• ‘ব্যাংকগুলো এখনো নারী বান্ধব হয়ে উঠেনি, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানে আগ্রহী নয় তাঁরা’- অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২১ মার্চ ২০২১ | ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

    ‘ব্যাংকগুলো এখনো নারী বান্ধব হয়ে উঠেনি, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানে আগ্রহী নয় তাঁরা’- অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী
    apps

    দেশের ব্যাংকগুলো এখনো পুরোপুরি নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী। তার মতেÑ নারী উদ্যোক্তাদের এখনো ঋণদানে আগ্রহ বা ভরসা পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। আর্থিক খাতের দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এমনটা জানান।

    মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী দীর্ঘ দিন ধরে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। তার প্রচেষ্টায় অন্তত ২০ হাজার নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। যাদের অধিকাংশই জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও তিনি বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এম এ খালেক। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা তুলে ধরা হলোÑ

    Progoti-Insurance-AAA.jpg

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: আপনি অনেক দিন ধরে এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। এ ক্ষেত্রে আপনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও রয়েছে। এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ পেতে কি সমস্যায় পড়তে হয় আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে শুনতে চাই?

    অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী: আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো নারীবান্ধব হয়ে উঠেনি। নারীরা ব্যাংকে গেলে তাদের চাহিদা মতো ঋণ পান না। ব্যাংকের সঙ্গে যদি তাদের যোগাযোগ না থাকে তাহলে ঋণ পেতে কষ্ট হয়। যারা একটু ধনী বা অবস্থাপন্ন এবং ক্ষমতাধর, ব্যাংক তাদেরই ঋণ দিতে আগ্রহী। তারা মালামাল উৎপাদন করছেন কিন্তু তা সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারছেন না।


    ব্যাংকের সঙ্গে যাদের আগে থেকেই সুসম্পর্ক আছে তারা ঋণ পাচ্ছেন। এই ঋণ নিয়ে তা শিল্প প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার না করে দেশের বাইরে পাচার করে দিচ্ছেন অনেকে। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃহৎ উদ্যোক্তাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংকের সাথে তেমন সম্পর্ক নেই। ফলে কাঙ্খিত মাত্রায় সহযোগিতা পাচ্ছেন না। দরিদ্র মানুষগুলো কষ্ট করে পণ্য উৎপাদন করেন কিন্তু তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিপণন ব্যবস্থা জটিলতা সৃষ্টি করছে। তারা চাইলেই উপযুক্ত বাজারে গিয়ে একটি পণ্য বিপণন করতে পারছেন না। তারা নানাভাবে সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন।

    সাম্প্রতিক এক খবরে জানা গেছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি বিত্তবানদের প্রচুর টাকা জমা হয়েছে। অথচ এই টাকা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতো। আমরা কোথায় আছি? আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছি। স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায় আমরা পার হয়ে এসেছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই। তার গতিশীল নেতৃত্বে দেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। সেই নারীদের পেছনে রেখে কোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টাই সার্বিকভাবে সফল হতে পারে না।

    বর্তমানে বিশ^ব্যাপী সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসডিজির একটি প্রধান শর্তই হচ্ছে কাউকে পিছনে ফেলে রাখা চলবে না। কিন্তু আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তারা নানাভাবে পশ্চাদপদ হয়ে আছেন। আমরা আর কিছুদিন পরই উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছি। আমাদের মনে রাখতে হবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবার পর আমাদের বেশ কিছু সুবিধা হারাতে হবে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমরা পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা পাচ্ছি।

    উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হবার তিন বছর পর এই সুবিধা আর পাওয়া যাবে না। তখন আমাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকতে হবে। কাজেই আমাদের এখন থেকে সেই প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য আমাদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি যে আমরা এখনো বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোট এবং আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারিনি।

    করোনার কারণে দেশের অর্থনীতির সব সেক্টরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাগণ। তারা তাদের পুঁজি হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। করোনা সংক্রমণ শুরু হবার তৈরি পোষাক শিল্প বন্ধ হয়ে যায়। তখন এই খাতের শ্রমিকদের চলে যেতে বলা হলো।

    আবার তাদের ডেকে আনা হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৈরি পোশাক শিল্প খাতের আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছেন। ফলে এই খাত আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে চলে এসেছে। তাদের স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয়েছে। যাতে তারা কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারেন। তৈরি পোশাক কারখানার জন্য এই আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো আবারো কাজ শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছিÑ তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা পুর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেছে।

    করোনার মধ্যে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় তারা তা পরিপালন করছে। শুধু একটি ক্ষেত্রেই অসুবিধা হচ্ছে, তাহলোÑ আমাদের রপ্তানি কার্যক্রম আর আগের মতো নেই। কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়ে পড়েছে। কারণ বিশে^র প্রতিটি দেশেই অভ্যন্তরীণ ভোগ চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। ফলে তারা ব্যাপকভাবে আমদানি করতে পারছে না। আমাদের দেশের তুলনায় উন্নত দেশগুলোতে করোনার প্রকোপ অনেক বেশি। আগামীতে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো গেলে তখন রপ্তানি আয় আবারো বৃদ্ধি পাবে। তৈরি পোশাক শিল্পে আরো একটি সেক্টর বেশ ভালো করছে। সেটা হলো ফার্মসিউটিক্যাল সেক্টর।

    বাংলাদেশ বর্তমানে তার ফার্মকিউটিক্যাল সামগ্রির মোট চাহিদার প্রায় পুরোটাই পূরণ করছে। পাশাপাশি বিদেশে প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশ করোনা ভ্যাকসিন আনার ক্ষেত্রেও অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে। ভ্যাকসিন আনার পর প্রথম দিকে মানুষের মনে কিছুটা সন্দেহ-সংশয় ছিল। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। মানুষ স্বত:স্ফুর্তভাবে করোনার ভ্যাকসিন নিচ্ছে।

    করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণের পর তেমন কোনো পাশর্^ প্রতিক্রিয়ার কথা এখনো শোনা যায় নি। কাজেই মানুষের মনে আস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম করোনার ভ্যাকসিন নেবার পর একজন মারা গেছেন। যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভ্যাকসিন নিচ্ছেন সেখানে একজন/দু’জন মারা যেতেই পারেন। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। উন্নত দেশ যেখানে করোনার ভ্যাকসিন এখনো নিতে পারেনি। সেখানে বাংলাদেশ প্রথম পর্যায়েই এই ভ্যাকসিন এনেছে। এটা একটি বড় ধরনের সাফল্য।

    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় যেভাবে সফলতা দেখিয়েছেন তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। আমরা এত দ্রুত করোনা ভ্যাকসিন আনতে পারবো এটা আগে বুঝা যায়নি। আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সাধারণ মানুষকে করোনার ভ্যাকসিন নিতে উদ্বুদ্ধ করেছি।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : করোনার পরবর্তী সময়ে এসএমই খাত তথা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কিভাবে আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন? এ ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো কি?

    অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী: করোনার শুরুতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেও ইতোমধ্যেই তারা আবারো কাজ শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করছেন। এখন হয়তো আগের মতো সরাসরি বিপণন করা যাচ্ছে না কিন্তু তারা অনলাইনে বা অন্যান্য পদ্ধতিতে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করছেন।

    ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকগুলো এসোসিয়েশন এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য বিপণন করছে। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে চলে এসেছে। তবে তারা আর্থিক সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। তাদের যে কোনোভাবেই হোক সহজ শর্তে তুলনামূলক স্বল্প সুদে ঋণদানের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণের ব্যবস্থা করা না গেলে এই খাতের বিকাশ কখনোই সম্ভব হবে না। কারণ করোনার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের পুঁজি হারিয়েছে। তারা পারিবারিক প্রয়োজনে অর্থ ব্যয় করেছেন। বর্তমানে ক্ষুদ্র শিল্পগুলো উৎপাদন শুরু করেছে ঠিকই কিন্তু তাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে।

    এই সেক্টরে যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে তারা ঠিকমতো তাদের পাওনা পাচ্ছে না। কারণ উদ্যোক্তারা এখনো তাদের আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কাজেই তারা শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি দিতে পারছে না। এই সমস্যা দূর করার জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জরুরি ভিত্তিতে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই এটা করতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কারো করুনা চায় না। তারা সহযোগিতা চায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই করোনার আগে তাদের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতো। কিন্তু করোনার কারণে সেই রপ্তানে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এখন তারা আবারো বিদেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে যদি তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ব্যাংক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিশেষ করে মহিলা উদ্যোক্তাদের ঋণ দেবার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করছে।

    আমি যেহেতু জাতীয় সংসদ সদস্য তাই নিজ দায়িত্ব থেকেই অনেকের জন্য ব্যাংক ঋণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যাংক থেকে সেরকম সহযোগিতা পাইনি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই ব্যাংকের সঙ্গে। ফলে তারা ব্যাংক থেকে কাঙ্খিত মাত্রায় সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এই সমস্যা দূরীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারি। তারা বাসায় বসে, অনলাইনে দেখে দেখে পণ্য তৈরি করে তা বাজারজাত করছে। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তারা তাদের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারছেন না।

    আমাদের দেশের নারীরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সাহসী হয়েছেন। তারা একজন আর একজনকে সাহায্য করছেন। ধীরে ধীরে নিজেদেরকে যুগপোযোগি করে গড়ে নিচ্ছেন। কিন্তু সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে তারা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না। ব্যাংকগুলো কেনো যেনো নারী উদ্যোক্তাদের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। অথচ নারী উদ্যোক্তারা সাধারণত ঋণ খেলাপি হন না। তারা গৃহীত ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেন। তারপরও ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এই একটি ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তারা পিছিয়ে আছে। অনলাইনের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্থানীয় ক্রেতা এবং বিদেশি ক্রেতাদের নিকট পণ্য পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের অভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের সামর্থ্যরে পুরোটা ব্যবহার করতে পারছেন না।

    করোনার সময়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আরো একটি জটিল সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তারা প্রয়োজনীয় মুহূর্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচামাল পাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চল থেকে কাঁচামাল নিয়ে আসা এখন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো তাদের বেশির ভাগই এখন গ্রামে চলে গেছে। ফলে দক্ষ শ্রমিক পাওয়াটাও এখন একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকেই শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে না পেরে গ্রামে চলে গেছেন। আমি আশা করবো, করোনা খুব দ্রুত চলে যাবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আবারো পূর্ণ্যােদ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। ইতোমাধ্য শহরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। ডেঙ্গু থেকেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। অর্থাৎ আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

    দেশে আবারো করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এটা হচ্ছে মূলত আমাদের অসতর্কতার জন্য। আপনি যদি বিভিন্ন মার্কেটে যান তাহলে মনে হবো কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা নেই। করোনা যেনো আমাদের দেশ থেকে চলে গেছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে, করোনা এখন নতুন মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। কাজেই স্বাস্থ্য সচেতনতা খুবই জরুরি। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের সময় করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। করোনা থেকে মুক্ত থেকে আমাদের আবারো পুর্ণোদ্যমে কাজ কর্ম শুরু করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। আর বাইরে গেলেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সর্বাবস্থায় স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। নিজেকে রক্ষা করতে পারলে আমরা অন্যকেও রক্ষা করতে পারবো।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : জাতীয় শিল্পনীতিতে এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানের বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া আছে। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ ব্যাপারে আপনারা কি করছেন?

    অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী: জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬ তে বলা হয়েছে, এসএমই খাতের মোট ব্যাংক ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। উপরন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনা রয়েছে পুন:অর্থায়ন ঋণের অন্তত ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের দিতে হবে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত নারী উদ্যোক্তাগণ ব্যাংক ঋণের মাত্র ৫ শতাংশ পেয়েছেন। সরকার করোনা সংক্রমণ মোকাবেলার জন্য যে ঋণ প্রণোদনা দিয়েছেন সেখান থেকে নারী উদ্যোক্তাগণ পেয়েছেন মাত্র ৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। করোনাকালিন সময়ে যে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয় তার সুদ হার হচ্ছে ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তাগণ প্রদান করবেন এবং অবশিষ্ট ৫ শতাংশ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদান করবে।

    করোনাকালিন ঋণ প্রণোদনার বাইরে সামগ্রিকভাবে এসএমই খাতে মোট ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাগণ পেয়েছেন প্রায় ৪শতাংশ। উল্লেখ্য, করোনাকালিন সময়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে এসএমই খাতের জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয় তার মধ্যে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১৩ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। অথচ বৃহৎ শিল্পের জন্য যে ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয় তার প্রায় পুরোটাই বিতরণ করা হয়েছে।

    আইনি সুযোগ-সুবিধা দেয়া থাকলেও নারী উদ্যোক্তাগণ বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছেন। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রেডিশনাল ব্যাংকের এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে মোটেও উৎসাহি নন। তারা চেষ্টা করেন কিভাবে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে ফিরিয়ে দেয়া যায়। নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিশেষ করে উৎপাদনমুখী খাতে ভালো করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরুষ প্রতিযোগিদের চেয়েও ভালো করছেন। কিন্তু তারা যখন ব্যাংকে ঋণের জন্য আসেন তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না।

    ব্যাংকারদের একাংশ মনে করেন, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া হলে সেই ঋণের কিস্তি পরবর্তীতে আদায় নাও হতে পারে। তাহলে ঋণদানকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাদের অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। কোনো নারী উদ্যোক্তা ব্যাংকে ঋণের জন্য এলে এমন সব ডকুমেন্টস চাওয়া হয় যা তাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব হয় না। ব্যাংক কর্মকর্তারা বৃহৎ আকারের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যতটা আগ্রহী, কম অঙ্কের ঋণদানের ক্ষেত্রে ততটাই অনাগ্রহী। মন্ত্রী পরিষদের সভায় নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণদানের প্রস্তাব পাশ করা হলেও কোনো ব্যাংকই এই প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়ন করেনি। আসলে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত। তারা নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণদানের ক্ষেত্রে মোটেও আগ্রহী নন।

    এদিকে বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্টিজ (বিডব্লিওসিসিআই) নারী উদ্যোক্তাগণ যাতে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণ পেতে পারে সেই লক্ষ্যে লবিং শুরু করেছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে যে সব নারী উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের জন্য প্রণোদনার বাইরেও সহজ শর্তে জামানতবিহীন সাধারণ ঋণ দাবি করেছে এই সংগঠনটি।

    ইতোমধ্যেই অর্থমন্ত্রণালয়ে তারা একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যেসব নারী উদ্যোক্তা করোনাকালীন ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন তাদের জন্য ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সহজ শর্তে ৪ শতাংশ সুদে জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিডব্লিওসিসিআই প্রেসিডেন্ট সেলিমা আহমাদ সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিকট ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। সংগঠনটি বলছে, যারা এসএমই খাতে নতুন করে শিল্প স্থাপন অথবা ব্যবসায় শুরু করবেন তাদের প্রথম তিন বছর ভ্যাট ও আয়কর থেকে মুক্তি দিতে হবে।

    আগামী অর্থবছরের (২০২১-২০২২) জাতীয় বাজেটে এসএমই খাতের জন্য ২০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। সেবা খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ যেমনÑ বুটিক, বিউটি পার্লার, ক্যাটারিং, খাবারের দোকান ও অন্যান্য খাদ্যের ব্যবসায় ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে। নারীদের করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। করোনাকালীন যে সব নারী উদ্যোক্তা তাদের শিল্প বা ব্যবসায়-বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর স্বার্থে আগামী ২ বছরের জন্য ভ্যাট ও আয়কর প্রদান থেকে মুক্তি দেয়াসহ ট্রেড লাইসেন্স ফি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে।

    তারা অভিযোগ করেন ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের দ্বারা পরিচালিত ব্যবসায়ের শো-রুমের উপর ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তরা ঠিকই ভ্যাট আদায় করে। ফলে নারী উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি :উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে কেমন সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন?

    অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী: গ্রামাঞ্চলে যে সব পণ্য উৎপাদিত হয় তা এখন আর আগের মতো শহরে আসতে পারছে না। আগে প্রায়শই বিভিন্ন ধরনের মেলা হতো। এখন করোনার কারণে মেলা আয়োজন বন্ধ রয়েছে। ফলে ক্ষুদ্র্র উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিপণন করতে পারছেন না। এতে সমস্যা হচ্ছে। অনেকেই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারছেন না। কারণ পণ্য উৎপাদন করলেও তা বিক্রির কোনো নিশ্চয়তা নেই।

    মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই অসহায় হয়ে গেছে। তাদের হাতে টাকা নেই। তারা চাইলেই আগের মতো পণ্য ক্রয় করতে পারছেন না। এসএমই খাতে যে সব উদ্যোক্তা আছেন তাদের জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

    দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: আমরা জানি আপনি এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করেন। আমি জানতে চাচ্ছি আপনি নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে কি কাজ করেছেন?

    অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী: এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে আমি আমার সাধ্য মতো কাজ করে চলেছি। আমি ১৯৬৮ সাল থেকে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমার বাবা ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম বাঙ্গালি আমদানি-রপ্তানিকারী। তিনি তখনকার দিনে মেম্বার অব পার্লামেন্ট ছিলেন। আমি আমার বাবার নিকট থেকে ব্যবসায়ের কৌশল এবং রীতিনীতি শিক্ষা করি। আমি তখন থেকেই নিজের চেষ্টায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে তুলেছি চট্টগ্রামে। ক্রমান্বয়ে আমি বড় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সমর্থ্য হই। আমি কাঠের জিনিস রপ্তানি করতাম।

    আড়ংয়ের সব কাঠের জিনিষগুলো আমার বানানো। আমি দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নিয়োজিতদের কিছু কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছি। আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে আমি প্রায় ২০ হাজার নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছি। আমি বিভিন্ন ফোরামের কর্মকর্তা হিসেবে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। নারী উদ্যোক্তারা যাতে ব্যাংক ঋণ পেতে পারে সে জন্য তৎপরতা চালিয়েছি। নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য মেলায় যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি।

    আমি যেসব নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছি তাদের অধিকাংশই এখন দেশের প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন। আমি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আমি সাধ্যমতো নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে চেষ্টা চালিয়েছি। আমি মনে করি, বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারি। তারা প্রয়োজনীয় আর্থিক এবং নীতি সহায়তা পেলে যে কোনো অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি তারা নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করেন।

    কিন্তু আমাদের দেশের এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে বিরূপ মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশে^র ৫৬টি দেশে আমার যাবার সুযোগ হয়েছে। প্রত্যেকটি দেশেই দেখেছি তারা নারী উদ্যোক্তাদের কতটা সম্মান করেন। কিভাবে সহায়তা করেন। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়টি অনুপস্থিত। আগে আমাদের দেশের নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে আসতে চাইলে স্বামীরা বাধা দিতেন। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর মনোভাব এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে। ফলে নারী উদ্যোক্তারা তাদের চাহিদা মতো ঋণ সহায়তা পাচ্ছেন না।

     

     

     

     

     

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২১ মার্চ ২০২১

    bankbimaarthonity.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    Archive Calendar

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি