মুহাম্মদ নুরুল আলম চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ প্রিন্ট ৫০ বার পঠিত
অ্যাকচ্যুয়ারি কি এবং বীমা শিল্পে একচ্যুয়ারি কেন? অনেকের প্রশ্ন এসে যায়। অ্যাকচ্যুয়ারি মূলত এসেছে Latin শব্দ Actuarius থেকে, যার অর্থ হলো হিসাব রক্ষক বা তথ্য সংরক্ষণকারী। অ্যাকচ্যুয়ারি হলো বীমা গাণিতিক বিজ্ঞান। এটি এমন একটি বিদ্যা যা প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর নিয়মিত পর্যবেক্ষণে গাণিতিক এবং পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি প্রয়োগ করে ঘটনাবলীর ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা মূল্যায়ন করা হয়। এই পদ্ধতি বা এই নীতি প্রণয়নে কোম্পানী এবং গ্রাহকদের ওপর এর আর্থিক প্রভাব কমিয়ে আনে। উইলিয়াম মরগান এফআরএস একজন ব্রিটিশ নাগরিক যার জন্ম হয় ২৩ মে, ১৭৫০ সালে এবং মৃত্যু ০৪ মে, ১৮৩৩ সালে। যিনি চিকিৎসক, পদার্থবিদ এবং পরিসংখ্যানবিদ, যাকে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল বিজ্ঞানের আধুনিক জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উইলিয়াম মরগান, তিনিই পৃথিবীর প্রথম অ্যাকচ্যুয়ারি, যিনি ১৭৭৪ সালে Equitable Life Assurance Society হিসেবে নিযুক্ত হন এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানে তিনি ৫৬ বছর কাজ করেছিলেন। সেখানে তিনি প্রতি বছর বীমা তহবিলের হিসাব, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, মৃত্যুহার ও প্রিমিয়াম নির্ধারণ ইত্যাদি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করেন। এই রিপোর্টগুলোই ইতিহাসে প্রথম Actuarial Report নামে পরিচিত হয়।
মরগানের সময়কালে জীবন বীমার ধারনাটি ছিল নতুন। মানুষের তখনও জীবন বীমার ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা বা গুরুত্ব সম্পর্কে ধারনা মাত্রই ছিল না। কিন্তু মরগান তাঁর প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে বীমা নীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি বয়স, মৃত্যুহার, লাভের হার এবং আর্থিক ঝুঁকি ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে মডেল তৈরি করেন, যা বীমা প্রিমিয়াম নির্ধারণে সহায়তা করে। এই পদ্ধতিই আজ একচ্যুয়ারি বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
সাধারণত: পেশাদার ব্যক্তিকে অ্যাকচ্যুয়ারি বলা হয়। অ্যাকচ্যুয়ারি বীমা, পেনশন ও আর্থিক শিল্পে জড়িত থাকেন। অ্যাকচ্যুয়ারি হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি ব্যবসায়িক নির্বাহী, গাণিতিক, অর্থদাতা, সমাজবিজ্ঞানী এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপকের সমন্বয় । এক কথায় অ্যাকচ্যুয়ারি হলেন সমস্যা সমাধানকারী যারা ভবিষ্যতের ঘটনাগুলোর আর্থিক, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রয়োগগুলো সংজ্ঞায়িত, বিশ্লেষণ এবং সমাধান করার জন্য অ্যায়ারিয়াল বিজ্ঞান ব্যবহার করেন।
অ্যাকচ্যুয়ারি একটি সম্মানজনক পেশা। এই পেশায় যেমন যথেষ্ঠ মর্যাদা রয়েছে তেমনি চাকুরিক্ষেত্রে একজন অ্যাকচ্যুয়ারি একজন চাটার্ড একাউন্টেন্ট থেকে বেশি আয় করে থাকেন। দূঃখজনকভাবে সত্য যে বাংলাদেশে এখনো অ্যাকচ্যুয়ারি পেশাটি যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। আমাদের দেশে মাত্র দুই জন অ্যাকচ্যুয়ারি কাজ করছেন যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। অথচ বাংলাদেশে লাইফ এবং নন-লাইফ বীমার সংখ্যা মোট ৮২ (বিরাশি)। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে রয়েছে ৬০০ জন অ্যাকচ্যুয়ারি, মালয়েশিয়ায় ১৬৪ জন এবং পাকিস্তানে ৮৮ জন। তবে সাম্প্রতিককালে বীমা খাতের প্রসার ও অর্থনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্র্র্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ধীরে ধীরে অ্যাকচ্যুয়ারি বিষয়ে বীমা কর্মীদের আগ্রহ বাড়ছে।
বাংলাদেশে অ্যাকচ্যুয়ারির যথেষ্ঠ সংকট রয়েছে। কেননা আমাদের দেশে এর যথাযথ মূল্যায়ন ও চাকুরির সুবিধা দেয়া হয়না। যার কারণে ভালো ছাত্রগুলো দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অ্যাকচ্যুয়ারি ছাড়া বীমা শিল্প চলতে পারেনা। যদি প্রত্যেক কোম্পানিতে একজন করে অ্যাকচ্যুয়ারি থাকেন তাহলে এই খাতের ভিত্তি আরো মজবুত হবে। উন্নত দেশে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল ডিগ্রিকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও উচ্চ আয় সম্পন্ন পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে তাদের বীমা খাত টেকসই উন্নয়ণ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। অ্যাকচ্যুয়ারির কর্মক্ষেত্র অনেক যেমন- জীবন বীমা, সাধারণ বীমা, পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ভবিষ্যৎ তহবিল, স্কীম মূল্যায়ন, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাসমূহ, তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্র, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র ইত্যাদি।
বাংলাদেশে বীমা খাতে অ্যাকচ্যুয়ারির সংকট নিরসনে যেসব পদক্ষেপগুলো নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি তা হলোÑ
১) বীমা খাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেয়া;
২) এই সেক্টরে বর্তমানে যারা কাজ করছেন তাদের সন্তানদের বীমা পেশায় উদ্বুদ্ধ করা;
৩) অ্যাকচ্যুয়ারি পেশা সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে সভা-সেমিনার ও কর্মশালা ইত্যাদি অনুষ্ঠান এর মাধ্যমে জনগনের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা;
৪) যেসব অ্যাকচ্যুয়ারি বাংলাদেশের নাগরিক অথচ দেশের বাহিরে অবস্থান করছেন তাঁদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখা;
৫) স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্য বইতে বীমা বিষয়ের পাশাপাশি অ্যাকচ্যুয়ারি বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা;
৬) সরকারি-বেসরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানে বীমা সম্পর্কে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা থাকে সেখানে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা করা;
৭) বর্তমানে কোম্পানিগুলোতে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল ট্রেইনি অফিসার হিসেবে দুটো পদ সৃষ্টি করা;
৮) বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) কর্তৃক “ডিপ্লোমা ইন একচ্যুয়ারিয়াল সাইন্স” কোর্সে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা;
৯) বাংলাদেশে “বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ইন্সটিটিউট অব অ্যাকচ্যুয়ারি” প্রতিষ্ঠা করা;
১০) বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্র্র্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর কর্মকর্তা, অ্যাকচ্যুয়ারি এবং অভিজ্ঞ বীমাবিদদের নিয়ে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা;
মোদ্দা কথা, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বীমা এক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। সুতরাং বীমা শিল্পের উন্নয়ন এবং এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা/কর্মচারী ও গ্রাহকদের সুরক্ষার জন্য অ্যাকচ্যুয়ারি অবশ্যই প্রয়োজন। কেননা অ্যাকচ্যুয়ারি ছাড়া বীমা চলতে পারেনা। এছাড়া অ্যাকচ্যুয়ারির জনক উইলিয়াম মরগান, যিনি ছিলেন ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্থপতি, তাঁর নীতি এবং আদর্শ আমাদের অনুসরণ করা উচিত। কেননা অ্যাকচ্যুয়ারি বিজ্ঞানের প্রতিটি অধ্যায়েই মরগানের ছায়া বিরাজমান। তাঁর কাজের মাধ্যমেই মানুষ বুঝেছে গণিত শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি মানুষের ভবিষ্যতের আর্থিক সুরক্ষার এক বাস্তব হাতিয়ার।
Posted ০৭:০৫ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com