নিজস্ব প্রতিবেদক
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ প্রিন্ট ২৪৪ বার পঠিত
বীমা কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) বিরুদ্ধে অযৌক্তিক বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে। নতুন করে আরোপ করা বর্ধিত নবায়ন ফি নিয়ে জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বেসরকারি খাতের ৮০টি বীমা কোম্পানির মধ্যে ৬৭টির লাইসেন্স এখনো নবায়ন হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ২০২৬ সালের লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন ও ফি জমা দেয়। তবে ২০২৬ সালে বিধিমালা সংশোধন করে নবায়ন ফি বাড়ানো হলে আইডিআরএ নতুন হারে অতিরিক্ত ফি দাবি করে। এতে আপত্তি জানিয়ে অধিকাংশ কোম্পানি আগের হারেই ফি পরিশোধ করলেও তাদের লাইসেন্স নবায়ন আটকে রাখা হয়।
বীমা কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা ২০২৫ সালের মধ্যেই আইন অনুযায়ী নবায়ন ফি পরিশোধ করেছে। তাই পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত ফি দাবি করা আইনসঙ্গত নয়।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) বর্ধিত ফি ছাড়া লাইসেন্স নবায়নের অনুরোধ জানালেও তা কার্যকর হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে আইনি মতামত ও নির্দেশনা চেয়ে আইডিআরএ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি দিয়েছে।
গত ২৬ এপ্রিল আইডিআরএ’র উপপরিচালক (নন-লাইফ) মো. সোলায়মান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জারি করা সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী বীমা কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন ফি প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ কোম্পানি আগের হার অনুযায়ী প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১ টাকা জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালে লাইসেন্স ফি ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে কমিয়ে ১ টাকা নির্ধারণ করায় আইডিআরএ’র আয় কমে যায়। এদিকে জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাইজেশন এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাইসেন্স ফি বাড়ানো হয়েছে।
আইডিআরএ’র তথ্যমতে, বর্ধিত ফি দিয়ে ইতোমধ্যে ৪টি লাইফ এবং ৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তবে বাকি ৬৭টি কোম্পানি অতিরিক্ত ফি না দেওয়ায় তাদের লাইসেন্স নবায়ন সম্ভব হয়নি।
বিরোধের মূল কোথায়:
বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, পরবর্তী বছরের লাইসেন্স নবায়নের আবেদন ও ফি জমা দিতে হয় আগের বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে। সে অনুযায়ী বীমা কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালের মধ্যেই ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ফি জমা দেয়।
তবে ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি গেজেট আকারে প্রকাশিত সংশোধিত বিধিমালায় নবায়ন ফি বাড়িয়ে প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১ টাকা থেকে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এই নতুন হারই এখন বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
বীমা কোম্পানিগুলোর যুক্তি যে সময় তারা ফি জমা দিয়েছে, তখন পুরনো বিধিমালাই কার্যকর ছিল। তাই পরবর্তীতে সংশোধিত হার প্রয়োগ করে অতিরিক্ত ফি দাবি করা আইনসম্মত নয়।
আইডিআরএ বলছে, সংস্থাটির ব্যয় নির্বাহ সম্পূর্ণ নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৮ সালে ফি কমানোর ফলে আয় কমে যায়। এর মধ্যে জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সলিউশনসহ বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই বাস্তবতায় ফি বাড়ানো প্রয়োজন হয়ে পড়ে এবং তা ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর করা হয়।
তবে ফি নির্ধারণে বিলম্ব ও অংশীজনদের সঙ্গে দীর্ঘ পরামর্শ প্রক্রিয়ার কারণে সময়মতো লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে চিঠিতে স্বীকার করেছে সংস্থাটি।
বর্তমানে মাত্র ১৩টি কোম্পানি বর্ধিত ফি দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করেছে। বাকি ৬৭টি কোম্পানি অতিরিক্ত ফি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাদের লাইসেন্স ঝুলে আছে।
বীমা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাইসেন্স নবায়ন না হলে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম, নতুন ব্যবসা গ্রহণ এবং গ্রাহক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ আইডিআরএ:
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইডিআরএ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে আইনগত মতামত ও নির্দেশনা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ২৬ এপ্রিল পাঠানো ওই চিঠিতে ২০২৬ সালের জন্য কোন হারে নবায়ন ফি প্রযোজ্য হবে-সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে, বর্ধিত ফি বাতিলের দাবিতে ইতোমধ্যে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তনয় কুমার সাহা জনস্বার্থে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে ৪ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী বাতিল এবং ২০১৮ সালের ফি কাঠামো বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরোধ মূলত “রেট্রোস্পেকটিভ প্রয়োগ” (পূর্ববর্তী সময়ের ওপর নতুন আইন প্রয়োগ) নিয়ে। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফি জমা দেওয়ার পর নতুন হার চাপিয়ে দেওয়া হলে তা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তারা আরও বলছেন, দ্রুত সমাধান না এলে বীমা খাতে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
আইডিআরএ’র চিঠিতে যা আছে:
দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর সংগঠন -বিআইএ এই বর্ধিত ফি ছাড়াই লাইসেন্স নবায়ন করে দিতে আইডিআরএকে চিঠি দিলেও তা রক্ষা করেনি। বরং এই ফি নিয়ে টানাপোড়েনের কথা জানিয়ে ইতিমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা ও মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। গত ২৬ এপ্রিল আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে উপপরিচালক (নন লাইফ) মোঃ সোলায়মান সচিব বরাবর এই চিঠি দিয়েছেন।
নন-লাইফ ও লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়ন প্রসঙ্গে দেয়া ওই চিঠিতে
(১) বীমা আইন, ২০১০ এর ধারা-১১(২)(৩)
(২) বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২ এর বিধি ৩ (২)
(৩) বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২ এর বিধি ৩(২) (সংশোধিত-১১-০৬-২০১৮)
(৪) বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২ এর বিধি ৩(২) (সংশোধিত-০৪-০২-২০২৬)
(৫) বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন এর পত্র নং বিআইএ-৩(৩৫)/২০২৬-৭১ তারিখ:০৮-০৩-২০২৬ খ্রিঃ
সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘উপর্যুক্ত বিষয়ে সূত্রোক্ত আইন, বিধি এবং পত্রের প্রতি সদয় দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক জানানো যাচ্ছে যে, বীমা ব্যবসা নিবন্ধন
ফি বিধিমালা, ২০১২ এর বিধি ৩(২) সর্বশেষ সংশোধনপূর্বক বাংলাদেশ গেজেটে ০৪-০২-২০২৬ তারিখে জারীকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বীমা ব্যবসার নিবন্ধন নবায়ন ফি ২০২৬ সন হতে প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
২. বীমা আইন, ২০১০ এর ধারা ১১(২) এ বর্ণিত নবায়ন ফি এবং নবায়নের আবেদন সংক্রান্ত বিধান নিম্নরূপ :
“১১(২) বীমাকারীকে কোন বৎসরের নিবন্ধন নবায়নের দরখাস্ত পূর্ববর্তী বৎসরের ৩০শে নভেম্বরের পূর্বে কর্তৃপক্ষের নিকট
দাখিল করিতে হইবে এবং আবেদনের সাথে বিধি দ্বারা নির্ধারিত ফি প্রদান করিতে হইবে।”
প্রায় সকল বীমাকারী আইনের উপরোক্ত ধারা অনুযায়ী প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১.০০ (এক) টাকা হারে নবায়ন ফি পরিশোধ করে ২০২৬ সনের জন্য নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করেছে।
৩. ব্যয় নির্বাহে সরকারী বরাদ্দ না থাকায় নিজস্ব আয় হতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সকল ব্যয় মিটাতে হয়।
বীমাকারী লাইসেন্স নবায়ন ফি এ সংস্থার আয়ের প্রধান উৎস। ২০১৮ সনে এ লাইসেন্স ফি প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের
বিপরীতে ৩.৫০ টাকা হতে ১.০০ টাকায় নামানোর ফলে এ সংস্থার আয় কমে যাওয়ায় ব্যয় নির্বাহ কষ্টকর হয়ে পড়ে।
তাছাড়া ২০২৫ সনে এ সংস্থার জনবল বৃদ্ধি, কমপ্লিট ডিজিটাইজেশন, ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সলিউশন, বাংলাদেশ একচ্যুয়ারিয়াল ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশ চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স ইনষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি যুগোপযোগী সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করায় এ সংস্থার ব্যয়ের মাত্রা অনেকগুণ বেড়ে যায়। ফলে ০১-০৭-২০২৫ তারিখে বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২ এর বিধি ৩(২) এ বীমাকারী নিবন্ধন নবায়নের নির্ধারিত ফি সংশোধনের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এবং তা ২০২৬ সন হতে কার্যকর করার প্রস্তাব করায় আবেদন অনুযায়ী নিবন্ধন নবায়ন সম্ভবপর হয়নি। বিধিমালা সংশোধনের ব্যাপারে অংশীজনদের সাথে কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ব্যাপক পরামর্শকমূলক সভা করে ঐক্যমতে পৌঁছতে সময় ব্যয় হয়।
৪. বিগত ০৪-০২-২০২৬ তারিখে বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২ এর বিধি ৩(২) এর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর বীমাকারীগণকে বর্ধিত (১.৫০ টাকা) ফি জমা প্রদানপূর্বক নবায়ন লাইসেন্স গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলে ৪টি লাইফ বীমাকারী এবং ৯টি নন-লাইফ বীমাকারী বর্ধিত ফি জমা দিয়ে বীমাকারীর নিবন্ধন নবায়ন লাইসেন্স গ্রহণ করেছে।
৫. ইতোমধ্যে গত ০৮-০৩-২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন সূত্রে বর্ণিত পত্রের মাধ্যমে বীমা আইন ২০১০ এর ১১(২)(৩) ধারার বিধান মতে ২০১৮ সনে সংশোধিত বিধি অনুযায়ী প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১.০০ (এক) টাকা হারে বীমাকারীর লাইসেন্স নবায়ন ফি আদায়পূর্বক বর্ণিত লাইসেন্স নবায়নের অনুরোধ জানিয়েছে। ২০২৬ সনে জারীকৃত সর্বশেষ সংশোধিত বিধি অনুযায়ী নবায়ন ফি না পাওয়ায় ৬৭টি বীমাকারী লাইসেন্স নবায়ন সম্ভবপর হচ্ছে না।
৬. এমতাবস্থায়, বীমা আইন, ২০১০ এর ১১ ধারা এবং তদধীন জারীকৃত বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২ এর বিধি ৩(২) এর ০৪-০২-২০২৬ তারিখে সংশোধিত গেজেট প্রজ্ঞাপনের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সনের বীমাকারীর লাইসেন্স নবায়ন ফি প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে কত টাকা হারে প্রযোজ্য হবে সে বিষয়ে নির্দেশনা/আইনগত মতামত প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে বিনীত অনুরোধ করছি ।’
Posted ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com