নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৪৩ বার পঠিত
দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন সংকট আরও গভীর হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে একের পর এক ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা।
কিছু ব্যাংকে মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক ঘাটতির একটি অংশ সমন্বয় হয়েছে। এরপরও মার্চ শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। তিন মাস আগে, অর্থাৎ গত ডিসেম্বর শেষে নিট ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র এক প্রান্তিকে ব্যাংক খাতের নিট মূলধন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশের আর্থিক দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দ্রুত বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ। কোনো ঋণ খেলাপি হলে তার বিপরীতে ব্যাংককে বেশি হারে প্রভিশন রাখতে হয়। এতে আয় কমে যায় এবং লোকসান হলে ব্যাংকের মূলধনেও সরাসরি চাপ পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে এ ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতি আরও বেড়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেও এ সংকটের জন্য দায়ী করছেন। তাদের মতে, অতীতে আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ, ঋণ যাচাইয়ে দুর্বলতা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদন হয়েছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় এখন ব্যাংকগুলোকে তার আর্থিক দায় বহন করতে হচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ফলে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ এবং মূলধন ঘাটতি পূরণ—দুই দিক থেকেই ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, কোনো ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়ে পড়লে প্রথমেই আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। একটি ব্যাংকের সংকট অন্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২০ থেকে ২১টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে থাকা সামগ্রিক ব্যাংক খাতের দুর্বল অবস্থাকেই তুলে ধরে।
এদিকে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা পরিমাপের অন্যতম সূচক ক্যাপিটাল-টু-রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও বা সিআরএআরও আরও নেমেছে। মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের সিআরএআর ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে এটি ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সিআরএআর বজায় রাখার কথা।
সবচেয়ে বেশি ঘাটতি যেসব ব্যাংকে:
মার্চ শেষে সবচেয়ে বড় মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
এর পরের অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটির ঘাটতি ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬৭ লাখ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৩০ হাজার ৩০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬ হাজার ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৮৪ কোটি ৯৮ লাখ, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫৯ লাখ এবং অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ২৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি এবং নেতিবাচক সিআরএআর—এই তিন সূচক একসঙ্গে ব্যাংক খাতের আর্থিক চাপকে স্পষ্ট করে তুলছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত পুনর্গঠন, মূলধন জোগান এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
Posted ০৬:৫৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com