|

Advertisement
×
অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ৫১.২৯ শতাংশ, প্রিমিয়ায় আয় কমেছে ৫.৩৯ শতাংশ : ভবিষ্যতে গ্রাহকদের দাবী পরিশোধে শঙ্কা

দুর্বল আর্থিক কাঠামো এনআরবি লাইফের

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬   প্রিন্ট   ৩৫ বার পঠিত

দুর্বল আর্থিক কাঠামো এনআরবি লাইফের

অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, প্রিমিয়াম আয়ে ধ্বস ও ব্যাপক অনিয়ম এর কারণে এনআরবি ইসলামিক লাইফ এর আর্থিক অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। মাত্র ৫ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অপরিপক্ক ব্যবসায়িক প্লান, অতিরিক্ত গাড়ি ক্রয়, অপ্রয়োজনীয় অফিস স্থাপন, ভ্রমণ বিল ও উন্নয়ন মিটিং খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় এর কারণে সমৃদ্ধ হয়নি লাইফ ফান্ড। এছাড়া এনআরবি ইসলামিক লাইফের মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৪ কোটি টাকা। ভবিষ্যতে গ্রাহকের বীমা দাবী পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে ৫ম প্রজন্মের এই কোম্পানিটি।

 

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বরাবরে দাখিলকৃত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সকল সূচকেই নেতিবাচক চিত্র ফুঁটে উঠেছে এনআরবি ইসলামিক লাইফের। কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সিএফও স্বাক্ষরিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত দাখিলকৃত বার্ষিক প্রতিবেদনে গত বছরের তুলনায় প্রিমিয়াম আয় হ্রাস পেয়েছে ৫.৩৯ শতাংশ। কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে ৫১.২৯ শতাংশ। আর লাইফ ফান্ড দেখিয়েছে মাত্র ১২.৯২ কোটি টাকা। নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও লাইফ ফান্ড সমৃদ্ধ না হওয়ায় উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে আছে বীমা গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে দাখিলকৃত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি ২০২৫ সালে পলিসি হোল্ডারদের কাছ থেকে ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ১৯ কোটি ২ লাখ টাকা এবং নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ১৪ কোটি ১৫ লাখ কোটি টাকা। মোট প্রিমিয়াম অর্জিত হয় ৩৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির মোট অর্জিত প্রিমিয়াম ছিল ৩৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রিমিয়াম আয় হ্রাস পেয়েছে ৫.৩৯ শতাংশ, যা একটি বীমা কোম্পানির জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি ব্যবস্থাপনা ব্যায়ের অনুমোদিত সীমার ৫১.২৯ শতাংশ বেশি ব্যয় করেছে। দেশের লাইফ বীমা কোম্পানির অনুমোদনের প্রথম ৫ বছরে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা ব্যয় ৯৫ শতাংশ নির্ধারিত আছে। কিন্ত এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০২৪ সালে ১৬৪.৬৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ১৫১.২৯ শতাংশ খরচ করেছে। যা বীমা আইন ২০১০ এর ৬২ এর সুস্পষ্ট লংঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২০২৫ সালের প্রতিবেদনে কোম্পানিটি ডাইরেক্ট এক্সপেঞ্চ (প্রত্যক্ষ ব্যয়) খাতে মোট ৬ কোটি ১৩ লাখ ৭২ হাজার ১৫৭ টাকা খরচ দেখিয়েছে। এরমধ্যে স্যালারি এন্ড এলাউন্স (ব্রাঞ্চ) খাতে ২ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি এবং অফিস রেন্ট (ব্রাঞ্চ) খাতে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার বেশি খরচ করেছে। এছাড়া কোম্পানিটি ইনডাইরেক্ট এক্সপেঞ্চ (পরোক্ষ ব্যয়) খাতে মোট ৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বেশি খরচ দেখিয়েছে। এরমধ্যে স্যালারি এন্ড এলাউন্স (এডমিন) খাতে সর্বোচ্চ ৬ কোটি ৯৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকার বেশি এবং অফিস রেন্ট (হেড অফিস) খাতে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা খরচ করেছে। এছাড়া কোম্পানিটি ইনডাইরেক্ট এক্সপেঞ্চ (অন্যান্য ব্যবস্থাপনা খরচ) খাতে মোট ৩ কোটি ৯৬ লাখ ২২ হাজার টাকার বেশি খরচ করেছে। এধরণের অপরিকল্পিত ও অস্বাভাবিক খরচ কোম্পানিটির আর্থিক ভীতকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

২০২৫ সালের বছর শেষে লাইফ ফান্ডে আছে মাত্র মাত্র ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। লাইফ ফান্ড হলো এমন একটি ফান্ড যেখানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো অর্থ জমা রাখে ও বিনিয়োগ করে। কোনো বীমা গ্রাহকের মৃত্যু হলে বা অন্য কোনো বীমা দাবী এই ফান্ড থেকে প্রদান করা হয়। জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ডকে রক্তের সঙ্গে তুলনায় করা হয়। মানুষ রক্তশূন্য হয়ে পড়লে যেমন বাঁচে না, তেমনি একটি জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড দূর্বল হলে ওই কোম্পানির পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বীমা গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পাওয়া মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনআরবি লাইফ এর সরকারী খাতে বিনিয়োগ মাত্র ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। আগের বছরও ছিল ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ সরকারী খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই। এছাড়া অন্যান্য খাতে ১৪.০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের কোনো গ্রহনযোগ্য ও দৃশ্যমান প্রমাণ দাখিল করেনি কোম্পানিটি। ২০২৫ সালে কোম্পানির মোট বিনিয়োগ ১৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আগের বছর ২০২৪ সালে যা ছিল ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগ এর পরিমাণও কমে গেছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সার্বিকভাবে কোম্পানিটির বীমা দাবী পরিশোধের সক্ষমতা চরম ঝুকিপূর্ণ এবং এর আর্থিক অবস্থা তলানিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এছাড়া এনআরবি ইসলামিক লাইফের মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৪ কোটি টাকা । এনআরবি ইসলামিক লাইফ এর পরিশোধিত মূলধন ১৮ কোটি টাকা। তবে পুনরায় পূরণ করা হবে এমন শর্তে সেখান থেকে ৭ কোটি টাকা তুলে নিয়েছিল কোম্পানিটি। এরমধ্যে এনআরবি ইসলামিক লাইফ পরিশোধিত মূলধনের ৩ কোটি টাকা পুনঃর্ভরণ করেছে বলে আইডিআরএ’র একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এখনো ৪ কোটি টাকা পুনঃর্ভরণ করতে পারেনি ৫ম প্রজন্মের এই কোম্পানিটি।
এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স বর্তমানে চরম আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাহীনতায় ভুগছে। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, দুর্বল লাইফ ফান্ড এবং ভঙ্গুর আর্থিক অবকাঠামো এনআরবি ইসলামিক লাইফকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। প্রিমিয়াম আয় হ্রাস পাওয়া প্রমাণ করে গ্রাহকের আস্থাও তলানিতে ঠেকেছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় কোম্পানিটি যে আর্থিক সংকটে পড়েছে, তা শুধু তাদের নিজেদের নয়, বীমা খাতের সার্বিক ভাবমূর্তির জন্যও হুমকিস্বরূপ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনা না করলে সাধারণ বীমা গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত ফেরত দেয়ার শঙ্কা রয়েছে।

 

Facebook Comments Box

Posted ০৬:৩৫ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com