অনলাইন ডেস্ক
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রিন্ট ১৩৪ বার পঠিত
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত তিন মাসেও শেষ করতে পারেনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) গঠিত কমিটি। যদিও দুই মাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা ছিল কমিশনের।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাঈদ খোকন গোপন জায়গায় অবস্থান করে অবৈধভাবে কোম্পানিটির আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করছেন- কোম্পানিটির ছয় উদ্যোক্তা পরিচালকের এমন অভিযোগ তদন্তে গত বছরের ৯ নভেম্বর চার সদস্যের কমিটি গঠন করে বিএসইসি। কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত পরিচালক মো. ফারুক হোসেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান রনি, সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মিনহাজ বিন সালিম এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ম্যানেজার মো. গিয়াস উদ্দিন। এই কমিটির ওপর নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ভার দেওয়া হয়। তদন্তের টার্মস অফ রেফারেন্সের মধ্যে রয়েছে-
ক) মোহাম্মাদ সাঈদ খোকনের দীর্ঘ ১৩ বছরে চেয়ারম্যান পদে থাকার বৈধতা ও নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনার যথার্থতা নির্ধারণ এবং বোর্ড অনুমোদন ব্যতীত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়সমূহ পর্যালোচনা;
খ) ছয় জন উদ্যোক্তা পরিচালকের অপসারণ প্রক্রিয়া ও বৈধতা নিরীক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা;
গ) চেয়ারম্যানের স্ত্রী, দুই কন্যা, শালী এবং নিজস্ব দুটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিয়োগের আইনগত বৈধতা ও স্বার্থ সংঘাতের বিষয় যাচাই এবং পরিবারভুক্ত পরিচালকদের শেয়ার হোল্ডিং (৩০.৩৫%) কোম্পানি আইন, বীমা আইন ও সিকিউরিটিজ আইনের কোন ব্যত্যয় হয়েছে কি না তা নির্ধারণ; ) ঈঊঙ, ঈঋঙ ও কোম্পানি সচিবের নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়া, এবং তা সভার কার্যবিবরণীতে সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না তা যাচাই; ও) চেয়ারম্যান সাঈদ খোকন সরকারের পতনের পর পলাতক অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও কোম্পানীর চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকা, অজ্ঞাত স্থান থেকে কোম্পানী নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন সভা পরিচালনার বৈধতা ও আইনগত প্রাসঙ্গিকতা যাচাই; চ) কোম্পানীর সেক্রেটারি ও পরিচালক নুর মোহাম্মদ মামুনের ভূমিকা পর্যালোচনা, এবং চেয়ারম্যানের একতরফা অনিয়মে সহযোগিতা ও আর্থিক/অন্যান্য সুবিধা গ্রহণের বিষয় যাচাই; ছ) কোম্পানীর পরিচালনা ও আর্থিক সুবিধা দখলের ক্ষেত্রে Companies Act, Securities Laws, Insurance Act এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের কোডের লঙ্ঘন চিহ্নিতকরণ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না করার বিষয়ে বিএসইসির তদন্ত দলের প্রধানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠান ও সভার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্তে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক এন্ড কোম্পানিকে আইডিআরএ’ নিয়োগ দিলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন দাখিল করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
গত ১৩ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ দেয়ার পর এক মাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়। তদন্তের টার্মস অফ রেফারেন্সের মধ্যে রয়েছে- স্বতন্ত্র পরিচালকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহপূর্বক তাদের নিয়োগ বীমাকারীর কর্পোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের নির্দেশনা পরিপালন করে হয়েছে কি না।
মনোনীত পরিচালকের ক্ষেত্রে বীমা আইন ২০১০ এর ধারা ৭৭ লঙ্ঘন হয়েছে কি না; মূলধন ও শেয়ারধারণ বিধিমালা ২০১৬ অনুযায়ী ইসলামী ইস্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড এর শেয়ার ধারণের নির্ধারিত সীমা/ অর্থাৎ ১০ শতাংশের অধিক শেয়ার পরিবারের সদস্য ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ধারণের বিষয়টি যাচাইকরন; সর্বশেষ অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বীমাকারীর পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা, ২০১৪ যথাযথভাবে অনুসৃত হয়েছে কি না; সর্বশেষ অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় পরিচালক/চেয়ারম্যান/ভাইস চেয়ারম্যান অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে অন্য পরিচালকরা চৎড়ীু দিয়েছে কি না; এবং তা কোম্পানির আইন অনুযায়ী হয়েছে কি না; উপস্থিতি তালিকায় পরিচালক/ চেয়ারম্যান/ভাইস চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত স্বাক্ষর এর প্রকৃতি (নিজ হাতে প্রদত্ত স্বাক্ষর বা কম্পিউটারের মাধ্যমে স্বাক্ষর এবং স্বাক্ষরের সঠিকতা পরীক্ষা করন; বীমাকারীর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ফৌজদারী মামলার কারণে আত্মগোপন থাকা অবস্থায় কিভাবে পরিচালনা পর্ষদের সভায় অংশগ্রহণ করেছেন তার বিস্তারিত তথ্য উপাত্তসহ এরুপ সভার আইনগত ভিত্তি রয়েছে কিনা এতদ্বিষয়ে মতামত: আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় যে সকল বীমাকারীর কর্মকর্তা বা পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর কার্যপত্রে প্রদানে সহযোগিতা করেছেন তাদের সনাক্তকরণ ও দায় দায়িত্ব নির্ধারণ; ফৌজধারী মামলায় আত্মগোপনে থাকা ব্যাক্তি পরিচালনা পর্ষদের সভায় অংশগ্রহণ/সভাপতিত্ব করলে সে সভার আইনগত গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে মতামত প্রদান।
যে সকল পরিচালক ফৌজদারী মামলায় আত্মগোপনে থাকা ব্যাক্তির সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় অংশগ্রহণ করেছেন তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও এ কারণে তাদের আইনগত দায় দায়িত্ব নিরূপন/মতামত প্রদান; বিএসইসিতে অভিযোগকারী ছয় উদ্যোক্তা পরিচালকের মধ্যে রয়েছেন তোফাজ্জেল হোসেন, এম. তাজুল ইসলাম, গাজী বেলায়েত হোসেন, আব্দুল হালিম, শায়লা পরভীন ও আসমা নূর।
পরিচালকদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান সাঈদ খোকন সম্পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বজায় রেখে অজ্ঞাত স্থান থেকে অবৈধভাবে কোম্পানিটি পরিচালনা করছেন।
ছয় উদ্যোক্তা পরিচালকের অভিযোগ , সাঈদ খোকন ২০১২ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কোম্পানিতে স্বৈরাচারী চর্চা শুরু হয়। তারা জানান, কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই তাদের ছয়জন সাবেক স্পন্সর পরিচালককে বোর্ড থেকে অপসারণ করা হয়। তাদের স্থানে চেয়ারম্যান তার স্ত্রী, দুই মেয়ে, শ্যালিকা এবং তার নিজস্ব দুটি কোম্পানির প্রতিনিধিকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ করেন। বর্তমানে পারিবারিক-সম্পর্কিত পরিচালকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে, যারা সম্মিলিতভাবে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের প্রায় ৩০.৩৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের অভিযোগ, এই পারিবারিক কেন্দ্রীভূত শেয়ারহোল্ডিং এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামো কোম্পানি আইন, বীমা আইন এবং সিকিউরিটিজ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও আওয়ামী লীগ নেতা সাঈদ খোকন গোপন স্থানে অবস্থান করছেন, সেখান থেকেই তিনি কোম্পানির মিটিং পরিচালনা করছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং আর্থিকসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। সাবেক পরিচালকরা বলছেন, এই ধরনের আচরণ কর্পোরেট গভর্নেন্স নীতি এবং কোম্পানি ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা আরও অভিযোগ করেন, কোম্পানির সচিব ও পরিচালক নুর মোহাম্মদ মামুন চেয়ারম্যানকে এই একতরফা সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করতে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছেন, যা কার্যত এই অনিয়মগুলোকে সমর্থন করেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, চেয়ারম্যান নিজের ইচ্ছামতো কোম্পানির সিইও, সিএফও এবং কোম্পানি সচিবকে নিয়োগ ও অপসারণ করেন এবং এই সিদ্ধান্তগুলো বোর্ড মিটিংয়ের কার্যবিবরণীতে রেকর্ড করা হয়। যে পরিচালকই আপত্তি তোলেন, তাকে বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সাবেক পরিচালকরা জানান, তাদের অপসারণের কারণ এখনও অজানা এবং বারবার কারণ জানতে চেয়েও কোনো উত্তর মেলেনি, যা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।
অভিযোগকারীদের মতে, ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের এই অনিয়মগুলো সামগ্রিকভাবে বীমা খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। তারা বিএসইসিকে অনুরোধ করেছেন যেন একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করে, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, অন্যায়ভাবে অপসারণ করা পরিচালকদের পুনর্বহাল করা হয় এবং বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, কর্পোরেট গভর্নেন্স ফিরিয়ে আনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
Posted ০৭:৪৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com