্রবাসীর সংখ্যাও খুব বেশি নয়। ফলে বিদ্যমান দুর্যোগ শেষ হলেও বহু বাংলাদেশী কাজ পাবেন না। এ কারণে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি খারাপ হতে পারে।

    ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বৃহৎ অংশ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক। ওই সব দেশের অর্থনীতির ভিত্তিই হলো জ্বালানি তেল। বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে। এতে সহসাই মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এমন সম্ভাবনাও নেই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিজ নিজ দেশে টিকে থাকাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় বেকার প্রবাসীরা বাংলাদেশে ফিরে আসা শুরু হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছবে।

    রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এমন একটি অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। এতে তাদের অন্যান্য যেসব দুর্দশা রয়েছে সেগুলো আরো জটিল হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার প্রবণতা এটাই নির্দেশ করছে, যারা বিদেশে আছেন, তারাও কম আয় করছেন। হয়তো আয়ই নেই অনেকের। তাদের সঞ্চয়ও অনেক কম। আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রিজার্ভ, আমাদের আমদানি সক্ষমতা, আমাদের বিনিময় হার—এগুলোর ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স একটা বড় ভূমিকা রাখে। সেখানেও একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

    তিনি আরো বলেন, আমাদের শ্রমবাজার যে একটা স্বস্তি দিত, বছরে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ দেশের বাইরে যেত, তার ওপরও একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বোঝা যাচ্ছে। সবটা মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতির ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক- দুই দিক থেকেই দুঃসংবাদই বলব আমি। এ পরিস্থিতি থেকে উঠে আসাটা কভিডের ওপর আংশিকভাবেই নির্ভর করবে। কারণ কভিড যে একটা ফুটপ্রিন্ট রেখে যাচ্ছে, সবাই যে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা করছে, সবটা মিলিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়াটাও কঠিন হবে।

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২০

    bankbimaarthonity.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    রডের দাম বাড়ছে

    ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

    Archive Calendar

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি