• শিরোনাম

    বিআরটিএ’র সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত বীমা খাত ও গাড়ি মালিকরা; রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

    মোটরযান বীমা : বাতিল নাকি বাধ্যতামূলক

    এস জেড ইসলাম | ১৩ জুন ২০২১ | ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

    মোটরযান বীমা : বাতিল নাকি বাধ্যতামূলক
    apps
    Spread the love
    • Yum

    সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুসারে মোটরগাড়ির বীমা না থাকলে মামলা নয়; এমন অনুরোধ জানিয়ে গতবছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে চিঠি দেয় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। সড়ক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের এমন অনুরোধ পেয়ে তা বাস্তবায়ন শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশাপাশি তৃতীয়পক্ষের ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত ‘অ্যাক্ট লায়াবিলিটি’ পলিসি বন্ধের নির্দেশ দেয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। ফলে সর্বমহলে এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, মোটরযানের বীমা প্রয়োজন নেই। অথচ বীমা বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন ভিন্নকথা। তাদের মতে, গাড়ির বীমা প্রয়োজন নেই, তা তো নয়ই; বরং সড়ক পরিবহন আইনে বীমাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মোটরগাড়ির তৃতীয়পক্ষের বীমা বাতিল না কি বাধ্যতামূলক- তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

    জানা গেছে, সড়ক পরিবহন আইন-১৯৮৩ রহিত করে সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৮ প্রণয়ন করে সরকার। পূর্বের আইনের ১০৯নং ধারায় মোটরবীমা বাধ্যতামূলক ছিল। তাছাড়া উক্ত আইনের ১৫৫ ধারায় বীমা না থাকলে কি ধরনের শাস্তি ও জরিমানা হবে তার উল্লেখ ছিল। কিন্তু এই বীমা পলিসি দ্বারা সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো না। কেননা আমাদের দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ বীমার সুবিধা সম্পর্কে সচেতন না। তাছাড়া প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার বিষয়টি অনেকের কাছেই ঝামেলা মনে হয়। তাই তারা সাধারণত বীমাদাবি করতে চায় না। এ জন্য ২০১৮ সালে প্রণীত সড়ক পরিবহন আইনে মোটরগাড়ির বীমা করাকে ‘ঐচ্ছিক’ করা হয়েছে। পরবর্তীতে গতবছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ থেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে ‘মোটরগাড়ির বীমা না থাকলে মামলা নয়’এমন একটি চিঠি পাঠানো হলে বীমা সম্পর্কিত শাস্তি ও জরিমানা বন্ধ করে দেয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ। এরপর গত ২১ ডিসেম্বর একটি সার্কুলার জারি করে তৃতীয়পক্ষের ঝুঁকি বীমা বাতিল করে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। মূলত তখন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় মোটরগাড়ির বীমা।

    Progoti-Insurance-AAA.jpg

    সম্প্রতি মোটরবীমা বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে বীমাখাতে। বীমাবিদদের মতে, আইনের কিছুটা অস্পষ্টতার সুযোগে বীমা ছাড়াই সড়কে গাড়ি চালানো মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে গাড়ির মালিকের যেমন ক্ষতিপূরণ সম্ভব হবে না, তেমনি অন্য কোনো সম্পদের ক্ষতি হলে সেটাও ক্ষতিপূরণের আওতার বাইরে থাকছে। সেক্ষেত্রে গাড়ি মালিককে দু’ভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। প্রথমত. নিজের গাড়ির ক্ষতি, দ্বিতীয়ত. অন্য সম্পদের ক্ষতির দায়। তাছাড়া আধুনিক বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মোটরবীমা ছাড়া সড়কে গাড়ি চলাচল করতে দেয়া হয় না।

    তবে অধিকাংশ বীমা ব্যক্তিদের মতে, নতুন সড়ক পরিবহন আইনে বীমার বিষয়টি স্পষ্ট রয়েছে এবং তা বাধ্যতামূলক। কেননা সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৮-এর ৬০(২) ধারায় মোটরযান মালিককে ‘যথানিয়মে বীমা করিবেন’ কথাটি বলা হয়েছে। পাশাপাশি ধারা ১১১-তে পুলিশ অফিসার দ্বারা গাড়ির কাগজপত্র আটকের ক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘বীমা সনদ’ কথাটির উল্লেখ রয়েছে। ফলে এ দুই ধারার বিশ্লেষণ থেকেই মোটরবীমা ‘বাধ্যতামূলক’ বলে জানান তারা।


    তবে কেউ কেউ এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তারা বলেন, আইনটির- ১১১নং ধারায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত পরিদর্শক গাড়ির কাগজপত্র জাল বা ভুয়া প্রমাণিত হলে এর জন্য কৈফিয়ত তলব করতে পারবেন। কিন্তু কোনো শাস্তির বিষয়ে বলা হয়নি। যেহেতু নতুন সড়ক আইনে বীমাবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে তা অস্পষ্ট এবং এজন্য কোনো শাস্তি বা জরিমানার বিধান রাখা হয়নি। তাই বীমা ছাড়া গাড়ি চালাতে পারবে না বা গাড়ি বীমা বাধ্যতামূলক; এমনটা বলার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে আইনের ধারাগুলো স্পষ্ট করতে এবং প্রয়োজনের নতুন করে নির্দেশনা জারি করতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সম্মিলিত বৈঠক হওয়া এবং সে বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

    বিষয়টি নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও নিটল ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান একেএম মনিরুল হক জানান, নতুন সড়ক আইনেও মোটরগাড়ির বীমা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এতে শাস্তির কোনো বিধান না থাকায় বিষয়টি নিয়ে দ্বিধার সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট করতে বিআরটিএ, আইডিআরএ এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রয়োজনে আইনে সংশোধন অথবা নতুন করে কোনো নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন জারি করা প্রয়োজন।

    এমনটাই মনে করেন মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল। তিনি বলেন, যেহেতু ৬০(২) ধারায় গাড়ি মালিকের প্রতি ‘যথানিয়মে বীমা করিবেন’ বলে নির্দেশনা রয়েছে তাই এটা বাধ্যতামূলক। তবে বিষয়টি আরো স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। যদি মোটরবীমা বাধ্যতামূলক হয়, তবে আইডিআরএ এই পলিসি কেন বন্ধ করেছে; এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ জন্য আগে মোটরবীমা পলিসিগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। মোটরবীমায় সাধারণ দু’ধরনের পলিসি চালু ছিলো। একটি হলো কম্প্রিহেনসিভ বা বিস্তৃত পরিসরের পলিসি এবং আরেকটি হলো শুধু তৃতীয়পক্ষের বীমা পলিসি বা অ্যাক্ট লায়াবিলিটি। কম্প্রিহেনসিভ পলিসি আবার দুটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এক. গাড়ির ক্ষতি এবং দুই. অন্যপক্ষের ক্ষতি। বর্তমান সড়ক আইন অনুসারে আইডিআরএ শুধু তৃতীয়পক্ষের ক্ষতি সম্পর্কিত অ্যাক্ট লায়াবিলিটি বন্ধ করেছে। কারণ কম্প্রিহেনসিভ পলিসিতে তৃতীয়পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে। তাই একই ধরনের পলিসি দুইবার না রেখে আইডিআরএ বরং যুগোপযোগী কাজটিই করেছে।

    রূপালী ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পি. কে. রায় এফসিএ বলেন, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর ধারা ৬০-এর উপধারা (১), (২) এবং (৩) পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এই সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ প্রর্বতনের কারণে Motor Third Party Act. Liability ইন্স্যুরেন্সের কোনো সুযোগ নেই। মোটরযানের ব্যাপক বীমাঝুঁকি (Comprehensive Insurance) এই আইনের ৬০(২) ধারা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ Act. Liability Insurance বাতিল করেছেন এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ গত ৩০.০৯.২০১২ইং তারিখের পত্রের মাধ্যমে পুলিশ পরিদর্শককে অবগত করেছেন যে, ‘তৃতীয়পক্ষের বীমা ঝুঁকি বাধ্যতামূলক নয় এবং এ আইনের অধীনে ইহা লঙ্ঘন করা হলে কোনো দণ্ডের বিধান নেই।’ তবে এই পত্রে বীমা বাধ্যতামূলক নয়এ বিষয়টি কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। এরপর সড়ক আইনের ৬০(১), ৬০(২) এবং ৬০(৩) ধারার ব্যাখ্যা পর্যায়ক্রমে পেশ করেন তিনি।

    এই আইনের ৬০(১) ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো মোটরযানের মালিক ইচ্ছা করলে যাত্রীর জীবন এবং সম্পদের বীমা করিতে পারিবেন।’ এখানে যাত্রীর বীমাকে ঐচ্ছিক করা হয়েছে, কোনো মোটরযানের বীমাকে নয়। অনেকে ‘ইচ্ছা করিলে’ শব্দটির ভুল ব্যাখ্যা করে বলছেন, মোটরযানের বীমা ঐচ্ছিক। এদিকে ৬০(২) ধারা অনুযায়ী, (ক) মোটরযানের মালিক তার মোটরযানের বীমা যথানিয়মে করিবেন, (খ) মোটরযানের ক্ষতি বা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি বীমার আওতাভুক্ত থাকিবে, (গ) বীমাকারী কর্তৃক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাইবার অধিকারী হইবেন।’

    এই ধারা পর্যালোচনা করে তিনি বলেন- এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক এবং মোটরযানের মালিককে তার মোটরযানের জন্য Motor Comprehensive বীমা গ্রহণ করতে হবে। কারণ বীমা গ্রহীতার মোটরযান Comprehensive Insurance দ্বারা আবরিত হলেই কেবল তিনি বীমাকারীর নিকট থেকে তার মোটরযানের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন। Motor Comprehensive Insurance দুটি বিষয়ের ঝুঁকি গ্রহণ করে, একটি মোটরযানের নিজস্ব ক্ষতি (own damage) এবং অপরটি তৃতীয়পক্ষের বীমা ঝুঁকি (Third Party Act Liability)। তিনি আরো বলেন, এখানে যথানিয়ম অর্থ বীমা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম মেনে বীমা কোম্পানির নিকট থেকে বীমা সনদ গ্রহণ।

    আবার ৬০(৩) ধারা অনুযায়ী, ‘মোটরযান দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হইলে ৫৩ ধারার অধীন গঠিত সহায়তা তহবিল হইতে কোনো ক্ষতিপূরণ পাইবেন না।’ এই আইনের ৫২ ধারায় বর্ণিত ব্যক্তিগণই শুধু ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী মোটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক এবং মোটর যানের মালিককে তার মোটরযানের জন্য Motor Comprehensive Insurance গ্রহণ করতে হবে। পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এই আইনের ১১১ ধারায় তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পুলিশ অফিসারগণ তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে মোটরযানের মালিকগণ ‘বীমা সনদ’ ব্যতীত তাদের মোটরযান চালাতে পারবে না।

    আইনটির ৬০(১), (২) এবং (৩)-এর যথাযথ প্রয়োগ হলে নন-লাইফ বীমা খাতে প্রিমিয়াম এবং সরকারের রাজস্ব উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। আইনটি যথাযথ প্রয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, পুলিশ মহাপরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ, বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে যৌথসভা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন।

    এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের মহাসচিব মো. ইমাম শাহীন বলেন, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ খসড়ার পর্যায় থেকে অনুমোদন করা পর্যন্ত যদি বীমাখাতের অংশীজনের যুক্তিসঙ্গত পরামর্শ গ্রহণ করা হতো, তাহলে মোটরযান বীমা বিষয়ে যে অস্পষ্টতা বা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে তা থাকতো না।

    তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তৃতীয়পক্ষের বীমা বা বিধিবদ্ধ দায় বীমার প্রিমিয়াম ও ক্ষতিপূরণের সীমা যুগোপযোগী নয় বলেও জানান তিনি। এ ছাড়াও বীমাগ্রহীতা ক্ষতিপূরণ দাবি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ আহত বা মৃত্যুবরণের প্রকৃত সংখ্যার শতকরা দশভাগ দাবিও বীমা কোম্পানির নিকট পৌঁছায় না। এ জন্যই মূলত তৃতীয়পক্ষের ঝুঁকি বীমা (3rd Party Insurance বা Act. Liability Insurance) পৃথকভাবে রাখার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তাই বলে বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইনের গভীরভাবে বিশ্লেষণ এবং তার প্রায়োগিকতা উপেক্ষা করে বীমা সনদ ছাড়াই রাস্তায় গাড়ি চালানো অযৌক্তিক। তাছাড়া বিশ্বের কোনো দেশে বীমা সনদ ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চলাচল করার উদাহরণ নেই বলেও জানান তিনি। এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের এই সিইও প্রশ্ন রেখে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বীমা সনদবিহীন গাড়ি কর্তৃক সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারী বা তৃতীয়পক্ষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে তার দায়িত্ব কে নিবে? সেক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আলোচনাপূর্বক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান প্রয়োজন এবং বীমা সনদ ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চলাচলের বিধিনিষেধ সম্পর্কিত অস্পষ্টতা দূর করে যথাযথ প্রজ্ঞাপন জারি করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তা না হলে একদিকে বীমাখাতে মোটরযান বীমায় প্রিমিয়াম আয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে। অন্যথায় জিডিপিতে বীমাখাতের অবদান বা Penetration কাঙিক্ষত পর্যায়ে নেয়ার উদ্যোগ ব্যাহত হবে।

    এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করা হয়, তবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করতে কাজ করা যায়। এ ছাড়া সুযোগ যে বন্ধ হয়ে গেছে তা নয়, আইন অনুযায়ী বিধি তৈরির সময় দেশের জন্য প্রয়োজন, দেশের মানুষের জন্য এবং তাদের সম্পদের জন্য প্রয়োজন, সে বিষয়গুলো চিন্তা করে বিআরটিএ যদি বিধি প্রণয়ন করে, তাহলে উদ্ভূত সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। সড়ক আইনে ৬০ ধারায় ইন্স্যুরেন্সের যে বিষয়টা আছে, যেখানে এক উপধারায় বীমাকে ঐচ্ছিক করা হয়েছে। আবার দুই উপধারায় ‘যথানিয়মে বীমা করিবেন’ বলা হয়েছে। এই যথানিয়মে বিষয়টি বিধিমালায় স্পষ্ট করা দরকার। যেহেতু সকল সম্পদেরই ঝুঁকি থাকে, তাই এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আমরা চিন্তা করছি প্রিমিয়াম রেট কমানোর বিষয়ে এবং গাড়ির বয়সের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনায় নেয়া যায়। এমনটা হলে কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স গ্রাহকবান্ধব হবে। কেননা একটি গাড়ি যদি দুর্ঘটনায় পড়ে দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয় আর গাড়ির যদি ইন্স্যুরেন্স করা না থাকে, তাহলে পুরোটাই গ্রাহকের ক্ষতি। তবে যদি ইন্স্যুরেন্স করা থাকে, তাহলে গাড়ির মালিক হয়তো ২৫ হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিলো, কিন্তু বাকি এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা বীমা কোম্পানি দিলো। গাড়ি হরহামেশাই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাই একে বাধ্যতামূলক করা উচিত। সেক্ষেত্রে পরিকল্প বা প্রোডাক্ট যেটি আছে, তার কিছুটা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করতে হবে।

    মোটরবীমা বাধ্যতামূলক করতে আইডিআরএ’র পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা যেহেতু সরাসরি অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা অধিদফতরকে চিঠি দিতে পারি না। তাই আমরা আমাদের মন্ত্রণালয়ে এ ব্যাপারে চিঠি দিয়েছি। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আমাদের মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছে। সে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমরা আইডিআরএ, বীমা মালিক ও মুখ্য নির্বাহীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেছি। তারা পরিকল্প তৈরি করবে এবং কীভাবে এর সমাধান হতে পারে, সে বিষয়ে কাজ করবে। এটা আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো এবং মন্ত্রণালয় সেটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। মন্ত্রণালয় যদি এতে সম্মত হয়, তখন কর্তৃপক্ষ এটা বাস্তবায়ন করবেন।

    এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ‘তৃতীয়পক্ষের বীমায় আগে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো লাভবান হতো। ভুক্তভোগী পেতো না, আবার সরকারও পেতো না। কারো কোনো লাভ হতো না। শুধু কোম্পানির লাভ হতো।’ কিন্তু এতে গাড়ি মালিকরা ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এমনটা জানালে বলেন, ‘গাড়ি মালিকরা বীমা না করলে আপনার সমস্যা কি? তারা যদি নিজেরাই নিজেদের রিস্ক কাভার করে, তাহলে বলার কি আছে।’ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে চিঠি দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘যে কোনো আইন হওয়ার পূর্বে বিভিন্ন পক্ষের সাথে বৈঠক হয়। আমরা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে চিঠি দেয়ার পূর্বে সবপক্ষকে নিয়ে বসার জন্য চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কেউ যদি না আসে আমাদের তো কিছু করার নেই।’

    বিআরটিএ চেয়ারম্যানের এমন দায়সারা গোছের বক্তব্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন বীমা-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে এমন জবাব অনভিপ্রেত। বীমাখাতের উন্নয়নে সরকার যেখানে বিভিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, সেখানে চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্য সরাসরি সাংঘর্ষিক। মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি নিয়ে তার এমন মন্তব্য ঠিক হয়নি। তাছাড়া বিআরটিএ’র যে আর্থিক তহবিল গঠন করার কথা সেটা এখন পর্যন্ত করতে পারেনি। তাহলে এ মুহূর্তে সড়ক দুর্ঘটনায় যে মৃত্যু ও আহতের ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর দায় কি বিআরটিএ চেয়ারম্যান নিবেন?

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১৩ জুন ২০২১

    bankbimaarthonity.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে ব্যাংক বীমা অর্থনীতি