বুধবার ১৯ জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৫ আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পদ্মাসেতু প্রকল্প

দুদকের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলাটিই ছিল আরেক ষড়যন্ত্র

আবুল কাশেম   |   মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২   |   প্রিন্ট   |   147 বার পঠিত

দুদকের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলাটিই ছিল আরেক ষড়যন্ত্র

পদ্মাসেতু প্রকল্পের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত বিশ্বব্যাংকের অনৈতিক চাপের মুখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা কথিত ‘ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগের মামলাটিই ছিল আরেক ষড়যন্ত্রের কৌশল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অসীম সাহসী উদ্যোগ এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দুদকের করা কথিত ‘ঘুষ ও কমিশন ও কমিশন বাণিজ্যের ষড়যন্ত্রের’ মামলায় উল্লেখ করা অভিযোগ অবশেষে মিথ্যে প্রমাণীত হয়েছে। আগের কমিশনের করা এ মামলাটি পরবর্তীতে দুদকের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের দায়িত্বকালে তদন্তে মিথ্যে বলে প্রাণীত হয়েছে। একইসঙ্গে এ মামলায় অভিযুক্তদের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক ঘোষণায় ও জনগণের সহযোগিতায়, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্প সত্যিই বাস্তবায়িত হয়েছে। আগামীকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদ্মাসেতুটি উদ্বোধন করবেন। ইতোমধ্যে সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।

আরও অবাক লাগে পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে দেশি-বিদেশি বহুমুখী ষড়যন্ত্রের প্রমাণ করেছেন দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান। তিনি (মো. বদিউজ্জামান) গণমাধ্যমের সামনে বলেছেন, ‘অহেতুক মিধ্যে অভিযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের চাপেই পদ্মাসেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলাটি করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে ১৩ মার্চ সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে দুদকের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান ও কমিশনার তদন্ত শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিদায়ী অনুষ্ঠানে বিদায়ী এই সত্য কথাটি তারা বলেছিলেন। ওইদিন মো. বদিউজ্জামান বলেছেন, ‘পদ্মাসেতুর দুর্নীতির বিষয়ে অহেতুক অভিযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে। আমরা এই মামলার তদন্ত পর্যায়ে যতই গভীরে গিয়েছি ততই এই অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে মনে হয়েছে। এই মামলা করলে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিবে, পদ্মাসেতু নির্মিত হবে এবং দেশের উপকারে আসবে-এই ভেবে মামলাটি করা হয়েছিল। এই মামলায় দেশের ভাবমূর্তি যেন ক্ষুন্ন না হয়, তাই একজন দক্ষ কর্মকর্তা দ্বারা মামলার তদন্ত করা হয়েছিল। পরে তদন্তে অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে মনে হওয়ায় এর চুড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি) দেওয়া হয়েছে’।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পায়নি কানাডার আদালত। মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান ব্যবসায়ীসহ এসএনসি-লাভালিনের দুই কর্মকর্তাকে। বিশ্বব্যাংকের তদন্তের ওপর ভিত্তি করে কানাডার পুলিশের দেয়া ফোনে আড়ি পাতার পুরো তথ্যই গুজব হিসেবে উল্লেখ করেছে আদালত। টানা ৭ বছর পর মিলল বিচার। বিশ্বব্যাংকের তদন্তের ওপর ভিত্তি করে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের তথ্য-প্রমাণ গুজব বলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে কানাডার অন্টারিও সুপ্রিম কোর্ট। অভিযোগ ছিল, ২০১১ সালে পদ্মাসেতু প্রকল্পের কাজ তদারকির জন্য পাঁচ কোটি ডলারের কাজ পেতে এসএনসি-লাভালিনের কর্মীরা বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়ার পরিকল্পনা করে। তদন্ত শুরু করে বিশ্বব্যাংক। কানাডার পুলিশকে ব্যবস্থা নেয়া দায়িত্ব দেয়া হয়। এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে আদালতে ‘ ফোনে আড়ি পাতা তথ্য’ উপস্থাপন করে পুলিশ। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর এসব তথ্য শোনা কথা বলে উল্লেখ করেন বিচারক ইয়ান নরডেইমার। তথ্যের সোর্স আর তথ্য সংগ্রহে পুলিশের গাফেলতির নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ আদেশের ফলে খালাস পেয়েছেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় ব্যবসায়ী জুলফিকার ভূইয়া, এসএনসি-লাভালিনের দুই কর্মকর্তা কেভিন ওয়ালেস ও রমেশ শাহ। অথচ এই গুজবের কারনেই ২০১৩ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। পদত্যাগে বাধ্য হন তৎকালিন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন। তোপের মুখে পড়েন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীও। যদিও দুদকের তদন্তেও অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দুদকের মামলায়:
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব গোলাম রহমানের আমলে থেকে পৃথক দুটি টিম গঠন করে পদ্মাসেতুর পরামর্শক সংস্থা নিয়োগে দুর্নীতি ও ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগের তদন্তের জন্য। অভিযোগের বিষয় দু’টি হল, রমেশ সাহার কাছ থেকে কানাডীয় পুলিশের জব্দ করা ১০ পার্সেন্ট ঘুষের ডায়েরির অনুলিপি ও মোহাম্মদ ইসমাইলসহ দুদকের মামলার বিদেশী তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ। বাংলাদেশে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ দুজন সাবেক মন্ত্রীকে বাদ রেখে পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর দুদকের উপ পরিচালক আব্দুল্লাহ আল জাহিদের দায়ের করা এই মামলায় ৭জন সাবেক সরকারি কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়।

ওই দুদক থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়, মামলার তদন্তে অভিযোগের যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ না পাওয়ায় সাবেক দু’জন মন্ত্রীকে সরাসরি অভিযুক্ত করা না হলেও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।এখন তদন্তে দু’জন সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ খোঁজা হবে। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত রেখেছে। সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়াসহ ৭জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে সেতু বিভাগেরই সাবেক দু’জন কর্মকর্তা এবং ক্যানাডিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের স্থানীয় প্রতিনিধিসহ চারজন কর্মকর্তা। তবে ঘটনার ব্যাপারে যে রাজনীতিকদের নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল, সেই সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এবং সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসানকে মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, যাদের দায়দায়িত্ব দণ্ডবিধির আওতায় নির্ধারণ করা হয়েছে, তাদেরকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর যাদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু তথ্যপ্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তাদেরকেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। অভিযোগের অনুসন্ধান যখন চলছিল, তখনও সাবেক ঐ দু’জন মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমানসহ অনেককের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলও দুদফায় ঢাকায় এসে দুদকের অনুসন্ধান কাজ নিয়ে কথাবার্তা বলেছে। অভিযুক্ত কারা হবেন, তা নিয়ে দুদক এবং বিশ্বব্যাংকের প্যানেলের মধ্যে ঐকমত্য হয়নি। এমন খবরও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। ওই সময় দুদকের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর এখন যে মামলা হলো, দুদকের আইন অনুযায়ী সর্ব্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে দুদকই তার তদন্ত করে চার্জশিট দেবে। যার ভিত্তিতে বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু পরবর্তীতে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জানের আমলে মামলাটি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় অভিযুক্তদেরকে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক :
মামলার তদন্তকালে দুদকের প্রধান আইনজীবী বর্তমানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে সৈয়দ আবুল হোসেনকে অভিযুক্ত করার জন্য বলা হয়েছিল। আমরা বলেছি, সৈয়দ আবুল হোসেনকে অভিযুক্ত করার মতো তথ্য প্রমাণ কিছু নেই। তখন বিশ্বব্যাংক বলেছিল, তদন্তে তার নাম এলে তখন কি হবে। তাতে আমাদের জবাব ছিল , তদন্তে তথ্য প্রমাণ এলে ,অবশ্যই তাকে অভিযুক্ত করা হবে। তবে অন্য ৭ জন অভিযুক্তের ব্যাপারে দুদক এবং বিশ্বব্যাংক একমত হয়েছিল বলেও আনিসুল হক উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানিয়ে ছিলেন, ঘটনায় যেহেতু অর্থের লেনদেন হয়নি সে কারণে মামলায় দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং দুদক দু’পক্ষই এতে একমত ছিল।

এ মামলার তদন্তকালে দুদকের উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলমকে সঙ্গে নিয়ে পর পর দুইবার কানাডায় যান দুদকের বিজ্ঞ আইনজীবী বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। কিন্তু কানাডা থেকে কোন তথ্য উপাত্ত উদ্ধার করতে পারেননি দুদকের এই টিম। দেশে এসে গণমাধ্যমকে তারা জানান, ওই সময় কানাডার আদালতে এই মামলার আসামী রমেশসহ অপর আসামীদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। এমতা অবস্থায় কানাডা থেকে বাংলাদেশ এ মামলায় কোন তথ্য উপাত্ত পাচ্ছে না।

২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া প্রান্তে পদ্মাসেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন:
২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া প্রান্তে পদ্মাসেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু ২০০১ সালে ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বানে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করেন। ক্ষমতার পালাবদলে থমকে যায় পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ। উল্টো চলতে থাকে স্থান নির্বাচন নিয়ে বির্তক। তবে সব জট আর স্থবিরতা খোলে ২০০৯ সালে, আবারো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর। ক্ষমতায় আসার মাত্র ৬ মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায় সেতুর নকশা।

২০১২ সালে জুনে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর আবার তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। কিন্তু আশা ছাড়েনি বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন,’আমরা নিজেদের অর্থে এই পদ্মাসেতু নির্মাণ করব। আমরা যে পারি সেটাও আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে চাই, আমরা কারো কাছে ভিক্ষা চাইতে যাই না, হাত পেতে চলতে চাই না। নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে চলব এবং আমরা আবকাঠামো নিজেরাই গড়ে তুলবো’। ২০১৪ সালের ১৭ জুন সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির সঙ্গে। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর সেতুর মূল অবকাঠানো নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। আজ স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Facebook Comments Box
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Posted ৭:৪৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
প্রধান সম্পাদক: মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
নিউজরুম:

মোবাইল: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১

ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫, ই-মেইল: bankbima1@gmail.com

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।