বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x
ক্ষমতা, কৌশল ও বৈশ্বিক প্রভাব

বিশ্বে অস্ত্র রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ দেশ

সজল সরকার

শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬   প্রিন্ট   ১৩১ বার পঠিত

বিশ্বে অস্ত্র রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ দেশ

বিশ্বের ভূরাজনৈতিক সঙ্কট, নিরাপত্তা আলোকপাত এবং কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাণিজ্য আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবার যখন আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বা সংঘাত বৃদ্ধি পায়, তখন অস্ত্রবাণিজ্যের পরিমাণ ও গতি বৃদ্ধি পায়। এই বৃহৎ বাজারে কিছু দেশ বার্ষিক কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে এবং তাদের রপ্তানি ক্ষমতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, নীতির নির্মাণ এবং কৌশলগত সমঝোতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

নিচে বিশ্বের সেই সব দেশগুলো বিশ্লেষণ করা হলো যাদের অস্ত্র রপ্তানির ক্ষমতা সর্বোচ্চ এবং তারা কীভাবে এই অবস্থানে পৌঁছেছে।

১. যুক্তরাষ্ট্র: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ৩২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৪৩%। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র রপ্তানির শীর্ষ দেশ। এর প্রতিরক্ষা শিল্পে বিশাল সক্ষমতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত সম্পর্ক আছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম ও আধুনিক সেন্সর সিস্টেম মিলিটারি বাজারে সর্বাধিক বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য কৌশল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সামরিক সহায়তা ও হাতিয়ার চুক্তির মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি মধ্য ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও টার্গেট করে। ন্যাটো, এশিয়া‑প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ঘাঁটির উপস্থিতি অস্ত্র রপ্তানিকে আরও শীর্ষ অবস্থানে রেখেছে। বিশ্বে প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় বিশাল অংশই যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করে, যা এর আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক কূটনীতি দৃঢ় করে।

২. ফ্রান্স: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ৭.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৯.৬%। ফ্রান্স অস্ত্র রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। এর ভূমিকা বিশেষত ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে দৃঢ়। সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও বায়ু প্রতিরক্ষা সিস্টেমের উৎপাদনে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যিনি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ধরে রেখেছে।
ফরাসী অস্ত্র সরবরাহ মূলত কৌশলগত পার্টনারশিপ ও স্থায়ী কাস্টমার বেসের ওপর ভিত্তি করে চলে। আফ্রিকার কিছু দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাল্ক সরঞ্জাম সরবরাহ ফ্রান্সকে রপ্তানি তালিকার শীর্ষে অবস্থান করিয়েছে।

৩. রাশিয়া: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৭.৮%। রাশিয়া দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে তৃতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। ইউরোপীয় নিরাপত্তা সঙ্কট, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রাশিয়ার কৌশলগত তৎপরতা রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী করেছে।
রাশিয়ার অস্ত্র সরবরাহের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্যময় পণ্য Ñ লড়াকু বিমান থেকে শুরু করে ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম ও সামরিক যান সিদ্ধ পর্যন্ত। এছাড়া রাশিয়ার উৎপাদিত অস্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে কম দামে বিভিন্ন দেশ কেনে, যার ফলে এটি স্থায়ী বাজি হয়ে উঠেছে।

৪. চীন: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৫.৯%। চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে দ্রুত উত্থান করেছে। নতুন প্রযুক্তি, উৎপাদন পেমেন্টের সুবিধা এবং কৌশলগত সহযোগিতার কারণে বিভিন্ন দেশ আজ চীনের কাছে অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক।
চীনের প্রতিরক্ষা খাত এখন বিকাশ লাভ করছে। বিমান, ট্যাঙ্ক, ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জামগুলোর প্রায়শই রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে। দেশের অর্থনৈতিক বর্ধন ও রাজনৈতিক কূটনীতির সমন্বয়ে চীন বিশ্ব অস্ত্র রপ্তানি ক্ষেত্রের শক্তিশালী খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছে।

৫. জার্মানি: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৫.৬%। জার্মানি ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র রপ্তানিকারী দেশ। তার কৌশল হলো উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করা। এখানে বিমান, সাবমেরিন, সেন্সর সিস্টেম ও কন্ট্রোল ইউনিটগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্য।
জার্মানি প্রধানত ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা চুক্তিতে সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকে এবং উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তির বিনিময়েও সক্রিয়।

৬. ইতালি: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৪.৮%। ইতালি ইউরোপীয় বাজারে অস্ত্র রপ্তানিতে সক্রিয়। এর কৌশল হলো সমুদ্রযান, বিমান এবং বিভিন্ন সেন্সর/নেভিগেশন সিস্টেম রপ্তানি করা। ইতালির প্রতিরক্ষা শিল্প কম বাজেটের তুলনায় উচ্চ কার্যক্ষম সরঞ্জাম সরবরাহে বিনিয়োগ করে এবং এটি অন্যান্য দেশগুলোর বাজেট‑সংশ্লিষ্ট পছন্দ হয়ে উঠেছে।

৭. যুক্তরাজ্য: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৩.৬%। যুক্তরাজ্য আধুনিক অস্ত্র সরঞ্জামে দক্ষ। রপ্তানির প্রধান অংশ হলো বিমান, আধা‑স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম। যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ও রাজনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে সরবরাহ করে থাকে।

৮. ইসরায়েল: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ২.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৩.১%। ইসরায়েল আধুনিক সেন্সর, ড্রোন ও সাইবার নিরাপত্তা ভিত্তিক অস্ত্র সরবরাহে সক্রিয়। ছোট একটি দেশ হলেও এর প্রযুক্তি‑ভিত্তিক সামরিক সরঞ্জামগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্যমান সম্পন্ন। নির্দিষ্ট অঞ্চলে কৌশলগত অংশীদারদের সাথে এটি প্রতিরক্ষা ধারায় সক্রিয়।

৯. স্পেন: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ৩.০%। স্পেন সামরিক সরঞ্জামে বিশেষায়িত। এটি সমুদ্রযান, বিমান ও সংশ্লিষ্ট সেন্সর সিস্টেম রপ্তানি করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের সাথে ইন্টার‑গভর্নমেন্টাল চুক্তি স্পেনকে বিশ্ব অস্ত্র বাজারে শক্ত অবস্থানে রাখে।

১০. দক্ষিণ কোরিয়া: রপ্তানি মূল্য: প্রায় ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব বাজার শেয়ার: প্রায় ২.২%। দক্ষিণ কোরিয়া দ্রুত উন্নয়নশীল প্রতিরক্ষা উপাদানগুলো রপ্তানিতে সফল হয়েছে। ট্যাঙ্ক, লড়াকু যান, ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম ও সমুদ্রযান সরঞ্জাম রপ্তানি করে এটি আন্তর্জাতিক বাজারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো দক্ষিণ কোরিয়ার এই সরঞ্জামগুলো কিনতে আগ্রহী।

এই শীর্ষ দেশগুলো কেবল অস্ত্র বিক্রি করে না, তারা আন্তর্জাতিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা চুক্তি এবং রাজনৈতিক সমঝোতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অস্ত্র রপ্তানি একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম যা কোনো দেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও উন্নত করে।

Facebook Comments Box
×

Posted ০৮:১১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০ 
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com