নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ প্রিন্ট ৭২ বার পঠিত
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের জীবন বীমা খাতের ৩৬ কোম্পানির সম্মিলিত লাইফ ফান্ড ৩৯১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বেড়ে প্রায় ৩৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে কোম্পানিগুলোর পাঠানো অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে লাইফ ফান্ডের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৯৯১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
দেশের জীবন বীমা খাতের মোট লাইফ ফান্ড ৩৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও খাতের সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে শক্তিশালী নয়। একদিকে যেখানে মেটলাইফ বাংলাদেশ, ন্যাশনাল লাইফ, ডেল্টা লাইফ ও জীবন বীমা করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার লাইফ ফান্ড রয়েছে, অন্যদিকে কয়েকটি কোম্পানি এখনও ঋণাত্মক লাইফ ফান্ডের বোঝা বহন করছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জীবন বীমা খাতের মোট লাইফ ফান্ডের প্রায় ৭২ শতাংশই মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে সামগ্রিক তহবিলের আকার বড় হলেও খাতের ভেতরে আর্থিক সক্ষমতার বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দায় তার সম্পদের চেয়ে বেশি। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির সলভেন্সি, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং দাবি পরিশোধের সামর্থ্যকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বীমা খাতের বিশ্লেষকদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর উচ্চ কমিশন ব্যয়, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, অকার্যকর বিনিয়োগ এবং নতুন ব্যবসা সংগ্রহে স্থবিরতা লাইফ ফান্ডকে চাপে ফেলেছে। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানের তহবিল এখনও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে মেটলাইফ বাংলাদেশের ১৬ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকার লাইফ ফান্ড একাই পুরো খাতের প্রায় ৪৩ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ন্যাশনাল লাইফের লাইফ ফান্ড প্রায় ৬ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা ডেল্টা লাইফের তহবিল ৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জীবন বীমা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক শক্তি মূল্যায়নে শুধু প্রিমিয়াম আয় নয়, লাইফ ফান্ডের অবস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ এই তহবিল থেকেই ভবিষ্যতে পলিসিধারীদের মৃত্যু দাবি, মেয়াদপূর্তি সুবিধা ও অন্যান্য দায় পরিশোধ করা হয়।
তারা আরও বলেন, যেসব কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক রয়েছে, সেগুলোর জন্য পুনঃমূলধনীকরণ, সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন, বিনিয়োগ পুনর্বিন্যাস এবং কঠোর তদারকি প্রয়োজন। অন্যথায় এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জীবন বীমা শিল্পে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং পলিসিধারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আইডিআরএর উচিত ঋণাত্মক লাইফ ফান্ডে থাকা কোম্পানিগুলোর জন্য পৃথক পুনর্বাসন ও নজরদারি কর্মসূচি গ্রহণ করা। এতে খাতের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যতে দাবি পরিশোধ সক্ষমতা বাড়বে।
আইডিআরএ’র তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে আকিজ তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইফ ফান্ড দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৪৩ লাখ, আলফা ইসলামী লাইফ ৩২৮ কোটি ৪৭ লাখ, আস্থা লাইফ ৬২ কোটি ৩৬ লাখ, বায়রা লাইফ (৫৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা) , বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ৭১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, বেস্ট লাইফ ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা , চার্টার্ড লাইফ ৭৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ডেল্টা লাইফ ৪,২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, ডায়মন্ড লাইফ ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা , ফারইস্ট ইসলামী লাইফ (৯৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা) , গোল্ডেন লাইফ (২৬ লাখ টাকা), গার্ডিয়ান লাইফ ৯৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা , হোমল্যান্ড লাইফ ১৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যমুনা লাইফ (১ কোটি ৮ লাখ টাকা), জীবন বীমা করপোরেশন ৩,১৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা, লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব বাংলাদেশ ৪৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, মেঘনা লাইফ ১,৫২৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ১০৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা, মেটলাইফ বাংলাদেশ ১৬,৬৮৪ কোটি ২১ লাখ টাকা, ন্যাশনাল লাইফ ৬,৮৯৭ কোটি ৪৯ লাখ টাক , এনআরবি ইসলামী লাইফ ১২ কোটি ৩১ লাখ টাকা, পদ্মা ইসলামী লাইফ (৩১২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা), পপুলার লাইফ ১,৪৭৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রগতি লাইফ ৮১৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, প্রাইম ইসলামী লাইফ ৬৮২ কোটি ৩০ লাখ টাকা, প্রগ্রেসিভ লাইফ ৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ১৩ লাখ টাকা, রূপালী লাইফ ৪৮৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, সন্ধানী লাইফ ৭০৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, শান্তা লাইফ (১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা), সোনালী লাইফ ৯১৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, সানফ্লাওয়ার লাইফ ৮৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, সানলাইফ ৪৭ কোটি ১২ লাখ টাকা, স্বদেশ লাইফ (৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা), ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ৪৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, জেনিথ ইসলামী লাইফ ৩১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী জীবন বীমা খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ ৫১ হাজার ৮৮ কোটি টাকা, বিনিয়োগের পরিমাণ ৪২ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা এবং মোট দাবি দায় দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৪০১ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে, আর ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে।
খাত বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিকভাবে লাইফ ফান্ডের প্রবৃদ্ধি জীবন বীমা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও অনিষ্পন্ন দাবির উচ্চ হার এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কয়েকটি কোম্পানির লাইফ ফান্ড নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে, যা তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে,লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হওয়া জীবন বীমা কোম্পানির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়। কারণ লাইফ ফান্ড মূলত পলিসিধারীদের ভবিষ্যৎ দায় পরিশোধের জন্য সংরক্ষিত তহবিল। কোনো কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হলে তা নির্দেশ করে যে প্রতিষ্ঠানটির দায় তার সম্পদের চেয়ে বেশি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, জীবন বীমা খাতের সামগ্রিক লাইফ ফান্ড বৃদ্ধি পেলেও ঋণাত্মক লাইফ ফান্ডে থাকা কোম্পানিগুলো খাতের জন্য একটি দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে শুধু মোট লাইফ ফান্ডের আকার নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের গুণগত মান ও সলভেন্সি অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে। কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড ঘাটতি প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকা।
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইফ ফান্ডও ৩১২.৫৭ কোটি টাকা ঋণাত্মক, যা খাতের অন্যতম বড় ঘাটতি।
বায়রা লাইফ ও শান্তা লাইফের নেতিবাচক অবস্থান তুলনামূলক কম হলেও তা আর্থিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
গোল্ডেন লাইফ, যমুনা লাইফ ও স্বদেশ লাইফের ঘাটতি কম হলেও লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে ঋণাত্মক লাইফ ফান্ডে থাকা জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
Posted ০৮:৫৬ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com