নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৪৭ বার পঠিত
আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। গঠন করতে পারেনি গ্রাহক সুরক্ষায় লাইফ ফান্ড। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স এখন খাদের কিনারে। প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মধ্যেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হতে পেরে কোম্পানিটি অনুমোদনের শর্ত লঙ্ঘন করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভবিষ্যতে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বরাবরে দাখিলকৃত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সকল সূচকেই নেতিবাচক চিত্র ফুঁটে উঠেছে যমুনা লাইফের। কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এবং সিএফও স্বাক্ষরিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত দাখিলকৃত বার্ষিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে ৩০.৭০ শতাংশ। আর লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক ১.১২ কোটি টাকা। নির্ধারতি সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও লাইফ ফান্ড সমৃদ্ধ না হওয়ায় উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে আছে বীমা গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত।

দাখিলকৃত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পনিটি ২০২৫ সালে পলিসি হোল্ডারদের কাছ থেকে ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ২২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। মোট প্রিমিয়াম অর্জিত হয় ৩০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির মোট অর্জিত প্রিমিয়াম ছিল ২৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। গত বছরের তুলনায় মোট প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২১.৭৫ শতাংশ। এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রিমিয়াম আয় প্রবৃদ্ধির স্বচ্ছতা নিয়েও। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের মাধ্যমে কাগুজে প্রিমিয়াম সংগ্রহে প্রতিষ্ঠানটির দায় আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেলেও কোম্পানির প্রাণ নবায়ন প্রিমিয়াম হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম অর্জিত হয়েছে ৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগের বছর ২০২৪ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম ছিল ৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় নবায়ন প্রিমিয়াম হ্রাস পেয়েছে ১৩.৭৫ শতাংশ, যা একটি বীমা কোম্পানির জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০২৫ সালে যমুনা লাইফের সরকারী খাতে বিনিয়োগ ১১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। ২০২৪ সালেও সরকারী খাতে বিনিয়োগ ছিল ১১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়েনি। এছাড়া অন্যান্য খাতে ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ উল্লেখ করলেও কোনো গ্রহনযোগ্য ও দৃশ্যমান প্রমাণ দাখিল করেনি কোম্পানিটি। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি ব্যবস্থাপনা ব্যায়ের অনুমোদিত সীমার ৩০.৭০ শতাংশ বেশি ব্যয় করেছে। যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০২৪ সালে ১৪৮.২৮ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ১৩০.৭০ শতাংশ খরচ করেছে। যা বীমা আইন ২০১০ এর ধারা ৬২ এর সুস্পষ্ট লংঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এভাবে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করায় কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে কোনো অর্থ নেই। ২০২৫ সাল শেষে যমুনা লাইফের লাইফ ফান্ড দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১ কোটি ১২ লাখ টাকা। আগের বছর ২০২৪ সালে লাইফ ফান্ড ছিল ঋণাত্মক ৯৭ লাখ টাকা। জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ডকে রক্তের সঙ্গে তুলনায় করা হয়। মানুষ রক্তশূন্য হয়ে পড়লে যেমন বাঁচে না, তেমনি একটি জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে পড়লে ওই কোম্পানির পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বীমা গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পাওয়া মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। এবিষয়ে জীবন বীমা বিশেষজ্ঞরা বলেন, লাইফ ফান্ড হলো এমন একটি ফান্ড যেখানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো অর্থ জমা রাখে এবং সেখান থেকে বিনিয়োগ করে। কোনো বীমা গ্রাহকের মৃত্যু হলে বা অন্য কোনো বীমা দাবী এই ফান্ড থেকে প্রদান করা হয়। একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের লাইফ ফান্ড দূর্বল হলে প্রতিষ্ঠানটি বীমা দাবী পরিশোধের সক্ষমতা হারায়। লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক মানে ওই কোম্পানির কিছুই নেই। নিশ্চিতভাবে কোম্পানিটি সংকটের মধ্যে রয়েছে। এ ধরনের কোম্পানি থেকে গ্রাহকদের বীমা দাবির টাকা পাওয়া অনিশ্চিত। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সার্বিকভাবে কোম্পানিটির বীমা দাবী পরিশোধের সক্ষমতা চরম ঝুকিপূর্ণ এবং এর আর্থিক অবস্থা তলানিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কারণে প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মধ্যেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হতে পেরে কোম্পানিটি অনুমোদনের শর্ত লঙ্ঘন করেছে। বীমা আইন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিমালা অনুযায়ী, অনুমোদন পাওয়ার ৩ বছর বা (আবেদন করে সময় বৃদ্ধি হলে আরো ২ বছর) ৫ বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে না পারলে এটিকে আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়। বীমা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে গণপ্রস্তাব বা শেয়ার বাজারে আসতে ব্যর্থ হলে, অতিরিক্ত সময়ের প্রতিদিনের জন্য ৫,০০০ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা আছে। যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স সময়সীমা পার হওয়ার পরও পুঁজিবাজারে আসতে দেরি করায় আইডিআরএ পর্যায়ক্রমে প্রতিদিনের জরিমানা ধার্য করেছে এবং বারবার আইপিও-র মাধ্যমে পুঁজি তোলার নির্দেশনা ও আল্টিমেটাম প্রদান করেছে।
যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স বর্তমানে চরম আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাহীনতায় ভুগছে। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, শূন্য লাইফ ফান্ড এবং গ্রাহক ধরে রাখতে ব্যর্থতার সার্বিক চিত্র যমুনা লাইফকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম বাড়লেও নবায়ন প্রিমিয়াম হ্রাস পাওয়া প্রমাণ করে গ্রাহকের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় কোম্পানিটি যে আর্থিক সংকটে পড়েছে, তা শুধু তাদের নিজেদের নয়, বীমা খাতের সার্বিক ভাবমূর্তির জন্যও হুমকিস্বরূপ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনা না করলে সাধারণ বীমা গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত ডুবে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
Posted ০৭:৫৪ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com