নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১১ বার পঠিত
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মদক্ষতা যাচাইয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ছয় মাস পরপর প্রায় ৩০টি সূচকের ভিত্তিতে ব্যাংকপ্রধানদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে। এতে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৬৫-এর কম পাওয়া এমডি-সিইওদের ‘বিলো অ্যাভারেজ’ বা গড়ের নিচে কর্মদক্ষতাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনীয় উন্নতি না হলে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, এমনকি অপসারণের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের কাছে ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস (কেপিআই) ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাসেসমেন্ট অব দ্য পারফরম্যান্স অব ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার’ শীর্ষক কাঠামো পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন ব্যবস্থায় শুধু এমডি-সিইও নিয়োগের সময় তাদের যোগ্যতা যাচাই নয়, দায়িত্ব পালনকালেও নিয়মিত কর্মদক্ষতা পরিমাপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণ, সুশাসন, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা মানা এবং গ্রাহকসেবায় ব্যাংকপ্রধানের ভূমিকা এখন আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নের আওতায় আসছে।
৬৫ শতাংশের নিচে হলে অদক্ষ:
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত স্কোরিং ব্যবস্থায় ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭৫ বা তার বেশি পাওয়া এমডি-সিইওকে ‘অ্যাবোভ অ্যাভারেজ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম নম্বর পাওয়া কর্মকর্তারা ‘অ্যাভারেজ’ এবং ৬৫-এর নিচে পাওয়া কর্মকর্তারা ‘বিলো অ্যাভারেজ’ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ৬৫ শতাংশের কম নম্বর পাওয়া ব্যাংকপ্রধানদের প্রথমে সতর্ক করা হতে পারে। কর্মদক্ষতায় প্রত্যাশিত উন্নতি না হলে বা গুরুতর ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের পদ থেকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
পাঁচ খাতে ১০০ নম্বর:
এমডি-সিইওদের মূল্যায়নের জন্য পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের সচ্ছলতা ও তারল্যের জন্য ২৫ নম্বর, সম্পদের মানের জন্য ২৫ এবং সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও ২৫ নম্বর রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণের জন্য ১৫ এবং মুনাফাযোগ্যতার জন্য ১০ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে। এসব খাতের অধীনে প্রায় ৩০টি সূচকে ব্যাংকপ্রধানদের কার্যক্রম যাচাই করা হবে।
খেলাপি ঋণ কমানোর দায়ও এমডির:
নতুন কাঠামোয় খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের মোট ও নিট খেলাপি ঋণের হার, মন্দ ঋণের পরিমাণ, খেলাপি ঋণ থেকে নগদ আদায় এবং অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ মূল্যায়নে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অর্থাৎ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লে তার প্রভাব পড়বে এমডি-সিইওর মূল্যায়নে। একইভাবে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাও নম্বরের মাধ্যমে পরিমাপ করা হবে।
ঋণ-আমানত অনুপাত বা এডিআরও থাকবে মূল্যায়নের আওতায়। আমানতের কত অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা—৮৫ বা ৮৭ শতাংশ—ব্যাংকটি যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না, তা দেখা হবে।
বড় গ্রাহকের কাছে ঋণ কতটা কেন্দ্রীভূত:
ব্যাংকের ঋণ কয়েকজন বড় গ্রাহকের হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে কি না, সেটিও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শীর্ষ ১০ বা ২০ গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ এবং একক গ্রাহকের ঋণসীমা বা ‘সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট’ মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
এর ফলে ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুশাসনেও নম্বর:
এমডি-সিইওদের মোট মূল্যায়নের এক-চতুর্থাংশ নম্বর নির্ধারিত হয়েছে সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও বিধিবিধান পরিপালন, মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণও মূল্যায়ন করা হবে। সিএমএসএমই, কৃষি ও সবুজ অর্থায়নের মতো অগ্রাধিকার খাতে ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগও বিবেচনায় থাকবে।
নতুন এমডিকে কর্মপরিকল্পনা দিতে হবে:
কোনো ব্যাংকে নতুন এমডি বা সিইও নিয়োগের পর পরবর্তী পরিচালনা পর্ষদ সভায় তার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে সেই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে।
বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত এমডি-সিইওদের ক্ষেত্রে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের কার্যক্রম দিয়ে প্রথম মূল্যায়ন শুরু হবে। অর্থাৎ নতুন ও বর্তমান—দুই ধরনের ব্যাংকপ্রধানই এই মূল্যায়ন কাঠামোর আওতায় আসছেন।
ছয় ক্ষেত্রে ঘাটতি হলে নম্বর কাটবে:
মূল্যায়নে ছয়টি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে অর্জিত মোট নম্বর থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ নম্বর পর্যন্ত বাদ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে সামগ্রিক স্কোর ভালো হলেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো সূচকে বড় ধরনের দুর্বলতা থাকলে চূড়ান্ত ফলাফলে তার প্রভাব পড়বে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো এমডি-সিইও ১০০-এর মধ্যে ৭৫ দশমিক ৫০ নম্বর পেলেও নির্ধারিত সূচকে ঘাটতির কারণে ৫ দশমিক ৮ নম্বর বাদ গেলে তার চূড়ান্ত স্কোর হবে ৭০ দশমিক ৪২।
‘জবাবদিহি বাড়বে’:
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। তবে ছয় মাসের পরিবর্তে বছরে একবার মূল্যায়ন করা হলে তা আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। অনেক ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানকে সন্তুষ্ট রেখে এমডিরা দীর্ঘদিন একই পদে থেকে যান। নিয়োগের সময় যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকালেও যদি নির্ধারিত কাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কাঠামো কার্যকর হলে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের দায়িত্ব পালনের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। আর্থিক ফলাফল থেকে খেলাপি ঋণ, সুশাসন থেকে গ্রাহকসেবা—সবকিছুর জন্য নির্ধারিত সূচকে নম্বর দিতে হবে। ফলে ব্যাংকপ্রধানদের কর্মদক্ষতা আর শুধু পরিচালনা পর্ষদের মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছেও তাদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
Posted ০৯:০২ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com