নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ প্রিন্ট ৫৭ বার পঠিত
দেশের বিমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, বিদ্যমান সব বিকল্প কাজে লাগিয়েও যদি এই দায় পরিশোধ সম্ভব না হয়, তাহলে সরকারের কাছে এককালীন (ওয়ান-টাইম) বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
শনিবার (২৭ জুন) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক সপ্তাহে খাতের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করেছেন জানিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সমস্যা চিহ্নিত করাই লক্ষ্য নয়; বরং কার্যকর সমাধানভিত্তিক সংস্কারই হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি সংস্কার কাঠামো (রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক) প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি জানান, এই সংস্কার কার্যক্রম তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর পরিচালিত হবে। প্রথমত, পলিসিধারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার; দ্বিতীয়ত, বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা; এবং তৃতীয়ত, খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে একটি টেকসই বিমা শিল্প গড়ে তোলা।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বিমা মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে পৃথকভাবে বসে তাদের আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে।
তার ভাষায়, কোথাও সম্পদ বিক্রি, কোথাও আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার কিংবা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে দাবি পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে আইডিআরএ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক বিমা কোম্পানির এফডিআরের অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ নগদায়নের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
প্রয়োজনে সরকারের বেইলআউট
এসব উদ্যোগের পরও যদি বড় অঙ্কের দায় থেকে যায়, তাহলে সরকারের সহায়তায় এককালীন বেইলআউট প্যাকেজের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, সরকারের কাছে যাওয়ার আগে বিমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের সংকট পুনরায় সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা সরকারকে দেখাতে হবে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার অতিক্রম করেছে এবং দেশের অর্থনীতি এখন অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিমা খাত গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিমা খাত এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অথচ উন্নত অর্থনীতিতে বিমা খাত শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস।
পুঁজিবাজারে বাড়বে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা সীমিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করে এবং বিশেষ করে নতুন কোম্পানির আইপিওতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে উঠলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নতুন উৎস তৈরি হবে।
বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ দেশ উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাতীয় অর্থনীতির বড় ধরনের ক্ষতি হয়। উন্নত দেশগুলোর মতো বিমার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা গেলে সরকারের আর্থিক চাপও অনেক কমানো সম্ভব হবে।
মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে কার্যকর মাইক্রোইনস্যুরেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
পাশাপাশি ইসলামি বিমা বা তাকাফুল খাতের জন্যও আধুনিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
দীর্ঘমেয়াদে খাতের উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমা বিষয়ে বিভাগ, মেজর, মাইনর কিংবা সার্টিফিকেট কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে খাতে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, কোনো খাতের সফল সংস্কারের জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিল্পমালিকদের আন্তরিকতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা—এই তিনটি বিষয় অপরিহার্য।
তিনি বলেন, আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। তবে বিমা কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই দেশের বিমা খাতকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলীসহ বিমা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা।
Posted ০৮:১৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com