শুক্রবার ১৯ এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৬ বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় ঋণ এখন মরণফাঁদ

আদম মালেক   |   শনিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২০   |   প্রিন্ট   |   264 বার পঠিত

ভারতীয় ঋণ এখন মরণফাঁদ

কঠিন শর্তের বেড়াজালে ভারতীয় ঋণ। উন্নয়নের টোপ ফেলে দেশটি বাংলাদেশকে এ ঋণ দেয় ভারত। এ ঋণের অর্থ বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও ৯০ শতাংশ ঋণও ছাড় পায়নি। খরচ বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। কোনো কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ৩গুণ বাড়লেও আজও বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ হয়নি। কবে শেষ হবে তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। এজন্য ভারতীয় ঋণ বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতীয় ঋণের অর্থ বাংলাদেশ নগদ পায় না। ভারত থেকে পণ্য কিনতে হয়। আবার এ পণ্য ক্রয়ে দরপত্র আহ্বানের সুযোগ নেই। পণ্যের মান ও দাম নির্ধারণ করে ভারত। প্রকল্পে বাস্তবায়নে পরামর্শক ও ঠিকাদারও ভারতীয়দের। পরামর্শকের ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধে অর্থায়ন করে বাংলাদেশ। তবুও রক্ষা মিলছে না বাংলাদেশের। অভিযোগ রয়েছে- প্রকল্পগুলোর কাজ যেসব ঠিকাদার পায় তারা নিজেরা কাজ না করে অনেক সময় নিম্নমানের ঠিকাদারকে সাব কন্ট্রাক দিয়ে দেয়। এতে করে যতটুকু কাজ হয় তাও খুবই নিম্নমানের। কিন্তু জবাবদিহির কোনো সুযোগ নেই।

ভারতীয় ঋণে খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পের কাজ চলছে ১০ বছর ধরে। এর মধ্যে তিন দফা বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়। তিন বছরের প্রকল্পে ১০ বছর ধরে চলে ব্যয় বেড়েছে ১২১ শতাংশ। ২ হাজার ৮০ কোটি ২২ লাখ টাকার প্রকল্পের টাকা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ভারতের ঋণে রেলের আরেক প্রকল্প চলমান ৯ বছর। দীর্ঘ ৯ বছরে ওই প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রমের প্রায় ৮৩ শতাংশ এখনও বাকি। প্রকল্পটির কাজ শেষে করতে বাড়তি আরও ৯ বছর সময় লাগবে। সব মিলে ভারতের ঋণে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে লাগবে ১৮ বছর। শুধু রেল প্রকল্প নয়, ভারতের ঋণে বাংলাদেশে চলমান সব প্রকল্পের এমন করুণ দশা।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঋণের শর্ত ও অর্থ ছাড়ে কড়াকড়ির কারণে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ভারতের ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ নেই। এতে কবে নাগাদ এ ঋণের পুরোটা ব্যবহার শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না কেউই।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে প্রথম রাষ্ট্রীয় ঋণ (এলওসি) অনুমোদন করে দেশটি। ১০০ কোটি ডলারের ওই ঋণ থেকে পরে ২০ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে মঞ্জুর করা হয়। তবে ঋণের পরিমাণ আরও ছয় কোটি ২০ লাখ ডলার বাড়ানো হয়। এছাড়া দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ২০০ কোটি ও তৃতীয় এলওসির আওতায় ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে ভারত। সব মিলিয়ে ভারতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। তবে প্রায় ১১ বছরে এলওসির মাত্র ৭১ কোটি ডলার ব্যবহার করতে পেরেছে বাংলাদেশ, যা মোট ঋণের মাত্র ১০ শতাংশেরও কম। এখনও প্রথম এলওসির প্রকল্পগুলোরই বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়নি।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এলওসির অগ্রগতি পর্যালোচনা সম্পর্কিত এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনলাইনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ দ্রæত ছাড় করার নির্দেশনা দেয়া হয় ওই বৈঠকে। বৈঠক সূত্র জানায়, প্রথম এলওসির আওতায় ঋণ রয়েছে ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৬১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৭১ দশমিক ১১ লাখ ডলার ছাড় হয়েছে। এ অর্থে ১২টি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, একটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), একটি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও একটি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এর বাইরে প্রথম এলওসির তিনটি প্রকল্প এখনও চলমান রয়েছে। এগুলো হলো- খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ, ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয়-চতুর্থ লাইন রেলপথ নির্মাণ ও টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণ এবং কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনর্বাসন। এ তিন প্রকল্পে ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৩০ কোটি ৮৯ লাখ ডলার, ১২ কোটি ৩১ লাখ ডলার ও সাত কোটি ৮১ লাখ ডলার। আর খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ছাড় হয়েছে ২০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার এবং টঙ্গী তৃতীয়-চতুর্থ লাইন রেলপথ নির্মাণ ও টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পে ছাড় হয়েছে তিন কোটি ৮৩ লাখ ডলার। তবে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পে এখনও কোনো অর্থ ছাড় হয়নি।

জানা গেছে, ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১০ সালের ৭ আগস্ট। তবে ২০১২ সালে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ থেকে ২০ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে দেয়ার ঘোষণা দেয় ভারত। পরে ২০১৬ সালের আগস্টে এলওসিতে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আরও ছয় কোটি ২০ ডলার ঋণ অনুমোদন করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। সব মিলে প্রথম এলওসিতে ভারতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার।

এদিকে দ্বিতীয় এলওসির আওতায় বাস্তবায়নের জন্য ১৮টি প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা কমিয়ে ১৬টি প্রকল্প চ‚ড়ান্ত করা হয়। এজন্য ২০১৬ সালের ৯ মার্চ ২০০ কোটি ডলারের চ‚ড়ান্ত ঋণ চুক্তি সই করে বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের এক্সিম ব্যাংক। তবে তিন কোটি ৪৪ লাখ ডলারের একটি প্রকল্প পরে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় এলওসির আওতায় মাত্র দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো বিআরটিসির জন্য ৬০০ বাস ও ৫০০ ট্রাক কেনার প্রকল্প। যেগুলোয় ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। আর বর্তমানে ১৩টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ের প্রকল্প রয়েছে তিনটি। এগুলো হলো- সৈয়দপুরে নতুন একটি ক্যারেজ ওয়ার্কশপ নির্মাণ, খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন নির্মাণ ও পাবর্তীপুর-কাউনিয়া রেলপথ মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দুটি প্রকল্প হলো- সড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে যন্ত্রপাতি কেনা এবং আশুগঞ্জ নদীবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত চারলেনের মহাসড়ক নির্মাণ।

Facebook Comments Box
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Posted ২:২৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২০

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

রডের দাম বাড়ছে
(11187 বার পঠিত)

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
প্রধান সম্পাদক: মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
নিউজরুম:

মোবাইল: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১

ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫, ই-মেইল: bankbima1@gmail.com

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।