নিজস্ব প্রতিবেদক
বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬ প্রিন্ট
রিইন্স্যুরেন্স ট্রিটি বা পুনঃবীমা চুক্তি নিয়ে এবারও বেসরকারি নন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অনেকটা দরকষাকষিতে নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত পুনঃবীমাকারী প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি)। সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সাথে পুনঃবীমা চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এই জটিলতা চলে আসছে। আইন অনুযায়ী, দেশের নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর পুনঃবীমা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অপরদিকে বীমা কর্পোরেশন আইন অনুসারে পুনঃবীমাযোগ্য প্রিমিয়ামের ৫০ শতাংশ সাধারণ বীমা কর্পোরেশন পুনঃবীমা করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ফলে প্রতি বছরই ৩১ মার্চের মধ্যে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন সাথে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর পুনঃবীমা চুক্তি নবায়ন করতে হয়। আর এই চুক্তি নবায়নের সময় আসলেই বকেয়া প্রিমিয়াম নিয়ে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এক ধরনের অযৌক্তিক দরকাষাষিতে বসে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন। সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের উদ্দেশ্য থাকে কোম্পানিগুলোর কাছে বকেয়া প্রিমিয়ামের সিংহ ভাগ আদায় করে নেয়া। বীমা কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) বলছে, এবারের পুনঃবীমা চুক্তি নবায়নের জন্য বকেয়া পুনঃবীমা প্রিমিয়ামের ৩০ শতাংশ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি)। অর্থাৎ এই বকেয়া পরিশোধ করলে তারা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে পুনঃবীমা চুক্তি করবে; অন্যথায় তারা পুনঃবীমা চুক্তি করবে না। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, এবার সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের বোর্ড মোহাম্মদ জয়নুল বারী চেয়ারম্যান থাকাকালে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই ৩০ শতাংশ বকেয়া প্রিমিয়াম আদায়ের বিষয়ে একটি লিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যা অস্বাভাবিক ও প্রথাবিরুদ্ধ।
পুনঃবীমা চুক্তি নবায়ন নিয়ে উদ্ভূত এই সংকট নিরসনে সোমবার (৬ এপ্রিল) নন-লাইফ টেকনিক্যাল সাব-কমিটির সভাও করেছে বিআইএ। মূলত এসবিসি’র সাথে আলোচনার আগে কোম্পানিগুলোর অভিন্ন অবস্থান নিশ্চিত করতেই এই টেকনিক্যাল কমিটির সভা ডাকা হয়। এর আগে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সাথে ২০২৬-২০২৭ সালের পুনঃবীমা চুক্তি নবায়ন প্রসঙ্গে এসবিসিকে একটি চিঠি দিয়েছেন বিআইএ প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ।
চিঠিতে এসবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন, উপর্যুক্ত বিষয়ে আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, সম্প্রতি সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সাথে বিভিন্ন নন-লাইফ বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাবৃন্দের সঙ্গে ২০২৬-২০২৭ বছরের রি-ইন্স্যুরেন্স ট্রিটি সংক্রান্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত আলোচনা সভায় বীমা কোম্পানিসমূহের বকেয়া প্রিমিয়ামের ৩০% পরিশোধ এবং Marine Cargo Bordereaux প্রতিমাসে সাবমিট করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন কোম্পানি দ্বিমত পোষণ করে বলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনকে অবহিত করেছে।
Marine Cargo পলিসিতে প্রতিমাসে ইBordereaux সাবমিট করার বিষয়টি একটি অযৌক্তিক বিষয়, কারণ যদি মাসিক ভিত্তিতে Bordereaux প্রেরণ করতে হয় তাহলে অনেক মেরিন কার্গো পলিসি পুনঃবীমার আওতার বাহিরে থাকবে যা কোম্পানিসমূহের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে বীমা সেক্টরে অসম প্রতিযোগিতা, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ব্যবসা স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ কোম্পানি তারল্য সংকটে ভুগছে। এমতবস্থায় সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের নিকট যে সকল বীমা কোম্পানির অপরিশোধিত বীমা দাবির পাওনা রয়েছে তাদের রিইন্স্যুরেন্স নবায়নে কোন অর্থ দাবি না করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি এবং যে সকল কোম্পানির নিকট সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের প্রিমিয়াম বকেয়া রয়েছে তাদের পুনঃবীমা চুক্তি নবায়ন আলোচনা সাপেক্ষে করা যেতে পারে।
এমতবস্থায়, পুনঃবীমা চুক্তি সম্পন্নকরণের তারিখ একমাস বৃদ্ধি পূর্বক পুনঃবীমা চুক্তি নবায়ন বিষয়ে সমাধানের নিমিত্তে আরও ব্যাপক আলোচনার জন্য আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি । ’
দেশে ৪৫ টি বেসরকারি নন লাইফ বীমা কোম্পানি রয়েছে। কোম্পানিগুলো বলেছে, সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের কাছে তাদের কয়েক হাজার কোটি টাকার বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে। অথচ আইন অনুসারে প্রিমিয়াম বকেয়া রেখে পুনঃবীমা চুক্তি যেমন বহাল রাখার সুযোগ নেই, তেমনি ৯০ দিনের মধ্যে পুনঃবীমা দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে আইনে। ফলে দীর্ঘ দিন ধরেই এ বিধান লঙ্ঘন করে আসছে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন।
আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও নানা অজুহাতে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার পুনঃবীমা দাবি নিষ্পত্তি না করে ঝুলিয়ে রেখেছে রাষ্ট্রায়ত্ত পুনঃবীমা কোম্পানি সাধারণ বীমা কর্পোরেশন। ফলে যথা সময়ে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে বেসরকারি নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো। ভাঙতে হচ্ছে স্থায়ী আমানত। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাংক ঋণ নিয়েও গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে হচ্ছে কোনো কোনো কোম্পানিকে।
এই বিপুল পরিমাণ পুনঃবীমা দাবি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে ২০২৪ সালের ২০ মে একটি ত্রিপক্ষীয় সভা করে আইডিআরএ। আইডিআরএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ১০ দফা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যার অষ্টম দফায় বলা হয়, কর্পোরেশন ও নন লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো পুনঃবীমা সংক্রান্ত দেনা পাওনার বকেয়া প্রিমিয়াম ও বকেয়া বীমা দাবির হিসাব ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত করবে এবং একটি ঐকমত্যে পৌঁছাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এ সিদ্ধান্ত মানেনি। সভায় ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তি, বীমা আইনের বিধি-বিধানের আলোকে লস এডজাস্টমেন্ট এবং অডিট রিপোর্ট ও ব্যালেন্সশিটের ফিগার দেখে লস এডজাস্টমেন্ট না করার সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। কোম্পানি সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পুনঃবীমার প্রিমিয়াম আদায়ে যতটা তৎপর; তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ‘অনীহা’ বীমা দাবি পরিশোধে। বিদেশি রিইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো যেখানে শুধুমাত্র সার্ভে রিপোর্ট ও লস ইন্টিমেটেডের ভিত্তিতে পুনঃবীমা দাবির অর্থ পরিশোধ করে দেয়। সেখানে নানা অপ্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে টালবাহানা করে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন।
আইডিআরএ অনুষ্ঠিত ত্রিপাক্ষিক ওই সভায়ও এসব বিষয় তুলে ধরেন নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহীরা। ওই সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, সভায় একজন সিইও বলেন, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন অনেক ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করে বীমা দাবি নিষ্পত্তি না করে ফেরত প্রদান করছে। সাধারণ বীমা কর্পোরেশন যতক্ষণ পর্যন্ত না Acceptance দিচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ডেবিট নোটও পাঠাচ্ছেন না, ফলে কোম্পানি পুনঃবীমা প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে পারছে না।
সভায় বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের বোর্ডের অতিরিক্ত দলিল-দস্তাবেজের চাহিদাকে দায়ী করেন বক্তারা। তারা বলেন, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন যে সকল কাগজপত্রের চাহিদা প্রদান করে যার সাথে বীমা দাবি নিষ্পত্তি সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ বিদেশি পুনঃবীমাকারীরা, যাদের সাথে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনও পুনঃবীমা করে থাকে, তারা শুধুমাত্র সার্ভে রিপোর্ট ও লস ইন্টিমেটেডের ভিত্তিতে পুনঃবীমা দাবির অর্থ পরিশোধ করে থাকে। তারা বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় তথ্যাদি চাওয়ায় কারণে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে যা বীমা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন।
তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইডিআরএ’র ত্রিপাক্ষিক ওই সভায় গৃহীত এসব সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা সাধারণ বীমা কর্পোরেশন প্রতিপালন করছে না। বীমা কোম্পানিগুলোর পাওনা না দিয়েই উল্টো পুনঃবীমা প্রিমিয়ামের জন্য চাপ দিচ্ছে, নোটিশ অব ক্যান্সেলন পর্যন্ত দিয়েছে। আইনগতভাবে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এটি পারে না।
খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক অংশীজন বলেন, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন কোন কোন দাবি নিষ্পত্তি করতে এক যুগ পরে এসেও নতুন নতুন ডকুমেন্টস চায়; যা কোম্পানিগুলোর জন্য সংগ্রহ করা কঠিন। এভাবে করলে কখনোই দাবি নিষ্পত্তি হবে না। কোনো কোনো দাবির ক্ষেত্রে সার্ভেয়ার রিপোর্ট দেয়ার পরেও কর্পোরেশন দাবির অর্থ হ্রাস করেন। সার্ভেয়ার চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়ার পর এর সুযোগ নেই। কিন্তু এটি হচ্ছে। অনেক সময় গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ থাকবে। নানা জটিলতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই এসব বার্ষিক প্রতিবেদনে আনেন না। কিন্তু কর্পোরেশন চায়। যদিও বীমা দাবির সঙ্গে এই প্রতিবেদন কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক নয়।
Posted` ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com