বৃহস্পতিবার ৪ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x

কোটিপতিদের চাপে কোণঠাসা ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকরা

রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬   প্রিন্ট   ১৮২ বার পঠিত

কোটিপতিদের চাপে কোণঠাসা ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকরা

দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ছোট উদ্যোক্তারা। কিন্তু কোটিপতিদের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকরা। ২০২৫ সালের শেষে লাখ টাকার নিচের ঋণগ্রহীতাদের মোট ঋণের পরিমাণ ২ শতাংশেরও কম। অথচ কোটিপতি ঋণগ্রহীতারা দেশের প্রায় ৭৬.৬৭ শতাংশ ঋণই দখল করে রেখেছেন। আর অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকদের ভাগ্যে জুটেছে ঋণের মাত্র ২৩.৩৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের আমানতকারীর সংখ্যা ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫ জন। তাদের জমাকৃত টাকার পরিমাণ ২১ লাখ ৫৩৪ কোটি। একই সময়ে ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো, যেখানে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭ জন। অর্থাৎ ১১.৬৩ জনের জমাকৃত টাকা ভোগ করছেন মাত্র একজন। এটা ছিল সার্বিক হিসাব। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংক ঋণের বেশিরভাগই ভোগ করছেন কোটিপতি গ্রাহকরা। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের হাজারো উদ্যোক্তা।

প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, মুটে, মজুর, দোকানদারের খুব বেশি ঋণের প্রয়োজন হয় না। তারা কখনো ৫০ হাজার; ১ লাখ বা ব্যবসাভেদে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। আর নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজন হয় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর বাইরে কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেন মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা। যারা বাড়ি এবং গাড়ির জন্য ঋণ নিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার ৮৬৬ জন গ্রাহক ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৬২ শতাংশই দখলে নিয়েছেন। অথচ, নিম্ন আয়ের মানুষ বা লাখ টাকার নিচের ঋণগ্রহীতারা মাত্র ১ দশমিক ৬০ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। এসব গ্রাহকের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ১-৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া গ্রাহকদের ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। এসব গ্রাহকের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ৭৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। আর নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজন হয় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
এসব গ্রাহক ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। তাদের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। এর বাইরে মধ্যম আয়ের চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী বা কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া গ্রাহকরা ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। তাদের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অবশ্যই সব খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো খাত যাতে অন্য খাতের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। যদি প্রভাব বিস্তার করে তবে অর্থনীতির মধ্যে মিসম্যাচ তৈরি হবে। এ জন্য ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে খাতকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের ঋণ পোর্টফোলিও সাজানো উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করছি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঠিকমতো ঋণ পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ৪ হাজার ৮৬৬ জন গ্রাহক ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৬২ শতাংশই দখলে নিয়েছেন। ৫০ কোটি টাকার বেশি এসব ঋণগ্রহীতার মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। ২০ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ হাজার ২৫৭ জন, যাদের কাছে আছে ৮ লাখ ২২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মাধ্যমে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। ৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এমন গ্রাহকের সংখ্যা ৪৬ হাজার ২৪৭ জন। তাদের কাছে বিতরণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। ব্যাংকের মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ রয়েছে এসব গ্রাহকের কাছে। ১ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৮৯ জন। তাদের হাতে রয়েছে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৭৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অঙ্কে যার পরিমাণ ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের খরচ বেশি হয়। এটার পরিচালনায় অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন হয়। এ জন্য ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অনীহা দেখাচ্ছে। তবে অবশ্যই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এসব ব্যক্তিদের জন্য ঋণ সহজ করতে হবে। এছাড়া তাদের কীভাবে ব্যাংকের লেনদেনের মধ্যে নিয়ে আসা যায় সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গেল ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০ জন। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে কোটিপতি বেড়েছে ৫ হাজার ৯৭৪ জন। ডিসেম্বরে কোটিপতিদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৩৯ দশমিক ৮২ শতাংশ।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের এখানে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টাচ করতে পারছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোও এসব গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। অর্থাৎ মাঝের এই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে।

 

Facebook Comments Box

Posted ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com