• প্রবিধান প্রণয়নের ছয় বছরেও গঠিত হয়নি জীবন বীমা গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল

    নাসির আহমাদ রাসেল | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৪:২২ অপরাহ্ণ

    প্রবিধান প্রণয়নের ছয় বছরেও গঠিত হয়নি জীবন বীমা গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল
    apps

    প্রবিধান প্রণয়নের ছয় বছরেও গঠিত হয়নি জীবন বীমা গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল। কোনো কারণে কোম্পানি দেউলিয়া হলে কিংবা আমানত ক্ষতির মুখে পড়লে ওই তহবিল থেকে গ্রাহকের বীমা দাবি বা প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেয়ার লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো লাইফ ইন্স্যুরেন্স গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল প্রবিধানমালা ২০১৬ গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। এরপর ২০২০ সালের ৪ আগস্ট প্রবিধানমালার দু’টি প্রবিধানে সংশোধন এবং নতুন একটি দফা সংযোজন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রবিধান প্রণয়নের ছয় বছরেও তহবিল গঠনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ-আইডিআরএ’র। প্রায় ছয় বছর আগের প্রণীত প্রবিধানের আলোকে তহবিল গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছে বীমা খাতের এই অভিভাবক সংস্থা। এদিকে এই তহবিল গঠনে আপত্তি জানিয়ে আসছে খোদ বীমা কোম্পানি মালিকদেরদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)। বিধিমালা প্রণয়নের পর প্রথম দিকে সাধুবাদ জানালেও এক পর্যায়ে এসে এই বিধিমালা রহিত চেয়ে আবেদন করেছে বিআইএ। ২০২১ সালের ২৭ জুন প্রবিধানটি বাতিল চেয়ে আইডিআরএ’কে দেয়া এক চিঠিতে বিআইএ জানায়, কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হলে উপর্যুক্ত বিধির আলোকে গঠিত তহবিল থেকে সাহায্য প্রাপ্ত হবে। এরূপ নিয়ম থাকলে কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিধি-বিধান অনুযায়ী ব্যয় করার প্রবণতা থাকবে না। কোম্পানিগুলো যথেচ্ছভাবে ব্যয় করবে এবং পরিণতিতে গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধ করতে পারবে না। এতে করে সুশাসিত এবং স্বচ্ছল কোম্পানিগুলো তাদের তহবিল বৃদ্ধিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং ‘ভার্চু ইজ রিওয়ার্ডেড; ভাইস পানিশড’ এই নীতির যথার্থ প্রতিফলন ঘটবে না।

    চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যাংক বিপদগ্রস্ত বা দেউলিয়া হয়ে যায় তখন সরকার ব্যাংকটির দায় দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআরআর পদ্ধতিটি প্রস্তাবিত তহবিল থেকে ভিন্নতর। সিআরআর পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে বিশেষ একটি হিসাব খুলে নির্দিষ্ট অনুপাতে অর্থ জমা রাখে। কোনো ব্যাংকের দেউলিয়াত্ব বা আপদকালীন বিপদগ্রস্ত ব্যাংকের সিআরআর-এ গচ্ছিত অর্থ হতে শুধু ওই বিপদগ্রস্ত ব্যাংককেই প্রদান করা হয়। কোনো সুশাসিত ব্যাংকের গচ্ছিত অর্থ অপশাসিত ব্যাংকের পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রস্তাবিত জীবন বীমা গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিলের মত এটি কোনো কমন ফান্ড নয়।

    Progoti-Insurance-AAA.jpg

    বিআইএ’র মতে, বীমা কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেলে সেই কোম্পানিতে সরকার কর্তৃক প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হয়। তাছাড়া শক্তিশালী বীমা কোম্পানির স্বার্থে দুর্বল কোম্পানি একীভূত করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সকল কোম্পানির অর্থ দিয়ে তহবিল গঠন করে অপশাসিত ও দুর্বল কোম্পানিকে রক্ষা করার কোনো বিধান বাস্তবসম্মত নয়। কোনো কোম্পানি সঠিকভাবে আইন কানুন মেনে চললে এবং আইডিআরএ সঠিকভাবে তদারকি করলে কোম্পানির দেউলিয়া হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কোম্পানিগুলো তাদের ইচ্ছেমতো টাকা খরচ এবং যথার্থ খাতে বিনিয়োগ না করার ফলে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে পারে না। যে সকল কোম্পানি সরকার নির্দেশিত বিধি-বিধান না মেনে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘন করে কোম্পানিকে দুর্দশাগ্রস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। সংগঠনটি বলছে, এই উপমহাদেশে বিগত একশ’ বছরের মধ্যে কোনো লাইফ বীমা কোম্পানির দেউলিয়া হওয়ার উদাহরণ নেই। অধিকন্তু আমাদের দেশের ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক খাতে প্রস্তাবিত তহবিলের আদলে কোনো বিধি-বিধান বিদ্যমান নেই। বিধায় লাইফ ইন্সুরেন্স গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল প্রবিধানমালা ২০১৬ রহিত বা সংশোধন করা প্রয়োজন।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিশেনের (বিআইএ) লাইফ টেকনিক্যাল সাব কমিটির আহ্বায়ক ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল আজিম ব্যাংক বীমা অর্থনীতিকে বলেন, গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল নিঃসন্দেহে একটি ভালো দিক, এতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে সেটি নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। এই ব্যবস্থাটি মূলত একটি ভালো কোম্পানির অর্থ দিয়ে খারাপ কোম্পানির গ্রাহকদের দেনা শোধ করা। এতে অনেক কোম্পানি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে যথাযথ ফান্ড সংরক্ষণে অবহেলা করবে। এই ব্যবস্থাটি বাদ দিয়ে বরং প্রত্যেক কেম্পানির স্ব স্ব তহবিল থাকতে পারে। যেখান থেকে তার গ্রাহকদের দেনা শোধ করা হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য সেরকম একটি ব্যবস্থা রয়েছে।


    আমি মনে করি, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকি থাকলে কোনো কোম্পানিই দেউলিয়া হওয়ার সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষকে এটি নিশ্চিত করতে হবে। তারপরও রক্ষাকবচ হিসেবে প্রত্যেক কোম্পানির গ্রাহকদের জন্য একটি তহবিল থাকতে পারে।

    এ বিষয়ে একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেছেন প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, অজিত চন্দ্র আইচ। তিনি মনে করেন, যে প্রক্রিয়ায় তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে সেটি থাকলে কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিধি-বিধান অনুযায়ী ব্যয় করার প্রবণতা থাকবে না। কোম্পানিগুলো যথেচ্ছভাবে ব্যয় করবে এবং পরিণতিতে গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধ করতে পারবে না। এতে কোম্পানিগুলো তাদের তহবিল বৃদ্ধিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। সুতরাং এটি সংশোধন করা উচিত বলে মনে করি।

    বিশিষ্ট বীমা বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের (বিআইপিডি) মহাপরিচালক কাজী মো. মোরতুজা আলী মনে করেন, গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি ফান্ড রক্ষাকবচ হিসেবে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এমন আইন করা যাবে না যেটি মানানো যাবে না। সুতরাং গ্রাহকদের আমানতের সুরক্ষার স্বার্থে অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ফান্ড গঠনের বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হবে। আমানতের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি ফান্ড গঠন করা অপরিহার্য।

    বীমা আইন ২০১০ এর ১৫৬ ধারা অনুযায়ী, জীবন বীমা গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় ২০১২ সালে ‘জীবন বীমা গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল’ গঠনের উদ্যোগ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। যার জন্য একটি প্রবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য নানা পর্যায়ে আলোচনার পর ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্স গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল’ গঠনের জন্য একটি প্রবিধানের খসড়া তৈরি করে আইডিআরএ। এরপর দফায় দফায় ভেটিং-সংশোধন শেষে ২০১৬ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত হয় প্রবিধান। ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল বহুল প্রত্যাশিত ওই প্রবিধানের খসড়া গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

    প্রবিধানের তথ্যানুযায়ী, কোনো কারণে বিদ্যমান জীবন বীমা কোম্পানি দেউলিয়া হলে কিংবা অবসায়নের ঘটনা ঘটলে জীবন বীমা গ্রাহকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তাই গ্রাহকদের সুরক্ষার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা হবে। জীবন বীমা কোম্পানির প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ওপর নির্দিষ্ট হারে ধার্য করা (লেভি) চার্জ থেকে এ নিরাপত্তা তহবিলে অর্থের জোগান দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ নিরাপত্তা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।

    চার্জ আদায় সম্পর্কে প্রবিধানে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে জীবন বীমা কোম্পানির প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ওপর চার্জের হার নির্ধারণ করবে। নির্ধারিত চার্জ পরবর্তী বছরের জুনের মধ্যে এককালীন অথবা কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে চার্জ পরিশোধের জন্য আবেদনসাপেক্ষে নির্ধারিত সময়ের পরও তিন মাস সময় পাবে জীবন বীমা কোম্পানি। তারপরও চার্জ পরিশোধ করা না হলে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে আইডিআরএ। এমনকি কোনো কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল কিংবা স্থগিত হলে নির্দেশনা কার্যকরের আগে সর্বশেষ কার্যদিবস পর্যন্ত আদায় করা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ওপর নির্ধারিত চার্জ জমা দিতে হবে। অন্যদিকে তহবিলের আকার বিবেচনায় নিয়ে চার্জ আদায়ের বিষয়টি নির্ভর করবে।

    ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া ও তহবিলের অর্থ ব্যয় সম্পর্কে প্রবিধানে আরও বলা হয়েছে, তহবিল পরিচালনা ও জীবন বীমা গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের জন্যই তহবিলের অর্থ ব্যবহƒত হবে। তবে কোনো জীবন বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা, পরিচালক কিংবা সহযোগী-অধীনস্থ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অবসায়িত কোম্পানির দায় পরিশোধে এ অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। আর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেউলিয়া বা অবসায়িত জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষতিগ্রস্ত বীমা গ্রাহকদের বীমা দাবি নিরূপিত হওয়ার পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যাবতীয় কাগজপত্রসহ নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনের পরবর্তী এক বছরের মধ্যেই দাবি পরিশোধ করা হবে।

    প্রবিধানের তথ্যানুযায়ী, আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে ছয় সদস্যের ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্স গ্রাহক নিরাপত্তা তহবিল’ পরিচালনা কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিতে সরকার মনোনীত একজন কর্মকর্তা ও জীবন বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সদস্য হিসেবে থাকবেন। এছাড়া বীমা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বিআইএ’র দুজন ও ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট থাকবেন। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে আইডিআরএ’র একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতার ব্যাংক বীম অর্থনীতিকে বলেন, তহবিল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত একটি কমিটি হয়েছে। কিন্তু তহবিল না থাকায় তাদের কার্যক্রম নেই। বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসেসিয়েশন প্রবিধানমালা সংশোধনের যে দাবি তুলেছে সেটি আমলে নিয়ে আইডিআরএ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। গত জুলাই মাসেও এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে একটি মিটিং হয়েছে। গ্রাহকদের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রবিধানে কী ধরনের বিধি-বিধান সংযোজন-বিয়োজন করা যায় আইডিআরএ সেই দিকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

     

     

     

     

     

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ৪:২২ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

    bankbimaarthonity.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    Archive Calendar

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি