Ad
x

ইসলামী বীমা ও প্রচলিত বীমা

বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬   প্রিন্ট   ১০৩ বার পঠিত

ইসলামী বীমা ও প্রচলিত বীমা

“বণিকের মানদন্ড দেখা দিল রাজদন্ড রূপে পোহালে শর্বরী”-একসময় বণিকবেশী ইংরেজরা বাণিজ্য বসতের ছত্রছায়ায় শুধু এ উপমহাদেশেই নয়, প্রায় সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শাসন ও জনগণকে শোষণের চুড়ান্ত করে অবশেষে প্রকৃতির আমোঘ নিয়মে বিদায় নিয়েছে।

অবশ্য আজিকার আধুনিক বিশ্বে সহজে কোন দেশ শক্তির জোরে অপর কোন দূর্বল দেশ জয় করে শাসন-শোষণের হাতিয়ার চালাতে পারে না। পারা সম্ভবও নয়। তাই আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে উন্নত দেশসমূহ তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রচ্ছন্ন থাবা বিস্তার করে তাদের পূর্বেকার প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখতে সতত সচেষ্ট। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমানের আধুনিক বিশ্বে যে কোন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ব্যাংক ব্যবসার পাশাপাশি বীমা শিল্পে বিশেষতঃ সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা শিল্প এক উজ্জল ও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে দীর্ঘ স্থলপথ ভ্রমন ও জলপথে নৌ-ভ্রমনের মাধ্যমে ইউরোপীয়গন বীমা শিল্পের গোড়া পত্তন করেন, যা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ইসলামের আবির্ভাবের দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রথমবাবের মতো সাধারণভাবে ইসলামী বীমা ব্যবস্থার প্রচলন হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটা এমনি এক সময় ঘটে, যখন আরবের মুসলমান বণিকেরা ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নৌ-পথে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে থাকেন। তখন তারা দলবদ্ধভাবে যৌথ তহবিল গঠন করতেন এবং প্রয়োজনে এ যৌথ তহবিল হতে একে অন্যের দিকে সাহায্য সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করে দিতেন; অর্থাৎ কেউ কোনরূপ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কোন প্রকার ব্যবসায়িক লোকসানের কবলে পতিত হলে গঠিত যৌথ তহবিল থেকে তাকে ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে আর্থিক সহায়তা দান করা হতো। এমতাবস্থায় ব্যবসা পুনর্গঠন, পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নতি ও স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ও ক্ষতি লাঘব করার নিমিত্তে বাস্তব জীবনে বীমা ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজনীয় তথা অপরিহার্য বলে ইসলামী শরীয়াহ্ বিশারদ ও চিন্তাবিদগণ পারস্পরিক সহযোগিতা ও কল্যাণের জন্য ইসলামী বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমানে মুসলমানদের জন্য অতীব গর্বের বিষয় যে, অধুনা বিশ্বে মুসলিম দেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন অমুসলিম দেশও সহযোগীতা ও কল্যাণের মূর্ত প্রতীক ইসলামী বীমা ব্যবস্থা চালু করেছে। অতীব আনন্দের কথা এ ব্যাপারে বাংলাদেশও আজ পিছিয়ে নেই। আমাদের দেশেও অতি সাম্প্রতিক প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার পাশাপাশি ইসলামী বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। ইসলামী বীমা ব্যবসার ত্বরিত প্রভূত প্রসারে এটা পরিষ্কারভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, এদেশে আরো আগে এ ইসলামী বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অবদান রাখতে সক্ষম হতো। তবে নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই, আগামী দিনগুলো এর স্বাক্ষর রাখবে বলে আমাদের দৃঢ় প্রতিতী। এছাড়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ইসলামী বীমার জন্য নতুন আইন প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন, যা এই সেক্টরের জন্য আর একটি মাইল ফলক। এক্ষণে ইসলামী বীমা ও প্রচলিত বীমা ব্যবস্থা ও ধারণার মধ্যে যেসব মৌলিক পার্থক্যগুলো বিদ্যমান তার তুলনামূলক বিবরণ নিম্নে বর্নিত হলোঃ ১. ইসলামী বীমা শরীয়াহ্ অনুযায়ী পরিচালিত। প্রচলিত বীমায় এ ধরনের কোন শরীয়াহ্ পালন করা হয় না। ২. পারস্পরিক কল্যাণ ও সহযোগিতাই ইসলামী বীমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। মুনাফা অর্জনই প্রচলিত বীমার একমাত্র ও প্রাথমিক লক্ষ্য। ৩. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতার মধ্যে প্রতিনিয়ত সুসম্পর্ক বজায় থকে। প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় তা কম দেখা যায়। ৪. ইসলামী বীমা যেহেতু ইসলামী শরীয়াহ্ অনুযায়ী পরিচালিত সেহেতু এতে সকল প্রকার লেনদেন ও বিনিয়োগে সুদ অবশ্যই পরিত্যাজ্য। প্রচলিত বীমায় সকল প্রকার লেনদেন ও বিনিয়োগে সুদ বা রীবার সংস্পর্শ থাকে, এতে কোন প্রকার বাধা নিষেধ নেই। ৫. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বক্তিগতভাবে মুনাফা লাভের প্রশ্ন ওঠে না, যেহেতু এ সংস্থা সমবায়ভিত্তিক। প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে মুনাফা লাভের প্রশ্ন অপরিহার্য। ৬. ইসলামী বীমা ব্যবস্থার সব কর্মকান্ডে স্বচ্ছতা বজায় থাকে। বীমা পলিসিতে অস্বচ্ছতা বা ঘারার উপাদান থাকে না। অন্যদিকে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় অস্বচ্ছতা বা ঘারার উপাদান থাকে। ৭. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বীমা পলিসিতে জুয়ার উপাদান থাকে না। কিন্তু প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় বীমা পলিসিতে জুয়ার উপাদান থাকতেও পারে বলে মনে হয়। ৮. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় মানুষের কল্যাণের জন্য যাকাত বা সাদাকা তহবিল গঠন করা হয়। অপরপক্ষে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় ঐ ধরনের কোন তহবিল গঠনের বিধান নেই। ৯. ইসলামী বীমা শরীয়াহ্ মোতাবেক পরিচালনার জন্য একটি শরীয়াহ্ কাউন্সিল গঠন করা হয়। প্রচলিত বীমা যেহেতু শরীয়াহ্ ভিত্তিক নয়, সেহেতু কোন শরীয়াহ্ কাউন্সিল গঠন করার প্রশ্নই ওঠেনা। ১০. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় সহযোগী সকল সদস্যগণ লাভ-লোকসানের অংশীদার, যেহেতু এ বীমা ব্যবস্থা মুদারারা নীতিতে অংশীদারিত্বের প্রস্থা ভিত্তিতে পরিচালিত। অন্যদিকে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় এভাবে লাভ-লোকসানের অংশীদার এবং মুদারাবা নীতির কোন ব্যবস্থা নেই।

উল্লেখিত পার্থক্যসমূহ পর্যালোচনান্তে প্রতীয়মান হবে যে, ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বিশেষ কয়েকটি সুবিধা বিদ্যমান যা এতদসংক্রান্ত ইসলামী শরীয়াহ্র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার সঙ্গে পার্থক্য সূচিত করে। ইসলামে সুদের লেনদেন ও কায়কারবার নিষিদ্ধ বিধায় ইসলামী বীমা ব্যবসার সুদ পরিহার করার ফলে ইসলামী বীমা গ্রহণকারী তথা পলিসি হোল্ডারগণ উভয়েই হালাল মুনাফা তথা হালাল আয় অর্জনের পথ নিশ্চিত করে। এ বীমা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী তথা পলিসি হোল্ডারগনের অংশগ্রহনের ব্যবস্থা বিদ্যমান হেতু ইসলামী বীমা কোম্পানীর উদ্যোক্তা ও অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে লাভলোকসানের হারাহারি বন্টনের মাধ্যমে অংশীদারীত্বের উপাদান বিদ্যমান, যা কিনা প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সঞ্চয়ই সমৃদ্ধি বহন করে। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় অংশীদারীত্বের উপাদান বিদ্যমান থাকায় সমাজের সর্বস্তরের জনগণ, কৃষিজীবি, পেশাজীবি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী সকলেই ইসলামী বীমা-জীবন বীমা, সাধারণ বীমার পলিসি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবেন। ফলে প্রিমিয়াম হিসাবে প্রদত্ত অর্থ বীমা তহবিলে সঞ্চিত হয়ে তহবিল গঠন ও তা বিনিয়োগে সহায়ক হবে। তার ফলে আর্থ-সামজিক উন্নয়নে যথাযথ অবদান রাখবে। এতদভিন্ন ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় শরিয়তসিদ্ধমতে বীমা ব্যবস্থা তথা বীমা ব্যবসা নিশ্চিতকরণ ছাড়াও ইসলামী ন্যায়নীতির ভিত্তিতে আহরিত সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের হাতে কুক্ষিগত না হয়ে কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডার ও পলিসি হোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ বন্টনের ফলে সমাজে ন্যায়ানুগভাবে সম্পদের বন্টন নিশ্চিত হবে। তাই ইসলামী ইনসাফের ভিত্তিতে সমাজের সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রসার আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম।

Facebook Comments Box

Posted ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com