নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ১১ বার পঠিত
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে। ঋণ থেকে অর্জিত সুদের তুলনায় আমানত ও ধার করা অর্থের বিপরীতে দ্বিগুণেরও বেশি সুদ পরিশোধ করতে হওয়ায় ব্যাংকটি এ সময় ৬৪০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার নিট লোকসানে পড়েছে। এক বছর আগে একই সময়ে ব্যাংকটি প্রায় ১০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রকাশিত ব্যাংকের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। গত বুধবার অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রতিবেদনটি অনুমোদন করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ঋণের সুদ থেকে রূপালী ব্যাংকের আয় হয়েছে ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সুদ আয় ৪৩১ কোটি টাকা কমেছে।
অন্যদিকে, আমানতকারী এবং বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া তহবিলের বিপরীতে সুদ বাবদ ব্যাংকটিকে পরিশোধ করতে হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ২ হাজার ৩১৯ কোটি টাকার তুলনায় ৩২০ কোটি টাকা বেশি। ফলে সুদ আয়ের চেয়ে সুদ ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ঋণাত্মক অবস্থায় চলে যায়। এ খাতে মোট ঘাটতি দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৯৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, অতীতে অনেক ঋণ প্রকৃত অবস্থার তুলনায় নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী প্রকৃত খেলাপি ঋণ শনাক্ত করায় খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে এবং তার প্রভাব সুদ আয়ে পড়েছে। তিনি জানান, ছোট, মাঝারি ও ভোক্তা ঋণ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও এখন অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকের আয় হয়েছে ১ হাজার ২০৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৭৬ কোটি টাকা। তবে কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও দালালি সেবা থেকে আয় কমে দাঁড়িয়েছে ১০১ কোটি টাকায়, যেখানে এক বছর আগে এ খাতে আয় ছিল ২১৫ কোটি টাকা। অন্যান্য উৎস থেকে আয় হয়েছে ৪০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৩২ কোটি টাকার তুলনায় কিছুটা বেশি।
তবে আয়ের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভাড়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকের পরিচালন লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৬১০ কোটি টাকা। এরপর নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ এবং কর-সংক্রান্ত সমন্বয় শেষে মোট নিট লোকসান দাঁড়ায় ৬৪০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
ব্যাংকের আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধিও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ২৮ কোটি টাকা, যা গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৭২ হাজার ৬২ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণের স্থিতি ৫১ হাজার ২৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমলেও তা এখনো উদ্বেগজনক। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণের ৩৯ শতাংশ খেলাপি ছিল, যা জুন শেষে সামান্য কমে ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য এই হ্রাস যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএসইতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ২০ পয়সা। শুধু দ্বিতীয় প্রান্তিকেই শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৫ টাকা ১ পয়সা, যেখানে আগের বছরের একই প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ইতিবাচক।
এছাড়া চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২২ টাকা ৪৩ পয়সা।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, রূপালী ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল দেখাচ্ছে যে উচ্চ খেলাপি ঋণ, কমে যাওয়া সুদ আয় এবং ক্রমবর্ধমান তহবিল ব্যয়ের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখনো বড় ধরনের চাপে রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এবং মানসম্মত নতুন ঋণ বিতরণ না বাড়লে আগামী সময়েও ব্যাংকটির মুনাফায় ফিরতে চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে।
Posted ০৮:২৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com