নিজস্ব প্রতিবেদক
রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রিন্ট ১৩৪ বার পঠিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় বিজয়ী প্রার্থীদের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী এবং এর মধ্যে কমপক্ষে ১৩ জন শতকোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। ২৯৭ জন বিজয়ী প্রার্থীর মধ্যে ১৭৪ জনই নিজেদের পেশা ব্যবসায়ী হিসাবে উল্লেখ করেছেন। হলফনামায় কেউ কেউ একাধিক পেশার কথা লিখলেও প্রাথমিকভাবে উল্লেখিত পেশাকে মূল পেশা ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যাগত আধিপত্য এখন সুস্পষ্ট। রাজনৈতিক দলভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই চিত্র পাওয়া যায়। প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জয়ী প্রতিনিধিদের বড় অংশই ব্যবসায়ী পটভূমি থেকে উঠে আসা।
স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদে ব্যবসায়ী প্রতিনিধির সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই হার ক্রমেই বেড়েছে। একসময় সংসদে রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, আইনজীবী, কৃষক, চিকিৎসকসহ নানা পেশার মানুষের একটা ভারসাম্য ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ভারসাম্য ভেঙে গিয়ে ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সংসদে যাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে অর্ধেকের কম ছিল ব্যবসায়ী। ১৯৭৩ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ১৮ শতাংশ ছিল ব্যবসায়ী এবং ১৯৯৬ সালে ছিল ৪২.৫ শতাংশ। ২০০১ সাল থেকে সংসদে যাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়ে হয় ৫৮ শতাংশ। সংসদে ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ হয় ২০২৪ সালে যা ছিল ৬৭ শতাংশ। এবার ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ ব্যবসায়ী।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। দলটির বিজয়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রাধান্য স্পষ্ট ১৪৫ জন যা মোট বিজয়ীর প্রায় ৬৯ শতাংশ। জামায়াতের ক্ষেত্রে ৬৮ জন নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ী অর্থাৎ ২৯ শতাংশ। জাতীয় নাগরিক পার্টির ছয়জন নির্বাচিত প্রতিনিধির মধ্যে দুজন ব্যবসায়ী (৩৩%)। স্বতন্ত্রভাবে জয়ী সাত প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন ব্যবসায়ী (৭১.৪২%), যারা সবাই আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নির্বাচনী হলফনামা ও বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক মোট ২৭ জন ধনী প্রার্থী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরিসংখ্যান বলছে, এই ধনী প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেক সংসদে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন, তবে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জয়ী হতে পারেননি। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে অর্থনৈতিক শক্তি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও একমাত্র নির্ধারক নয়।
বিজয়ী ধনাঢ্য ব্যবসায়ী যারা: বিজয়ী শত কোটি টাকার বেশি মালিকদের তালিকায় রয়েছেন ফেনী-৩ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, যিনি ৬০০ কোটির বেশি টাকার সম্পদের মালিক বলে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের বর্তমান চেয়ারম্যান। তিনি এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ছিলেন। ব্যাংকিং, বীমা, কৃষি, শিল্প ও শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। ময়মনসিংহ-১১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির ফখরুদ্দিন আহমেদ, যার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় সংগঠক হিসেবে পরিচিত। সমাজসেবা ও শিক্ষামূলক কর্মকান্ডে যুক্ত থাকার কারণে এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লা-৭ আসনে জয়ী হয়েছেন জাকারিয়া তাহের। তিনি শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং শিল্পখাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কর্মকান্ড ও রাজনৈতিক সংগঠনে সম্পৃক্ততা রয়েছে। বগুড়া-৫ আসনে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। শিল্প ও ব্যবসা খাতের সঙ্গে যুক্ত একজন প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা তিনি। বগুড়া অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে পরিচিত নাম। চাঁদপুর-২ আসনে জালাল উদ্দিন, তিনি ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই সক্রিয়। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে পরিচিতি রয়েছে। শরীয়তপুর-২ আসনে শফিকুর রহমান কিরণ যিনি ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। ঢাকা-৭ আসনে হামিদুর রহমান যার ব্যবসায়িক পটভূমির পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। নগরভিত্তিক উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত।
মৌলভীবাজার-৩ আসনে নাসের রহমান, সমাজসেবা ও জনসম্পৃক্ত কর্মকান্ডে ভূমিকার জন্য এলাকায় পরিচিত। চাঁদপুর-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুল হান্নান যিনি ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে জয়ী হয়েছেন। লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি যিনি একেধারে ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। শরীয়তপুর-১ আসনে সাঈদ আহমেদ যিনি বীমা ও শিপিং খাতের প্রভাবশালী উদ্যোক্তা। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। কর্পোরেট ও সামাজিক খাতেও সক্রিয় তিনি। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির সিনিয়র নেতা মির্জা আব্বাস এবং মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম। এরা সবাই শতকোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হিসেবে নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, এক কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক মোট ৮৯১ জন প্রার্থী এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ২৭ জনের সম্পদ ছিল ১০০ কোটি টাকার বেশি। এ চিত্র দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিত্তশালীদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির স্পষ্ট প্রতিফলন।
টিআইবি’র মন্তব্য: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বাড়লে রাজনীতি ও ব্যবসার ভেদরেখা বিলীন হয়ে যায় এবং রাজনীতি ক্রমে মুনাফাভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়। এতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবে আইন ও নীতিনির্ধারণ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সরকারি ক্রয়খাত রাজনৈতিক যোগসাজশে ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তিনি আরও বলেন, এই প্রবণতা সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা পরিবেশকে ধ্বংস করে দেয় এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে ব্যবসা ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই দুর্বৃত্তায়নের প্রবণতা তৈরি হয়। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ স্তর প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় যা এক ধরনের চোরতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম দেয়। নতুন সরকারের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংসদে এই ব্যবসায়ী প্রভাব কীভাবে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাবকে আরও দৃশ্যমান করেছে। তবে একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট হয়েছে যে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সবাই নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। অর্থ, সংগঠন, রাজনৈতিক প্রভাব, জনসমর্থন ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা- সব মিলিয়েই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি জটিল কিন্তু বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
Posted ১১:৫৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com