রবিবার ৭ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x

নন-লাইফ বীমায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা নিরাময় সংস্কারমূলক ব্যবস্থা

সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫   প্রিন্ট   ৬৫২ বার পঠিত

নন-লাইফ বীমায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা নিরাময় সংস্কারমূলক ব্যবস্থা

বর্তমানে বাংলাদেশে বীমা শিল্প গভীর সংকটে নিমজ্জিত। লাইফ এবং নন-লাইফ উভয় শ্রেণির বীমার অবস্থা একই। কোন একটা সেক্টরের খারাপ অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়না। একটু একটু করে অব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা কর্তৃক সঠিকভাবে সার্বিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ না করা তথা কোস্পানিগুলোর সার্বিক প্রশাসনিক ও আর্থিক দুর্বলতা ক্রমশ দানা বেঁধে আজকের অবস্থায় নিয়ে এসেছে। প্রথমত আমি বাংলাদেশের বীমা শিল্পের অতীত ও বর্তমান কাঠামোগত এবং ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কিছু তথ্য উত্থাপন করব।

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর ১৯৭২ সালের ২৬ শে মার্চ জাতীয়করণ সাপেক্ষে সরকার সাবেক পূর্ব পাকিস্থানে ব্যবসারত বীমা কোম্পানিসমূহের ব্যবস্থাপনার ভার গ্রহণ করে এবং কাস্টডিয়ান/ প্রশাসক নিয়োগ করে কোম্পানি সমূহকে নিজ নিজ নামে ব্যবসা করার অনুমতি প্রদান করে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং. ৩০, ১৯৭২ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ইমারজেন্সি প্রভিশন অর্ডার” ১৯৭২ জারি করে। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৮ই আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশ নং. ৯৫ এর মাধ্যমে বীমা ব্যবসাকে জাতীয়করণ করা হয়। এই আদেশ বলে সাবেক বীমা কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে সাধারণ বীমার জন্য কর্ণফুলী ও তিস্তা নামে দুটি সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এবং জীবন বীমার জন্য রূপসা ও সুরমা নামে দুটি জীবন বীমা কর্পোরেশন গঠন করা হয়। এই ৪টি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় জাতীয় বীমা কর্পোরেশন। এই ৪টি কর্পোরেশন প্রকৃতপক্ষে বীমা ব্যবসা শুরু করে ০১/০১/১৯৭৩ ইং তারিখ থেকে। এই ব্যবস্থা কয়েক মাস চলার পর ১৯৭৩ সালের ১৪ ই মে ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অ্যাক্ট, ১৯৭৩ প্রবর্তিত হয়। এর ফলে কর্ণফুলী ও তিস্তা একীভূত হয়ে সৃষ্টি হয় ‘সাধারণ বীমা কর্পোরেশন’ এবং রূপসা ও সুরমা একীভূত হয়ে সৃষ্টি হয় ‘জীবন বীমা কর্পোরেশন’। জাতীয় বীমা কর্পোরেশন বিলুপ্ত করা হয়।

১৯৮৫ সালে সরকার বেসরকারি খাতে বীমা কোম্পানি গঠনের অনুমতি দেয়। বর্তমানে ৪৫ টি বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানি এবং একটি সরকারী বীমা প্রতিষ্ঠান ‘সাধারণ বীমা কর্পোরেশন’ ব্যবসারত আছে।

সত্যিকার অর্থে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বীমা খাতে একটা স্থবির অবস্থা বিরাজমান ছিল। উল্লেখযোগ্য বীমা বিষয়ে দক্ষ কোন লোকবল তৈরি হয়নি, বীমা ব্যবসার প্রসার ও হয়নি। ১৯৮৫ সালে বেসরকারি বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বীমা শিল্পে কিছুটা গতির সঞ্চার হয়। কিন্তু আশানুরূপ কোন উন্নতি অর্জিত হয়নি। ফিন্যন্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার ২৭ এপ্রিল, ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত বাংলাদেশের বীমা শিল্পের করুন চিত্র বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট (ইওঝউচ) নামক বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের বীমা গ্রাহকের হার এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সবচেয়ে নিম্ন, অর্থাৎ ০.৫০%। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে ৫.৩০%; মালয়েশিয়ায় ৫%; ভারতে ৪%; চীনে ৩.৯০%, ভিয়েতনামে ২.৩০%; ফিলিপাইনে ১.৯০%; ইন্দোনেশিয়ায় ১.৪০ %। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে বীমার নিম্নহার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক কল্যাণ অর্জনের ক্ষেত্রে শুধু বাধাই নয় বরং তা হুমকিস্বরূপ। অর্থাৎ বীমার গ্রাহকের হার বারানো না গেলে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক উন্নতি ও সামাজিক কল্যান অর্জন বাধাগ্রস্থ হবে।

আমাদের দেশের বীমা শিল্পের উন্নতি কেন হচ্ছে না? এই প্রশ্নের জবাব পেতে হলে নিম্নে বর্ণিত কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। একটি সুস্থ বীমা শিল্প গড়তে হলে কি কি বিষয়ে নজর দিতে হবে তাও এর থেকে বোঝা যাবে।

প্রথমত : কমিশন ব্যয়ের সীমা
বাংলাদেশের বীমা সেক্টরে বর্তমানে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। বীমা আইন ২০১০ এর ৫নং ধারায় কমিশন ব্যয়ের সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপধারা নিম্নে উল্লেখ করা হল:
উপধারা (৩) “কোন ব্যক্তি কোন বীমা এজেন্টকে বাংলাদেশে ইস্যুকৃত তাহার মাধ্যমে কার্যকর কোন নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসিরি ক্ষেত্রে নির্ধারিত শতকরা হারের অধিক কমিশন বা অন্য কোন প্রকার পারিশ্রমিক বাবদ অর্থ পরিশোধ বা পরিশোধের চুক্তি করিবে না এবং কোন বীমা এজেন্ট ও অর্থ গ্রহণ বা গ্রহণ করিবার জন্য চুক্তি সম্পাদন করিবেনা”।

বীমা আইনের এই ধারা সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আইডিআরএর নির্দেশ অনুসারে বৈধ কমিশন নির্ধারিত আছে ১৫% কিন্তু বিভিন্নভাবে অতিরিক্ত কমিশন প্রদান করা হয়। এ কারণে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব হয় না। সাধারণ বীমা ব্যবসা সাধারণত ব্যাংকের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়। ব্যাংক থেকে শিল্প কারখানা স্থাপন বা ব্যবসার জন্য ঋণ অনুমোদন করলে তার ঝুঁকি আধরিত করার জন্য বীমা চুক্তি করতে হয়। এছাড়া আমদানীর জন্য এলসি খোলা হলে বা রপ্তানি করলে বীমার মাধ্যমে ঝুকি আবরিত করতে হয়। অগ্নি বীমা, নৌ বীমা, মোটর বীমা বা অন্যান্য বীমা বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওই সমস্ত বীমার কমিশনও ব্যাংকারের মাধ্যমে লেনদেন হয়ে থাকে। ফলে অতিরিক্ত কমিশন মধ্যসত্ত্বকারীদের পকেটে যায়। বাংলাদেশে বছরে ৫০০০ থেকে ৬০০০ কোটি টাকার নন-লাইফ প্রিমিয়াম আয় হয়। ধরুন যদি ৩০% হিসেবে অতিরিক্ত কমিশন দেয়া হয়, তাহলে প্রায় ২০০০ কোটি টাকার উপরে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ অর্থনীতির মুল ধারায় সম্পৃক্ত না হয়ে বাহুল্য খরচ হিসেবে ব্যয় হয় যা কালো টাকা হিসেবে পরিচিত।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে সমস্ত ব্যাংকে এই মর্মে একটি সার্কুলার ইস্যুকরা যেতে পারে যে আইন অনুসারে ১৫% এর অধিক কমিশন প্রদান করা অবৈধ এবং মানিলন্ডারিং এর আওতায় পরে। অতএব অতিরিক্ত কমিশন যাতে প্রদান না করা হয়, সে বিষয়ে সমস্ত ব্যাংকের ম্যানেজারদের সতর্ক থাকতে হবে।

অতিরিক্ত কমিশন প্রদান করার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে এরকম যে, এক কোম্পানি যদি অতিরিক্ত কমিশন না দিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দেয় তাহলে অন্য আর এক কোম্পানি অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা নিয়ে যায়। যদি সব কোম্পানি একই হারে কমিশন সীমাবদ্ধ রাখত তাহলে অতিরিক্ত কমিশন দেয়ার প্রবণতা কমে যেত। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। সেটা হলো, যখনই কোন কোম্পানির ব্যবসায়ে অন্য কোম্পানি বেশি কমিশন অফার করবে, তখন উক্ত কোম্পানির সিইও এর সাথে আলোচনা করে যাতে বেশি কমিশন না দেয়া হয় সে সম্পর্কে সিদ্ধাস্ত নেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি। কোম্পানির সিইওগণ যদি পরস্পরের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালান তাহলে ফলাফল আসতে পারে বলে মনে করি। এ ব্যাপারে সিওদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের মাধ্যমে উদ্যেগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কমিশন সংক্রান্ত বীমা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে পত্র পত্রিকায় ঘন ঘন নোটিশ প্রদান করা যেতে পারে। এছাড়াও মধ্যে মধ্যে কমিশন বন্ধের জন্য Campaign এর আয়োজন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংক এর সিইওদের আমন্ত্রণ করে তাদের সাথে কমিশন যাতে নির্ধারিত হারের বেশি না দেয়া হয় সে বিষয়ে অনুরোধ করা যেতে পারি। সর্বোপরি একটি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করতে চাই তা হচ্ছে নৈতিকতা। আমরা যারা বীমা শিল্পে জড়িত আছি তাদের একটি বিষয় গুরুত্বের সাথে চিন্তা করা উচিত। তা হচ্ছে কমিশন বেশি দেয়া একটি অপরাধ। তাই অপরাধ থেকে বিরত থাকা সবারই নৈতিক দায়িত্ব। কমিশন বেশি দেয়াতে কোম্পানর আর্থিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বীমা দাবি পরিশোধ করা যাচ্ছে না। কর্মকর্তা / কর্মচারীদের ভাল বেতন ভাতা দিতে না পারার কারনে বীমা শিল্পে মেধাবী উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের আকর্ষণ করা যাচ্ছে না। এতে করে বীমা কোম্পানীগুলির দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে। একারণে আমি ইতিপূর্বেও বহুবার একটি ”Code of Conduct” সমস্ত বীমা কোম্পানি সমূহের সিইওদের দ্বারা স্বাক্ষর করে তা মেনে চলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছি। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে আইন দ্বারা সব সময় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। স্বপ্রণোদিত হয়ে নৈতিক দায়িত্ববোধ উজ্জীবিত করে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় ভাল কাজ করা দেশের নাগরিকদের একটি নৈতিক দায়িত্ব বটে। আমার লেখা ”ÓThoughts on Insurance-Bangladesh Perspective” বইতে ২৩৭ নং পাতায় এই ধরণের Code of Conduct এর একটি নমুনা দেয়া আছে। ”ÓCode of Conduct এর ঙনলবপঃরাব সম্পর্কে ধারণা নিম্নে উল্লেখ করছি।

Objectives:

ঞযব ঈড়ফব ড়ভ ঈড়হফঁপঃ রং ভড়ৎসঁষধঃবফ ঃড় ধপযরবাব ঃযব ভড়ষষড়রিহম ঙনলবপঃরাবং:

The Code of Conduct is formulated to achieve the following Objectives:

  1. to set a minimum standard of practice amongst insurance companies in order to ensure compliance with the insurance practice, practices and requirement;
  2. to establish healthy business conduct among the insurance companies;
  • to enhance the standard corporate governance and corporate behavior among the insurance companies;
  1. to create a platform from which insurance companies collaborate and endeavor towards the promotion and expansion of general insurance business in the country.

দ্বিতীয়ত: বীমা দাবি পরিশোধের সক্ষমতা অর্জনের জন্য আর্থিক বুনিয়াদ শক্ত ও মজবুত করার প্রয়োজনীয়তা।

কোম্পানির আর্থিক অবস্থা মজবুত না হলে বীমা দাবি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। আর বীমা দাবি সময়মত সঠিকভাবে পরিশোধ না করা গেলে বীমার উপর গ্রাহকদের আস্থা থাকবে না। একবার গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হলে বীমা ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হলে অতিরিক্ত কমিশন দেয়া বন্ধ করতে হবে। এছাড়াও কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, ফান্ড ম্যানেজমেন্ট বহুমুখী করতে হবে এবং লাভজনক খাতে তা রি-বিনিয়োগ করতে হবে।

তৃতীয়ত: ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন বীমা প্রকল্প প্রচলন করতে হবে

বাংলাদেশে সাধারণ বীমা সেক্টরে কয়েকটি প্রচলিত বীমা প্রকল্প চালু রয়েছে, যেমন, অগ্নি বীমা, নৌ বীমা, দুর্ঘটনা বীমা ও বিবিধ বীমা ইত্যাদি। কিন্তু অধিক ঝুকিপূর্ণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বীমা প্রকল্প সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো গ্রহণ করতে চায় না। এছাড়া এসমস্ত বীমা প্রকল্প আন্ডারাইট করার কারিগরি জ্ঞানেরও অভাব রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডিপোজিট বীমা, শষ্য বীমা, গবাদিপশু বীমা, বিমান বীমা, কাচ নির্মিত পাত, কাচ-বীমা,আইনগত দায়-বীমা, শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ বীমা, মৎস্য (চিংড়ি) খামার বীমা, গৃহসামগ্রী রক্ষা বীমা, লিফট এর ক্ষতি বীমা, রপ্তাানিকৃত পন্যের মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চয়তা বীমা, নিবেদিতা বীমা পলিসি, ভ্রমন বীমা, নিরাপদ জমার পাত্র (ব্যাংক লকার) সর্বঝুকি বীমা, প্রবাসী সর্বঝুকি বীমা, স্বাস্থ্য বীমা, গৃহ সামগ্রী রক্ষা বীমা ইত্যাদি। এই সমস্ত বীমা প্রকল্পের প্রচলন করা গেলে দেশের বীমা ব্যবসার প্রসার হবে যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

আরএকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। তাহলো মোটরযান বীমার প্রকল্প বিধিবদ্ধ দায় বীমা (Act Liability Insurance) বা তৃতীয় পক্ষ বীমা (Third Party Insurance) বাতিল করা প্রসঙ্গে। বিগত সরকারের আমলে মোটরয়ান আধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর ১০৯, ১২৩, এবং ১২৫ নং ধারা রহিত করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর ধারা ৬০ এর উপধারা (১), (২) ও (৩) জারি করা হয়েছে। উপধারা (১) এ উল্লেখ করা হয়েছে, যে কোনো মোটরয়ানের মালিক ইচ্ছা করলে তাহার মালিকানাধীন যে কোন মোটরযানের জন্য যে সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের জন্য নিদিষ্টকৃত তাহাদের জীবন ও সম্পদের বীমা করিতে পারিবে।

উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশে ইচ্ছা করে সাধারণত কেউ বীমা করে না। সে ধরনের মনমানসিকতা এখনও তৈরি হয়নি। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে, তৃতীয়পক্ষের ঝুকি বীমা বাতিল করার পর অনেক মোটরযান মালিক কোন বীমা করতে চান না। ফলে মোটরযার মালিকদের সর্বঝুকি বীমা (Comprehensive Motor Insurance) অনেক হ্রাস পেয়েছে। শুধু যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনছেন তারাই বাধ্য হয়ে বীমা করছেন। Comprehensive Motor Insurance এর প্রিমিয়াম আয় বেশি হওয়ায় এই বীমা করতে চান না। এ কারণে মোটরযান বীমার প্রিমিয়াম আশংকাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত ২০১৯ সালের ইন্স্যুরেন্স ইয়ার বুক অনুসারে ২০১৯ সালে গ্রোস মোটর ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম আয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ২০২০ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৩৫৬.৫৫ কোটি, ২০২১ সালে ৩১৮.৬৪ কোটি এবং ২০২২ সালে ৩১৩.৪৯ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ তৃতীয়পক্ষ বীমা বন্ধ করাতে মোটর বীমার প্রিমিয়াম ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এছাড়াও বীমা পেশায় নিয়োজিত কয়েক হাজার লোক বেকার হয়েছে, যারা তৃতীয়পক্ষের ঝুঁকি বীমা বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করতো। ইতিমধ্যে অধিকাংশ নন-লাইফ বীমা কোম্পানির শাখা অফিসে যারা শুধু মোটরযান বীমা বিক্রি করতো ঐ সমস্ত শাখা অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে আরো অনেক শাখা অফিস বন্ধ হবে। আরো উল্লেখ্য যে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ধারা ৬০-এর উপধারা (১) এ উল্লেখ আছে, ‘যে কোন মোটরযানের জন্য নির্দিষ্টকৃত যাত্রী তাহাদের জীবন ও সম্পদের বীমা করতে পারিবে। অর্থাৎ রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা জনসাধারনের জীবন এবং তৃতীয় পক্ষের কোন সম্পদের কোন নিরাপত্তা থাকলো না। যন্ত্রদানব বাস ও ট্রাক পথচারীদের মেরে ফেলবে অথচ তার কোন নিরাপত্তা থাকবে না বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকবে না। এভাবে একদিকে যেমন বীমার প্রিমিয়াম আয় সংকুচিত হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে তৃতীয়পক্ষের ঝুঁকি আবোরিত করা যাচ্ছে না।

চতুর্থত: দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে
বীমা শিল্পে দক্ষ জনশক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি অভাব রয়েছে। এই অভাব পূরনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে বীমা কোম্পানিতে লোক নিয়োগের জন্য কোন বিজ্ঞপ্তি দেখি না। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মেধাবী যুবকদের আকর্ষণ করার জন্য কোন পদ্ধতি পালন করা হয় না। ফলে বীমা শিল্পে মেধাশক্তি সম্পন্ন লোকবলের আশঙ্কাজনকভাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে IDRA কর্তৃক লোকবল নিয়োগের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে তা বাস্তাবায়নের জন্য কোম্পানি গুলোতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। মনে রাখতে হবে বীমা শিল্পের উন্নতি করতে হলে দক্ষ জনশক্তির কোন বিকল্প নাই।

পঞ্চমত: উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে
যে কোন পেশায় দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রশিক্ষণ হচ্ছে ”পরিকল্পিত, সংগঠিত ও সুবিন্যস্তভাবে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সুসমন্বিত প্রচেষ্টার এবং প্রশিক্ষণার্থীদের কোন অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তৈরি করা। ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণার্থীদের কারিগরী জ্ঞানকে উজ্জীবিত করা এবং তাদের দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা করা যাতে করে তারা তাদের কাজকে আরো দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারে।
বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক বলে পরিচিত টেলর বলেছেন, “সাধারণ শিক্ষা দ্বারা মনের দিগন্ত প্রসারিত হয় এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধন করা হয়। আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করার দক্ষতা বৃদ্ধি, বিকল্প পথের মধ্যে থেকে সঠিক পথ বেছে নেয়া এবং সঠিক পথের প্রয়োগ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহন করার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়। “এখানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের উপর জোর দেয়া হয়েছে। তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের পর তার প্রয়োগ সম্পর্কে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া না হলে অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

বর্তমান পৃথিবীতে মান সম্মত উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ হচ্ছে অন্যতম হাতিয়ার এবং বীমা পেশার মানবসম্পদই হচ্ছে মূলধন।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণদানের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমি স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক সময় এই প্রতিষ্ঠানটি খুবই কর্মমূখর ছিল এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের ক্ষেত্রে মূল্যবান ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বেশ কয়েকবছর যাবত বীমা একাডেমি কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেছে। ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠান বিআইপিডি; একাডেমি ফর লানিং প্রশিক্ষনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এদের মান আরও উন্নত করতে হবে।

বিশ্ব স্বীকৃত বীমা ডিপ্লোমা হচ্ছে লন্ডন ভিত্তিক ‘এসি আই আই’ এবং ইউএসএ ভিত্তিক ‘সিএলইউ’ ডিপ্লোমা অর্জনের জন্য বীমা কর্মকর্তা কর্মচারীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বীমা কোম্পানির আয়ের একটি অংশ বাধ্যাতামূলক ভাবে বীমার শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক কল্যাণ ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য বীমা শিল্পের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে গতিশীল করা সময়ের দাবি।

এবিএম নুরুল হক

E-mail: abm.nurul.haq@gmail.com

 

 

Facebook Comments Box

Posted ০৯:৫৪ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com