নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 152 বার পঠিত
অর্থপাচার দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও আইনি সমস্যা। সরকারি হিসাবে গত ১৫ বছরে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে ৭৫ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই অর্থপাচারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ৩.৪ শতাংশ। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো-এই বিপুল পরিমাণ অর্থের ৭৫ শতাংশই পাচার হচ্ছে বাণিজ্যের মাধ্যমে, অর্থাৎ আমদানি-রপ্তানির সময় মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে এমন কৌশলী ও সুপরিকল্পিত পাচারমূলক কার্যক্রম এখন আইনের আওতার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
অর্থপাচার রোধে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে সমস্যা প্রকট থেকে যাচ্ছে। অনেক মামলাতেই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে তারা আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। অধিকন্তু, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ে বাধা সৃষ্টি করছে।
কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার নিয়ে বহুবার তদন্তের ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দেশে ফেরত আসেনি এক টাকাও। এর মধ্যেও বিদেশে বাংলাদেশিদের বাড়ি কেনা এবং সম্পদ রাখার হার অব্যাহতভাবে বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে আছে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো। বিদ্যমান আইনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অনুসন্ধান প্রক্রিয়া ও বিদেশে থাকা সম্পদ ফেরত আনার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা সীমিত থাকায় অর্থ পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব।
‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২’ অনুযায়ী, বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে কেবল ফৌজদারি মামলা করা যায়। এতে বিদেশে অবস্থানরত সম্পদ জব্দ বা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের অনুমতি নিতে হয়, যা দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই কাঠামো দ্রুত সম্পদ পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর প্রথম ধাপ হলোÑ বিদেশে থাকা সম্পত্তির মালিকানা আইনগতভাবে বাতিল করা।’’ তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, সিআইডি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে।’’
গত ১৪ জুন জারি করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৫ সালের মধ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ৩০টি অর্থপাচার মামলা সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। তবে বাস্তবে বিদেশে থাকা অর্থ উদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ এখনও শুরুই হয়নি।
পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে ফাঁস হওয়া নথি একসময় বৈশ্বিক কোটিপতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তবে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নথি ভিন্ন চিত্র দেখায়। এসব তালিকায় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আছেন আমলা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, চিকিৎসক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও।
সরকারি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৫৭০ জনের বেশি বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা সন্দেহজনক বিদেশি লেনদেন বা সম্পত্তির কারণে নজরদারিতে রয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেরই কোনও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। কেউ কেউ আবার প্রকাশ্যে নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ পরিচয়ে পরিচিত। তবু তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই স্ত্রী বা আত্মীয়দের নামে কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন।
এভাবে কানাডায় গড়ে উঠেছে কুখ্যাত ‘বেগম পাড়া’। সেখানে বহু বাংলাদেশি পরিবার অঘোষিত অর্থে বাড়ি কিনে বসবাস করছেন। সেখানকার অনেকের স্বামী দেশে উচ্চপদে চাকরিতে আছেন। কানাডায় এসব বাড়ি কেনার পেছনে দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও রিয়েল এস্টেট বোর্ড অব কানাডার তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বহু প্রভাবশালী বাংলাদেশি পরিবার টরেন্টো ও মিসিসাগায় স্থায়ীভাবে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনেছেন।
২০২৩ সালের কানাডার সংসদীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশিদের সম্পত্তি কেনার হার সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে।’ অপরদিকে, মালয়েশিয়ার ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অন্তত চার হাজার ৫০০ বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে আবাস পেয়েছেন।
পানামা, প্যারাডাইস ও অফশোর ফাঁসের ঘটনায় বহু বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেনÑ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মকর্তা। অনেকে বিলাসবহুল বাড়ি বা কোম্পানির মালিক, যা ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ, দুবাইসহ বিভিন্ন অফশোর এলাকায় নিবন্ধিত।
সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন আইন ছাড়া পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের কোনও পথ নেই। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘খসড়া আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। সময়সীমা দেওয়া যাচ্ছে না, তবে এটি সরকারের অগ্রাধিকার।’’
২০১৬ সালে দুদক ‘অফশোর কোম্পানি অনুসন্ধান সেল’ গঠন করে। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা যাচাই শুরু হলেও, বিদেশ থেকে তথ্য না আসায় তদন্ত স্থগিত হয়ে যায়।
২০২২ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে ৬৯ জনের নাম আদালতে জমা দেওয়া হলেও এখনও কারও বিরুদ্ধে চার্জশিট দায়ের হয়নি। এদিকে, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ২০১৯-২০২৩ সালে ২১০টি সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করেÑ যার বেশিরভাগই বিদেশমুখী।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ বিলম্বের কারণে অনেক সম্পদের মালিকানা আইনগতভাবে সুরক্ষিত হয়ে যাবে, ফলে তা ফেরত আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
অপরদিকে, ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সুইডেন ও স্পেনসহ ২৩টি দেশ ইতিমধ্যে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ উদ্ধার করেছে। বাংলাদেশ কবে এসব ফেরত পাবেÑ বা আদৌ পাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে পানামা পেপারস বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতে দেখা যায় বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অফশোর কোম্পানি গড়ে অর্থ পাচার করেছেন। বাংলাদেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানও এই তালিকায় ছিল। প্রথম পর্যায়ের নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশিরা পানামা, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ, বেলিজ ও সিশেলসসহ বিভিন্ন দেশে কোম্পানি খুলে অর্থ সরিয়েছেন। তালিকায় ছিলেন ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান, মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ শাহিদুল ইসলামসহ আরও কিছু প্রবাসী উদ্যোক্তা।
সেই বছরের মে মাসে দ্বিতীয় দফায় আরও কিছু বাংলাদেশির নাম আসেÑ যাদের কেউ কেউ পোশাক, নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট বা জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তালিকা প্রকাশের পরও দেশে কোনও বড় ধরনের তদন্ত শুরু হয়নি।
আলোচিত কিছু অর্থপাচার কেলেঙ্কারির চিত্র
বহুল আলোচিত বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) কেলেঙ্কারি, যেখানে তিনি এবং তার সহযোগীরা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছেন। তিনি কানাডায় পালিয়ে গেলেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে ভারতের কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে অর্থপাচার মামলা চলছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থপাচার কেলেঙ্কারি হলো ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড মামলাটি, যেখানে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (গখগ) ব্যবসার নামে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রফিকুল আমীন এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা গ্রেফতার হয়ে বিচারের সম্মুখীন হন।
এছাড়া, বাংলাদেশের বৃহত্তম এনজিও ‘ব্র্যাক’-এর সাবেক কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের অর্থপাচার মামলা আলোচিত হয়, যেখানে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের তহবিল তছরুপ করে বিদেশে সম্পদ গড়েন।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরি এবং ফিলিপাইনে পাচার করার ঘটনাটি ছিল আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং চক্রের একটি চাঞ্চল্যকর দৃষ্টান্ত। এই ঘটনায় সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরি করা হয়, যা পরে বিভিন্ন ক্যাসিনো এবং ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হয়।
বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। যেমন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্পের আওতায় অর্থপাচারের অভিযোগ, যা পরবর্তীতে তদন্তের আওতায় আসে। এছাড়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ও অর্থপাচারের তথ্য ফাঁস হয়েছে।
Posted ৪:০৩ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy