নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 153 বার পঠিত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো একে একে তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সুশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি এবারের ইশতেহারগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বীমা খাত। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো বীমাকে নাগরিক সুরক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি হাতিয়ার হিসেবে সামনে এনেছে।
বিএনপি’র ইশতেহারে কৃষি বীমা এবং সড়ক পরিবহন (মোটর) বীমাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
দুর্যোগে কৃষকের ঝুঁকি কমাতে শস্য, পশু, পোল্ট্রি ও মৎস্য বীমা চালুর ঘোষণা দিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় যাত্রী, ড্রাইভার ও সহকারীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে সব যানবাহনকে পর্যায়ক্রমে বীমার আওতায় আনার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বীমা খাতে গ্রাহক সুরক্ষা, তহবিল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে বিএনপি’র ইশতেহারে।
জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে তিন ধরনের বীমার কথা উল্লেখ করেছে—ধাপে ধাপে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা, ডিজিটাল হেলথ কার্ড, শিক্ষার্থী বীমা।
তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু করা হবে। শিক্ষার্থীদের জরুরি চিকিৎসায় ‘শিক্ষার্থী ফান্ড’ গঠন ও বীমা সুবিধার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। শ্রমিক সুরক্ষায় চাকরি হারালে নির্দিষ্ট সময় আর্থিক সহায়তা দিতে কর্ম–বীমা চালুর কথা বলা হয়েছে।
৩৬ দফার ইশতেহারে এনসিপি শ্রমিক সুরক্ষায় আরও বিস্তৃত বীমা কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছে।
ঘণ্টায় ১০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি শ্রম আইন বাস্তবায়ন করে বাধ্যতামূলক কর্ম–সুরক্ষা বীমা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও আঘাতের ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা এবং পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে এনআইডি–ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং দীর্ঘমেয়াদে ন্যাশনাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালুর পরিকল্পনাও দলটি জানিয়েছে।
ইশতেহার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে— বিএনপি/জামায়াত/এনসিপি তিন দলই বীমাকে জনসেবা ও আর্থিক সুরক্ষার কাঠামো হিসেবে সামনে এনেছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও মোটর বীমা—বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দলগুলো বীমা খাতকে আর্থিক শৃঙ্খলা, সুরক্ষা ও জবাবদিহির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বিএনপি’র ইশতেহারে কৃষি বীমার বিষয়ে বলা হয়েছে- প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ঝুঁকি হ্রাস এবং কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও শস্য বীমা, পশু বীমা, মৎস্য বীমা এবং পোল্ট্রি বীমা চালু ও সম্প্রসারণ করা হবে।
সড়ক পরিবহন বীমা তথা মোটর বীমার বিষয়ে বিএনপি’র ইশতেহারে বলা হয়েছে- যাত্রী, যানবাহনের ড্রাইভার ও সহকারী আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিহত কিংবা আহত হলে তাদের ক্ষতিপূরণ, সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রত্যেকটি যানবাহনকে পর্যায়ক্রমে বীমার আওতায় আনা হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশের বীমা খাত উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বিএনপি। দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে- বীমা খাতে গ্রাহক সুরক্ষা, তহবিল ব্যবস্থাপনার জবাবদিহী এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার অনুযায়ী, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু করা হবে। স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত সেবা পাওয়া, চিকিৎসার তথ্য সংরক্ষণ এবং পরিচয় যাচাই সহজ করতে এই উদ্যোগ কাজে লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জরুরি ও জটিল রোগের চিকিৎসায় সহায়তার জন্য ‘শিক্ষার্থী ফান্ড’ গঠন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বীমা চালুর কথাও ইশতেহারে উল্লেখ আছে।
শ্রমিক সুরক্ষায় জামায়াত জানিয়েছে, হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য ভাতা কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো হবে। পাশাপাশি চাকরি হারালে নির্দিষ্ট সময় আর্থিক সহায়তা দিতে কর্ম বীমা চালু করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এতে অনিশ্চিত কর্মসংস্থানে থাকা মানুষ উপকৃত হতে পারে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জামায়াত আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলেছে। ইশতেহারে ব্যাংক এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
জামায়াত ইশতেহারে ইসলামী ব্যাংক ও বীমা খাতের বিকাশে সহায়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা সহজ করতে করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
এনসিপির ইশতেহার অনুযায়ী, শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা জোরদারে ইন্স্যুরেন্সকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বীমা ও পেনশন নিশ্চিত করা হবে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আঘাত কিংবা আয়হানির ঝুঁকি কমাতে একটি বাধ্যতামূলক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য এনআইডি-ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড চালুর পরিকল্পনা দিয়েছে এনসিপি। রোগীকে কোন স্তরে, কখন এবং কোথায় পাঠানো হবে- সে বিষয়ে কার্যকর একটি রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার কথাও ইশতেহারে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে দলটি।
এদিকে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স ও পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রণ জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বত্র শরিয়াহর প্রাধান্যসহ প্রচলিত বীমা খাতের পরিবর্তে ইসলামী শরিয়াহর ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর বেশি জোর দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
তবে ইশতেহারে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষামূলক কিছু বিষয় স্থান পেয়েছে যা পরোক্ষভাবে বীমা বা সুরক্ষার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- সবার জন্য উন্নত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিভার্সাল হেলথ প্রোটেকশন প্রোগ্রাম বা হেলথ কার্ড প্রবর্তন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে বীমা শিল্পের প্রসঙ্গ উঠে আসা নাগরিক সেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি করেছে।
Posted ৯:০৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy


