বুধবার ৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x

বিশ্বজুড়ে তেল সংকট: বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ ১০ দেশ

রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬   প্রিন্ট   ৫৫১ বার পঠিত

বিশ্বজুড়ে তেল সংকট: বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ ১০ দেশ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক গভীর শঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে যদি তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অনেক দেশের অর্থনীতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। তেলের ওপর নির্ভরতা বেশি এমন দেশগুলো, যেখানে স্থানীয় উৎপাদন সীমিত এবং বিকল্প উৎস খুব কম, সেখানে জ্বালানি সংকট দ্রুত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

বিভিন্ন দেশের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভারত, মায়ানমার, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশকেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নিম্নে ১০ দেশের চিত্র তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশ (তেলের ওপর উচ্চ নির্ভরতা ও জনজীবনের প্রভাব): বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তরল জ্বালানি ও এলএনজি ব্যবহার বাড়ছে। তেলের আমদানিতে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠাপড়ার প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে সরাসরি পড়ছে।
সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়বে, শিল্প উৎপাদন কমে যাবে এবং পরিবহন খাতে খরচ বৃদ্ধি পাবে। কৃষকরা জ্বালানি সংকটে সেচ, সারের ব্যবহার এবং যান্ত্রিক কৃষিকাজ করতে পারবেন না। বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য জীবনযাত্রা কঠিন করবে।
সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয় ও মজুদ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা প্রবর্তনের পরিকল্পনা করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও শুরু হয়েছে।

পাকিস্তান (বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের সঙ্গে তেলের চাপ):পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে ভুগছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাত আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও শিল্প উৎপাদন কমে যাবে।
সরকার ইতোমধ্যেই জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি জনগণের জন্য জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্প উৎপাদনে শিডিউল পরিবর্তন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং পরিবহন ব্যাহত হওয়ার কারণে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে।

শ্রীলঙ্কা (অর্থনৈতিক দুর্বলতার মধ্যে নতুন ঝুঁকি): শ্রীলঙ্কা সাম্প্রতিক অতীতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। দেশটির তেলের প্রায় সব আমদানির উৎস বিদেশ। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও পরিবহন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকার ইতোমধ্যে জরুরি তেল মজুদ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয়ী ব্যবস্থা এবং পরিবহন খাতে সীমিত রেশনিং কার্যক্রম চালু করেছে। কৃষি খাতে জ্বালানি ঘাটতি বাড়লে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট আরও তীব্র হতে পারে।

ফিলিপাইন (দ্বীপরাষ্ট্রের সরবরাহ সংকট): ফিলিপাইন একটি দ্বীপরাষ্ট্র, যেখানে তেল আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা। সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।
সরকার ইতোমধ্যে তেলের জরুরি মজুদ বৃদ্ধি, গ্যাস স্টেশন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দ্বীপাঞ্চলগুলোতে তেলের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি হবে, যা স্থানীয় জীবিকা ও শিল্প উৎপাদনকে সীমিত করবে।

ভারত (বিশাল চাহিদা, সীমিত স্বয়ংসম্পূর্ণতা): ভারতের জ্বালানি চাহিদা বিশাল, কিন্তু দেশটির নিজস্ব তেল উৎপাদন চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। তাই আমদানির ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিবহন খরচ বাড়বে, কৃষি উৎপাদন ও শিল্প খাতে প্রভাব পড়বে।
সরকার ইতোমধ্যেই তেল মজুদ বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানি উৎসের ব্যবহার এবং শিল্প উৎপাদনে রেশনিং কার্যক্রম চালু করেছে। এতে কিছুটা হলেও জরুরি সেবা বজায় রাখা সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যদি সংকট অব্যাহত থাকে, খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি অগ্রাহ্য করা যাবে না।

মায়ানমার (জ্বালানি অস্থিরতার নতুন চাপ): মায়ানমারের অর্থনীতি কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির নিজস্ব তেল উৎপাদন সীমিত। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতের কার্যক্রম ধীর হয়ে যাবে।
সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেল এবং এলএনজি ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প উৎস ব্যবহার শুরু করেছে। তবে দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে জ্বালানি ঘাটতি কৃষিকাজে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যা খাদ্য উৎপাদন ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

সিঙ্গাপুর (বাণিজ্য ও জ্বালানি কেন্দ্র): সিঙ্গাপুরের বন্দর ও শিল্পাঞ্চল তেলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু দেশ নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যও প্রভাবিত হবে।
সরকার ইতোমধ্যেই তেলের বিকল্প উৎস, বিশেষ রিজার্ভ মজুদ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দেশটির বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাপান (প্রযুক্তি উন্নত, তেল সীমিত): জাপান প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও তেলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকার ইতোমধ্যেই এলএনজি আমদানির চ্যানেল বৃদ্ধি, বিকল্প শক্তি ব্যবহার এবং তেলের রিজার্ভ বৃদ্ধি করছে। তবে দেশটির শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের উপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া (রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ঝুঁকি): দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি শিল্প ও রপ্তানি নির্ভর। তেলের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে উৎপাদন কমে যাবে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বৈদেশিক আয় হ্রাস পাবে।
সরকার ইতোমধ্যেই জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি প্রবর্তন ও তেলের জরুরি মজুদ বৃদ্ধি করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি খাতের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।

দক্ষিণ আফ্রিকা (শিল্পনির্ভর অর্থনীতিতে চাপ): দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতি শিল্পনির্ভর। কিছু অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন থাকলেও তা চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়।
সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদন হ্রাস এবং কর্মসংস্থান কমে যাবে। সরকারের উদ্যোগে রিজার্ভ মজুদ বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার শুরু হলেও সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রমাণ করেছে, তেল শুধু একটি অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত সম্পদ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভারত, মায়ানমার, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকাÑএই ১০টি দেশ সরবরাহ ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া সংকট আরও গভীর হবে। বিকল্প জ্বালানি উৎস, কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায় বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

Facebook Comments Box

Posted ০৬:১৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com