শুক্রবার ২৪ মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দুই বছর ধরে নেই নিয়মিত সিইও

ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহীতে ভারাক্রান্ত জনতা ইন্স্যুরেন্স

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১   |   প্রিন্ট   |   402 বার পঠিত

ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহীতে ভারাক্রান্ত জনতা ইন্স্যুরেন্স

দুই বছর হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) মাধ্যমে কার্যক্রম চালাচ্ছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমাখাতের প্রতিষ্ঠান জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। অথচ বীমা আইন অনুযায়ী, তিন মাসের বেশি চলতি দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। কিন্তু সে আইন ও নির্দেশনা মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির কাছে। এদিকে সব জানার পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রশ্ন উঠেছে আইডিআরএ’র ভূমিকা নিয়ে।

বীমা আইন-২০১০ এর ৮০(৪) অনুসারে, সিইও পদ একাধারে তিন মাসের অধিক খালি রাখা যাবে না। তবে অপরিহার্য পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা আরো তিন মাস বৃদ্ধি করতে পারবে। অর্থাৎ সাকুল্যে ৬ মাসের বেশি কোনো অবস্থাতেই পদ শূন্য রাখার সুযোগ নেই। এর বেশি সময় লাগলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করবে যতদিন যোগ্য সিইও পাওয়া না যায়। প্রশাসক নিয়োগ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার বেতন-ভাতা যেভাবে ঠিক করে দিবেন, তিনি কোম্পানি থেকে সে অনুযায়ী বেতন ভাতা পাবেন। কিন্তু তিন মাসের স্থলে দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক বসানো বা ন্যূনতম কোনো পদক্ষেপও নেয়নি আইডিআরএ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন উদাসীনতা বিস্ময় সৃষ্টি করেছে খাত সংশ্লিষ্টদের মাঝে। অনেকের ধারণা এগুলো হলো কারসাজি, যেখানে আইডিআরএ’র কতিপয় ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বও থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়।

অপরদিকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে আইডিআরএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান এম. শেফাক আহমেদ, অ্যাকচুয়ারি স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে (নং-জিএডি-১৩/২০১৫) বলা হয়, মুখ্য নির্বাহীর অনুপস্থিতে তার অব্যবহিত নিম্নপদে নিয়োজিত কর্মকর্তাকে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করতে পারবে। এক্ষেত্রে চলতি দায়িত্বের মেয়াদ তিন মাসের অধিক হবে না। তবে অপরিহার্য অবস্থায় মেয়াদ আরো তিন মাস বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু বীমা আইন ও নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত প্রায় দুই বছর যাবৎ কোনো নিয়মিত সিইও নেই জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে। প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বশেষ আইডিআরএ’র অনুমোদনপ্রাপ্ত সিইও ছিলেন সাদাত উর রহমান খান। তিনি ২০১৯ সালের শেষদিকে প্রতিষ্ঠানটি থেকে আকস্মিক পদত্যাগ করলে ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর থেকে সিইও’র চলতি দায়িত্ব দেয়া হয় কোম্পানি সচিব বশির আহমেদকে। সেই থেকে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর আইডিআরএ কর্তৃক অপসারিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ১ বছর ৯ মাস সিইও’র চলতি দায়িত্ব পালন করেছেন। একইদিনে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইকবাল রশিদীকে মুখ্য নির্বাহীর চলতি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ইতোমধ্যে সে মেয়াদেরও দুই মাস পেরিয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপস্থিত রয়েছে এক বছর ১১ মাস, যেখানে আইনে সর্বোচ্চ নির্ধারিত সময়সীমা ৬ মাস। ফলে প্রায় দেড় বছর যাবৎ নিয়মিত বীমা আইন ও নির্দেশনা লঙ্ঘন করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে বিশেষজ্ঞ মহলে। বীমাখাতের বিশিষ্টজনদের মতে, জনতা ইন্স্যুরেন্সের সাবেক সিইও বশির আহমেদের যোগ্যতার শর্তে ঘাটতি থাকার বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই জানতেন পরিচালনা পর্ষদ। এরপরও তাকে নির্ধারিত অন্যূন ছয় মাসের পর অতিরিক্ত ১৫ মাস দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছে জনতা ইন্স্যুরেন্সের পর্ষদ। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, জনতা ইন্স্যুরেন্স জেনেশুনেই আইন লঙ্ঘনের দুঃসাহস দেখিয়েছে। কেননা আইনের এই বিধিবিধান সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ পরিচালকরাও অবগত। এমনকি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে সিইও’র চলতি দায়িত্বে থাকা ইকবাল রশিদীকেও আইন ভেঙে পদে বসানো হয়েছে।

ইকবাল রশিদীর সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি জনতা ইন্স্যুরেন্সে যোগদানের আগে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে জনতা ইন্স্যুরেন্স থেকে বশির আহমেদ অপসারিত হলে পরদিনই ইকবাল রশিদীকে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সিইও’র চলতি দায়িত্ব অর্পণ করে পরিচালনা পর্ষদ। এর আগে তিনি কখনো মুখ্য নির্বাহীর অব্যবহিত নিম্নপদে ছিলেন না। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সিইও নিয়োগে কোনো কার্যক্রম বা পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি জাতীয় দৈনিক পত্রিকাতেও এখন পর্যন্ত সিইও নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি। নন-লাইফ বীমাখাতের বেশ কয়েকজন সাবেক দক্ষ সিইও বর্তমানে চাকরিবিহীন থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে বলা হচ্ছে, তারা দক্ষ লোক খুঁজে পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে জনতা ইন্স্যুরেন্সের গাফিলতি সুস্পষ্ট বলছেন খাত-বিশ্লেষকরা। তাদের ধারণা, ইকবাল রশিদীকেও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করানোর পর পূর্ণাঙ্গ সিইও করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় হয়তো চিঠি দেবে জনতার পরিচালনা পর্ষদ। অথচ সিইও নিয়োগে ব্যর্থতায় ইতোমধ্যেই আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক বসানোর কথা ছিলো।

এদিকে নিয়মিত সিইও না থাকা এবং আইনে বর্ণিত সময় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি জানা থাকলেও এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইডিআরএ। ফলে স্বয়ং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরুদ্ধেই আইন ভাঙায় প্রশ্রয় দানের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বীমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, কোনো বীমা কোম্পানি যত বেশি অনিয়মে থাকে, আইডিআরএ’র কর্মকর্তারা তত বেশি খুশি হয়। কারণ আইনের দোহাই দিয়ে তাদের অবৈধ সুবিধা লাভের তত সুযোগ তৈরি হয়। কোন প্রতিষ্ঠানে আইন লঙ্ঘন হলে যে জরিমানা হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক কম মূল্য পরিশোধ করে তারা শাস্তি ও জরিমানার হাত থেকে রক্ষা পায়। উপরন্তু অঘোষিতভাবে আইন লঙ্ঘন করার বিষয়টি জায়েজ হয়ে যায় তাদের জন্য। এসব কারণে বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নিম্নপদে চাকরিরত অনেক কর্মচারীও বর্তমানে অনেক বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন বলে জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্র।

সিইও নিয়োগে আইন পরিপালনে ব্যর্থতার দায়ে ধারা ১৩৪ অনুসারে কোম্পানির প্রত্যেক পরিচালকসহ লঙ্ঘনে জড়িত প্রত্যেককে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করতে পারে। এছাড়া লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য ৫ হাজার টাকা হারে ফের জরিমানা গুনতে হবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসকও নিয়োগ দিতে পারবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এক্ষেত্রে প্রশাসকের বেতন-ভাতা আইডিআরএ নির্ধারণ করে দিলেও কোম্পানিকেই তা পরিশোধ করতে হবে।

এ বিষয়ে জনতা ইন্স্যুরেন্সে সিইও চলতি দায়িত্বপালনকারী ইকবাল রশীদির কাছে ফোন করা হয়। ফোন করার বিষয় উল্লেখ করলে তিনি সাথে সাথে ফোনটি কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন ও মেসেজ পাঠানো হলেও আর কোন সাড়া দেননি। অবশ্য এর আগেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

পরবর্তীতে কোম্পানির বর্তমান চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ চৌধুরীর কাছে এই ব্যর্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন- ‘আমরা নিয়মিত সিইও নিয়োগে কাজ করছি, কিন্তু দক্ষ লোক না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত নিয়োগ করতে পারিনি।’ এক্ষেত্রে পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে কিনা, এরূপ জানতে চাইলে বলেন- ‘সিইও পদ এমন কোনো পদ নয় যে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নিয়োগ করতে হবে। আমরা নিয়মিত ইন্টারভিউ নিচ্ছি। দক্ষ লোক পেলেই নিয়োগ দেবো।’ দুই বছর যাবৎ অনিয়মিত সিইও দিয়ে কার্যক্রম চালানোতে আইডিআরএ অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন- ‘আমরা আইডিআরএকে জানিয়েছি, তাদের অনুমোদন আছে বলেই তো কাজ করতে পারছি।’

এদিকে দীর্ঘদিন যাবৎ জনতা ইন্স্যুরেন্সে সিইও না থাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ও মুখপাত্র এসএম শাকিল আখতারের কাছে। তিনি জানান, ‘বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে যাচ্ছে না আইডিআরএ। তাছাড়া এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।’

তবে আইডিআরএ মুখপাত্রের এমন বক্তব্যকে দায়সারা বলছেন খাত বিশ্লেষকরা। তারা জানান- করোনাকালে স্বল্প সময়ের জন্য বন্ধ ছিলো দেশের আর্থিক খাতের কার্যক্রম। এরপর ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, পুঁজিবাজার পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে রোস্টার পদ্ধতিতে কার্যক্রম চলমান ছিলো। এমনকি নিয়মিত জনবলের ২৫ শতাংশ দিয়ে কার্যক্রম চালাতে খোদ আইডিআরএ’রই নির্দেশ ছিলো। তাহলে আইডিআরএ কি এই সময়ে কোনো কাজ করেনি? এছাড়া বর্তমানে লকডাউন উঠিয়ে দেয়া হয়েছে তাও অনেকদিন হয়ে গেলো। দীর্ঘ বিরতির পর স্কুল-কলেজও খুলে দিয়েছে সরকার। এখনও যদি লকডাউনের দোহাই দেয়া হয়, তা অবান্তর ও এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

Facebook Comments Box
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Posted ১২:৪৮ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
প্রধান সম্পাদক: মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
নিউজরুম:

মোবাইল: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১

ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫, ই-মেইল: bankbima1@gmail.com

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।