• নিয়োগ চুক্তির অনৈতিক শর্তের সুযোগে হুটহাট পদত্যাগ

    বীমা সিইওদের চাকরি নিশ্চয়তায় দূর করতে হবে ‘দুষ্ট ক্ষত’

    জাহিদুল ইসলাম | ২৩ নভেম্বর ২০২১ | ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

    বীমা সিইওদের চাকরি নিশ্চয়তায় দূর করতে হবে ‘দুষ্ট ক্ষত’
    apps

    নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বীমার উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুদায়িত্ব পালন করেন কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তারা (সিইও)। কিন্তু তারাই যখন বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত ও পদত্যাগে বাধ্য হয় তখন উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা যেন হাস্যস্পদে পরিণত হয়। মূলত সিইও নিয়োগ চুক্তিতে নিয়মবহির্ভূত শর্তারোপের সুযোগে এমনটা হয়েছে আসছে। তাই বীমা শিল্পে সিইওদের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করে উন্নয়ন অব্যহত রাখতে বিধি বহির্ভূত এই ‘দুষ্ট ক্ষত’ নির্মূল করতে হবে। সেজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করছে খাত সংশ্লিষ্টরা।

    সাম্প্রতিককালে কয়েকটি বীমা কোম্পানির সিইও’র অনিয়ম ও আকস্মিক পদত্যাগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে তা ভাবিয়ে তোলে বীমা বিশ্লেষকদের। একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিকে যখন চাকরি বাঁচাতে পরিচালকদের অন্যায় আবদার মেনে নিতে হয়, আবার তাকেই আইন লঙ্ঘনের দায়ে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়; স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- এই গন্তব্যের শেষ কোথায়? একদিকে পরিচালনা পর্ষদ অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা; শাঁখের করাতে নিজেকে বলি দিতে সর্বদা প্রস্তত থাকতে হয়। কারণ সব জেনেও যখন নিশ্চুপ ভূমিকায় থাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তখন শেষ সম্বল হিসেবে পরিচালনা পর্ষদের কাছেই ভিড়তে হয় তাদের। বীমাখাতের সিইওদের নিয়োগ ও অপসারণের সর্বময় ক্ষমতা যাদের হাতে, সেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রভাব ও ক্ষমতা তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

    Progoti-Insurance-AAA.jpg

    বীমা আইনের ৮০ ধারার আলোকে প্রণীত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা, ২০১২-এর ৭(১) ধারায় উল্লিখিত ক্ষেত্রে ধারা ৭(২) অনুসারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার বিধান রয়েছে। তদন্তে ওই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযুক্ত প্রমাণিত হলে এবং তাকে অপসারণ যথার্থ মনে হলে তদন্ত প্রতিবেদন, প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য তথ্যাদি আইডিআরএ’র কাছে দাখিল করবে বীমা কোম্পানি। কোম্পানি থেকে দাখিলকৃত এসব তথ্যের আলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওই সিইওকে কারণ দর্শানো সাপেক্ষে অপসারণ করতে পারবে। তবে সেটা অনূর্ধ্ব ১৫ দিনের মধ্যে।

    অপরদিকে আইডিআরএ’র গত ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সালের এক সার্কুলার অনুযায়ী, কোন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদত্যাগের ইচ্ছে করলে তাকে পরিচালনা পর্ষদের কাছে যথাযথভাবে পদত্যাগ পত্র জমা দিতে হয়। কোম্পানি তথা পরিচালনা পর্ষদ এমন পত্র পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন এবং একটি অনুলিপি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রদান করবেন। এছাড়া অব্যাহতি পত্র প্রদানে পদত্যাগকারী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কোনো কাজ বাকি থাকলে তা তাকে জানাতে হবে এবং কাজটি সমাপ্ত করতে হবে। এরপর অব্যহতি পত্র দিয়ে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে তার দেনা-পাওনা মিটিয়ে দেয়ার নির্দেশ রয়েছে।


    এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একজন সিইওকে নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হয়, তেমনি তাকে অপসারণ করতে চাইলেও অনেকগুলো প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদাসীনতায় যখন-তখন চাকরি থেকে অপসারিত এবং পদত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন বীমা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদাধিকারী এই কর্মকর্তারা। আইন ভঙ্গ করে এমন অপসারণ ও পদত্যাগের পরও সহসাই নিস্কৃতি পায়না ভুক্তভোগীরা। মাসের পর মাস আটকে রাখা হয় তার বেতন-ভাতা ও ছাড়পত্র। ফলে একদিকে অর্থকষ্ট ও অপরদিকে ছাড়পত্র না থাকায় আরেক প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদান না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। যা মানবাধিকার ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের মতো অপরাধ।

    বিশ্লেষকদের মতে, সিইও নিয়োগ চুক্তিতে আইন বহির্ভূত একটি শর্তের অন্তর্র্ভুক্তিই সকল অনিয়মের মূল উৎস। এই একটি শর্তের কারণে কোম্পানির সামগ্রিক কার্যক্রমসহ আইডিআরএ’র অনুমোদিত প্রতিনিধিদের (সিইও) উপর প্রভাব বিস্তার করে পরিচালনা পর্ষদ। এতে খর্ব হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা ও প্রভাব। তাই বীমা শিল্পে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি আইডিআরএ’র স্বার্থ রক্ষার্থে এবং সুনাম পুনরুদ্ধারে সবার আগে এই দুষ্ট ক্ষতকে নির্মূল করতে হবে। শর্তটি হলো- কোনো পক্ষ চুক্তি অব্যহত রাখতে না চাইলে অপর পক্ষকে তিন মাস আগেই তা জানাতে হবে। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদ কোন কারণে সিইওকে তাৎক্ষণিক অব্যহতি দিতে চাইলে তাকে তিন মাসের মূল বেতন প্রদান সাপেক্ষে অব্যহতি দিতে পারে। ফলে সিইওদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে তিন মাস আগেই জানালেও পরিচালনা পর্ষদ তিনমাসের প্রাপ্য সম্মানি দিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিইওকে অব্যহতি দেয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে পরিচালনা পর্ষদ অব্যহতি দেয়ার পরপরই বেতন-ভাতা প্রদান না করে পরবর্তীতে হিসেবে করে দফায় দফায় পরিশোধ করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বছরের পর বছর বেতন-ভাতা ও ছাড়পত্র না দেয়ার বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে।

    অথচ বীমা আইন, বিধি ও আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের সময় উল্লেখ করে পদত্যাগ করার কোন নিয়ম নেই। এটি বীমা আইন ও বিধির সাথে সাংঘর্ষিক বলে জানান খাত সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া এটি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কর্তৃত্বের প্রতিও হুমকিস্বরূপ। কারণ বীমা আইন অনুযায়ী সিইও নিয়োগ ও অব্যহতি দেয়ার একমাত্র এখতিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র। কিন্তু চুক্তির ক্ষেত্রে উক্ত শর্ত অন্তর্ভুক্তিতে সিইওদের উপর এখতিয়ার ও চাপ প্রয়োগের সুযোগ পায় পরিচালনা পর্ষদ। অথচ আইন অনুযায়ী কোনো কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ চাইলেই কোন সিইওকে তাৎক্ষণিক বাদ দিতে পারে না। এজন্য আইডিআরএকে অব্যহতি দেয়ার কারণ ও অনিয়মে সম্পৃক্তত থাকলে তার তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করে অনুমতি নিতে হয়। এরপর আইডিআরএ বিষয়টি যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিবে। কিন্তু বর্তমানে এই চর্চা বীমাখাতে নেই বললেই চলে। এজন্য উপরোল্লিখিত চুক্তির শর্তারোপকেই দায়ী করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সিইওদের নিয়োগ অনুমোদন ও বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদানের কর্তৃত্ব একমাত্র আইডিআরএ’র। তাছাড়া একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার শক্তিমত্তা নির্ধারণের মাণদন্ড হলো তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা কতটুকু টেকসই তার উপর। সিইওরা যদি হুটহাট পদ থেকে অপসারিত হন তবে সেটা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। তাই বীমাখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চুক্তিপত্রে বিধিবহির্ভূত শর্তারোপের এই দুষ্ট ক্ষতকে দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই উদ্যোগী হতে হবে।

    সম্প্রতি বীমা নিয়ন্ত্রক ও বীমা সাংবাদিকদের সাথে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেও এমন আভাস মেলে। বৈঠকে বিএম ইউসুফ আলী বলেন- ‘অনেক সিইও সকালে গাড়িতে করে অফিসে আসে কিন্তু সন্ধ্যায় চাকরি হারিয়ে পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরতে হয়। অনেকে টিফিন ক্যারিয়ারটাও অফিসে রেখে যেতে চায় না। কারণ পরদিন সিইও হিসেবে রুমে ঢুকে যে ক্যারিয়ারটা নিতে পারবেন তার নিশ্চয়তা নেই। যেখানে নিজের চাকরি নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয়, চাকরি বাঁচাতে পরিচালকদের বেআইনি নির্দেশ পালনে বাধ্য হয়, সেখানে কিভাবে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তাই বীমাখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে প্রথমে সিইওদের চাকরির সুরক্ষা দিতে হবে।’ এজন্য তাৎক্ষণিক পদত্যাগ ও অপসারণ বন্ধে আইডিআরএ’কে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানান তিনি।

    আগেও বিভিন্ন বৈঠকে এমন দাবী জানিয়ে আসছিলেন পপুলার লাইফের এই সিইও। কিন্তু তার সে দাবীর প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে বিন্দুমাত্রও কর্ণপাত করেনি, সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন বীমা কোম্পানির সিইওদের আকস্মিক পদত্যাগ ও পদচ্যুতিতে সেটাই প্রতীয়মান হয়। চুক্তিপত্রে উল্লিখিত এই দুষ্ট ক্ষতের সর্বশেষ শিকার এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের সিইও কেএম সাইদুর রহমান। পরিচালনা পর্ষদ বৈঠকের মাত্র দুই ঘণ্টা পর চাকরি হারান। এরই মাঝে প্রায় দশ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনও পাননি বকেয়া বেতন-ভাতা ও ছাড়পত্র। ফলে সিইও হিসেবে অন্য কোম্পানিতেও যোগদান করতে পারছেন না। অথচ সব জানার পরও নিশ্চুপ বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

    শুধু সাইদুর রহমানই নয়, ইতোপূর্বেও আইন লঙ্ঘন করে পদত্যাগে বাধ্য ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নর্দান ইন্স্যুরেন্সের আব্দুল হক, প্রাইম ইন্স্যুরেন্সের বায়েজিদ মুজতোবা সিদ্দিকী ও মোহাম্মদী খানম, জনতা ইন্স্যুরেন্সের সাদাত আর খান, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শামসুল আলম, বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের একরামুল আমীন ও সোলায়মান হোসেন এবং মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের সারোয়ার জামিল অন্যতম। এমনকি ফারইস্ট লাইফের সিইও থাকাকালে বর্তমান আইডিআরএ চেয়ারম্যান ড. মোশাররফ হোসেনকেও তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

    কেস স্টাডি-১
    ‘প’ আদ্যোক্ষরের একটি সাধারণ বীমা কোম্পানিতে সিইও হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন বেলাল আহমেদ (ছদ্মনাম)। প্রায় অর্ধযুগ ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ধাপে ধাপে আজকের অবস্থানে উঠে এসেছেন। বীমাখাতে বেশ নাম ডাক রয়েছে তার। প্রতিষ্ঠানটিতে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত সুপরিচিত শিল্পপতি। কিন্তু গত কয়েকদিন যাবৎ বেলাল আহমেদের প্রায়ই বিষণ্নতা ভুগছেন। পরিবারের কাছ থেকেও আড়াল করতে চাইছেন তার বিষণ্নতা। কিন্তু ঠিকই টের পেয়ে যায় স্ত্রী শায়লা বেগম। জানতে চান বিষন্নতার কারণ। একপর্যায়ে স্ত্রীকে জানান তার চাকরিটা আর নেই। শুনে হতবাক হয়ে যান শায়লা। দেশের স্বনামধন্য একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হয়েও নিজের চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারেন নি। স্ত্রীর জোরাজুরিতে এক সময় চাকরি হারানোর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে জানান- কোম্পানির চেয়ারম্যানের সাথে একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভালো সখ্যতা রয়েছে। সেই ব্যাংক কর্মকর্তা বেলাল আহমেদের কাছে অনৈতিক সুবিধা চাইলে তা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন তিনি। এরপরই কোম্পানির চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন ওই ব্যাংক কর্মকর্তা। ফলশ্রুতিতে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা পর্ষদ। এদিকে অব্যহতি দেয়ার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নিজে থেকেই পদত্যাগ করেন জাঁদরেল এই সিইও। শোনা যায়, চাকরি থেকে অব্যহতি দেয়ার বিষয়ে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির জানা থাকলেও এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি তারা।

    কেস স্টাডি-২
    রহমান সাহেব জীবন বীমাখাতে একজন এফসিএ ডিগ্রিধারী সিইও। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় শর্তপূরণ করে সিইও হলেও কোম্পানির আর্থিক দৈন্যদশা কাটিয়ে পরিচালকদের মুনাফা দিতে পারছিলেন না। ফলে তাকে পরিবর্তন করতে মনস্থির করে পরিচালনা পর্ষদ। বরং তার তুলনায় অনেক কম যোগ্যতাসম্পন্ন একজনকে সিইও হিসেবে নিয়োগ দিতে ইচ্ছে প্রকাশ করে পর্ষদ। ফলশ্রুতিতে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চাকরি থেকে অব্যহতি নেন। তবে এই পদত্যাগের ক্ষেত্রেও কোম্পানিকে কোন নোটিশ প্রদান করেননি, যা আইনের লঙ্ঘন। অবশ্য কোম্পানির সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে পদত্যাগ করলেও এখন পর্যন্ত ওই কোম্পানির পক্ষ থেকে তার পাওনাদি পরিশোধ করা হয়নি।

    এসব বিষয়ে কথা হয় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা দেখার দায়িত্ব আইডিআরএ’র। পরিচালনা পর্ষদ কাউকে অপসারণ করতে পারে, কিন্তু অপসারণ করলেই যে তিনি অপসারিত হয়ে গেছেন সেটা নয়। তিনি আইডিআরএ’র কাছে আর্জি জানাতে পারেন, তখন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিষয়টি দেখবে। এতে যদি তিনি টিকে যান তাহলে তো কোন সমস্যা নেই।’

    বিআইএফ প্রেসিডেন্ট বিএম ইউসুফ আলী বলেন, ‘কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে সিইও নিয়োগ হয়ে থাকে। তাছাড়া কাউকে সিইও নিয়োগ প্রস্তাব করার আগে তার বিষয়ে দেখেশুনে নেয় পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু এরপরও দেখা যায়, চাকরির মেয়াদ থাকাবস্থায় কাউকে বাদ দিয়ে দিচ্ছে। কারণ হিসেবে যেটা জানা যাচ্ছে তা হলো, ব্যবসা যে পরিমাণ করার কথা ছিল তা হয়তো পারেনি। কারণ বীমাখাতে এখনো অনৈতিক প্রতিযোগীতা পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। এখন কেউ নিয়ম মেনে চললে সে হয়তো ভালো ব্যবসা আনতে পারবে না, পক্ষান্তরে কেউ যদি নিয়ম ভেঙে ব্যবসা করে তবে আইডিআরএ’র শাস্তির কবলে পড়বে। এই দুইয়ের মধ্যে আইডিআরএ’র আইন মেনে যখন সিইও’রা ভালো ব্যবসা করতে পারে না তখনই তাকে বাদ দেয়ার চিন্তা করে পরিচালনা পর্ষদ।’

    এক্ষেত্রে বিআইএফ কি পদক্ষেপ নিচ্ছে, এমনটা জানতে চাইলে বলেন- ‘আমরা আইডিআরএ এবং বিআইএ’কে ইতোমধ্যে এসব জানিয়েছি। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে এমন ঘটনা আর ঘটবে না। যদি ভবিষ্যতেও আইন লঙ্ঘন করে সিইওদের হুটহাট চাকরি থেকে অব্যহতি দেয়া হয় তাহলে আমরা শক্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।’

    মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির অভাবেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। ফলে বীমাখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইডিআরএ’র যে উদ্যোগ তা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে আইন ভেঙে সিইওদের হুটহাট চাকরি থেকে অব্যহতি দেয়া বা নেয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে পারলে তা খাতের উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করছেন তারা।

    চুক্তিপত্রে বিধিবহির্ভূত শর্তারোপের বিষয়ে আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতার বলেন, ‘এটি আসলে আইনসঙ্গত নয়। কোন প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র নিয়ম থাকতেই পারে তবে তা যেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সিইওদের চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিতে আমরা কার্যক্রম চালাচ্ছি। আগামীতে আইডিআরএ’র বৈঠকে এটি এজেন্ডা আকারে উপস্থাপন করা হবে। কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারনে আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তেমন চাপ দিচ্ছি না। কারণ তারা ব্যবসা করতে পারছে না। এই মুহূর্তে শক্ত পদক্ষেপ নিতে গেলে আরো ক্ষতির মুখে পড়বে। তারপরও আইন ভঙ্গ হলে আমরা বিষয়টি দেখবো। সেক্ষেত্রে আপনাদের কাছে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ থাকলে জানান, আমরা ব্যবস্থা নেবো।’

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ নভেম্বর ২০২১

    bankbimaarthonity.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    Archive Calendar

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি