এম এ খালেক
বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১ প্রিন্ট ৩৯৬ বার পঠিত
আমার বাসার নিকট থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত আল আমিন ফার্মেসি থেকে প্রায়শই প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে থাকি। বাসার নিচেই একটি ফার্মেসি থাকলেও আমি আল আমিন ফার্মেসি থেকেই প্রয়োজনীয় ঔষধ ক্রয় করে থাকি। দোকানের মালিক শামিম অত্যন্ত বিনয়ী এবং ভদ্র একজন মানুষ। তার ব্যবহারের ক্রেতাগণ খুবই মুগ্ধ। দিন দিন এই দোকানে ক্রেতা সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আশে পাশে আরো কয়েকটি ফার্মেসি থাকলেও তাতে তেমন একটা ক্রেতা সমাবেশ লক্ষ্য করা যায় না। একবার যিনি আল আমিন ফার্মেসিতে আসবেন পরবর্তীতে তিনি আর অন্য কোনো ফার্মেসিতে যেতে চাইবেন না এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে। যে কোনো ব্যবসায়ের জন্য পুঁজি প্রয়োজন। পুঁজি বলতে আমরা সাধারণত অর্থেে যোগানকেই বুঝে থাকি। কিন্রতু একমাত্র অর্থই একটি ব্যবসায়ের সফলতার মূল উপজীব্য হতে পারে না। ব্রবসায় বা যে কোনো আর্থিক কর্মকাণ্ডে আর্থিক পুঁজির সঙ্গে আরো অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। আমরা মনে করি, ব্যবসায়-বাণিজ্যে সফল হতে হলে শুধু আর্থিক পুঁজির যোগান থাকলেই চলে। কথাটি মোটেও সত্যি নয়। আর্থিক পুঁজির পাশাপাশি ব্যবসায়ে সফল হবার জন্য সততা এবং ভালো ব্যবহার খুবই প্রয়োজন। কোনো ব্যবসায়ি ব্যক্তির ব্যবহার যদি ভালো না হয় তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানে কখনোই সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করতে পারে না। ইসলামে ব্যবসায়কে করা হয়েছে হালাল আর সুদকে করা হয়েছে হারাম বা নিষিদ্ধ। একটি হাদিসে বলা হয়েছে, সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ির পরকালে বেহেস্তে অবস্থান হবে নবী-রসুল,সিদ্দিক ও শহীদের কাতারে।
ইসলামে সৎ ব্যবসায়ের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামে জীবিকার চারভাগের তিন ভাগই ব্যবসায়ে নিহিত। কিন্তু সেই ব্যবসায় হতে হবে সৎ এবং আমানতদারির মাধ্যমে। ইসলামে কোনো পর্যায়েই অসততার কোনো স্থান নেই। ব্যবসায়ে তো বটেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য এক শ্রেণির মুসলমান ব্যবসায়ির মাঝে ইসলামি আদর্শকে প্রতিনিয়তই অবজ্ঞা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ইসলামে কোনোভাবেই মজুতদারিকে স্থান দেয়া হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের এক শ্রেণির ব্যবসায়ি, যাদের অধিকাংশই মুসলমান তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে পণ্য আটকে রেখে গণদুর্ভোগ সৃষ্টি করে চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্য বৃদ্ধির হার ৮০ শতাংশের মতো। বর্তমানে বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ মার্কিন ডলারে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ৮০ থেকে ৮৫ মার্কিন ডলারে উন্নীত হতে পারে। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য পণ্যের মূল্য এক বছর আগের তুলনায় ৩৬শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে খাদ্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় বাজারে খাদ্য পণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের মূল্যই অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনোভাবেই পণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়তে বেশ কিছু দিন সময়ের প্রয়োজন।
কিন্তু আমাদের দেশের ব্যবসায়িরা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে সব ধরনের পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেন। কিন্তু তারা যেসব পণ্য বিক্রি করেন তা তো আগে থেকেই স্টক করা ছিল। তাই আগের স্টক করা পণ্য বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমাদের দেশে ব্যবসায়িদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় তাহলো, প্রতি বছর বাজেটের আগে তারা বিভিন্ন ধরনের পণ্য স্টক করে থাকেন। বাজেটে কর বৃদ্ধি করা হতে পারে এমন সব পণ্য আগে থেকেই স্টক করে রাখা হয়। কোনো কারণে যদি বাজেটে কর বাড়ানো হয় তাহলে তারা স্টককৃত সেই পণ্য বেশি মূল্যে বাজারজাত করে থাকেন। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য হ্রাস পেলে ব্যবসায়িরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই পণ্যের মূল্য হ্রাস করেন না।
ব্যবসায়িদের নিকট থেকে প্রত্যেক ক্রেতা বা ভোক্তা ভালো ব্যবহার আশা করেন। এমনকি যে ব্যবসায়ি ভোক্তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন তাদের নিকট থেকে কিছুটা বাড়তি দামে পণ্য কিনতেও ক্রেতারা দ্বিধা করেন না। ইসলাম ধর্মের ভালো দিকগুলো অন্য ধর্মের লোকেরা অনুসরণ করলেও আমরা তা করতে পারছি না। এক শ্রেণির ব্যবসায়ি যারা ক্রেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত বাজে আচরণ করে থাকেন। কেউ প্রত্যাশিত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দিতে চাইলে ব্যবসায়িরা দুর্র্ব্যবহার করে থাকেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমি ২০১৮ সালে পবিত্র হজ্ব পালন উপলক্ষে সৌদি আরব গমন করি। সেখানে এক শ্রেণির ব্যবসায়ির যে আচরণ লক্ষ্য করেছি তা কোনোভাবেই গ্রহণীয় নয়। বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষি এক শ্রেণির ব্যবসায়ির ব্যবহার খুবই খারাপ। এরা নিজেদের চট্টগ্রামের অধিবাসি হিসেবে পরিচয় দিলেও আসলে এরা মিয়ানমার থেকে আগত। তারা বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দুর্নাম করছেন। তাদের ব্যবহারে ক্রেতারা খুবই বিরক্ত। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন বাস্তচ্যুৎ মানুষের ব্যবহার সাধারণত খারাপ হয়ে থাকে। যারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে কোনোভাবে সৌদি আরব বা অন্য কোনো দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তারা যাতে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে না পারেন তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ক’বছর আগে বিহেভিয়ারাল ইকোনমিতে একজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল বিক্রেতার কোনো পণ্যের উপর মূল্য ছাড় দিলে ভোক্তাদের আচরণ কেমন হয় তা নিরূপন করা। তিনি গবেষণায় দেখিয়েছেন, কোনো ব্রান্ডের নির্দিষ্ট পণ্যের উপর মূল্য ছাড় দেয়া হলে ক্রেতারা সেই পণ্য ক্রয়ের জন্য অতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। এমন কি যার বর্ণিত পণ্যটি কেনার কোনো জরুরি আবশ্যকতা নেই তিনিও কম মূল্যের আশায় পণ্যটি কিনে থাকেন। তবে এখানে একটি মজার ব্যাপার ঘটে। কোনো উৎপাদক সাধারণত লোকসান দিয়ে তার পণ্য বিক্রি করেন না। তিনি পণ্যের মূল্য ছাড় দেবার সময় এমনভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন যাতে কিছু না কিছু লাভ বা মুনাফা থাকে। অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় যে পণ্যের মূল্য হতে পারে ১০ টাকা সেই পণ্যের মূল্য ১৫ টাকা নির্ধারণ পাঁচ টাকা ছাড় দেয়া হয়।
এতে ভোক্তারা মনে করেন, তিনি পণ্যটি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচ টাকা কমে পেলেন। এতে তিনি এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি অর্জন করেন। কিন্তু বিক্রেতা কোনোভাবেই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। মক্কায় অবস্থানকালে এই বিষয়টি লক্ষ্য করেছি। বিভিন্ন সুপার শপে নির্ধারিত মূল্য পণ্য বিক্রি করা হয়। প্রতিটি জোব্বার মূল্য লিখে রাখা হয়েছে ৬০/৭০ বিয়াল। অনেকেই নির্ধারিত মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে থাকেন। কিন্তু পবিত্র হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে মুসল্লিদের প্রায় সবাই মদিনাতে গমনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এই সময় দোকান মালিকগণ নির্ধারিত মূল্যের পণ্যের দাম কমিয়ে ৩৪ থেকে ৪০ রিয়াল নির্ধারণ করেন। নিশ্চয়ই তারা হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রি করে লোকসান দেবেন না। তারা এমনভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন যাতে দাম কামিয়ে দিলেও লোকসান না হয়।
বাংলাদেশের ব্যবসায়িদের আচরণ বড়ই অদ্ভুত। তারা ব্যবসায়ের স্বীকৃত নিয়ম-কানুনের কোনো ধার ধারেন না। অনেকেরই হয়তো মনে আছে, ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমন করলে সারা মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী অস্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক হানাহানি শুরু হয়। সেই সময় সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় কনজুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) তাৎক্ষণিকবাবে রাজধানীর বাজারে জরিপ পরিচালন করে বিস্ময়কর তথ্য খুঁজে পায়। দেখা যায়, সেই সময় ঢাকার বাজারে সবচেয়ে বেশি মূল্য বৃদ্ধি পায় শাকসবজি এবং কাঁচা তরকারির। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবার কারণে স্থানীয় বাজারে পণ্যমূল্য ব্যাপকভাবে কমে যাবার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে উল্টোটি। আমাদের দেশে কোনো সরকারই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয় নি। এর কারণ হচ্ছে, সব সরকার আমলেই এক শ্রেণির ব্যবসায়ি রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় নিয়ে সিন্ডেকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
কিন্তু সরকার এদের নিয়ন্ত্রণ না করে বরং নানাভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছে। আর এ কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বাজারে কোনো পণ্যের উপস্থিতি ভোক্তার ক্রয় সামর্থ্যকে নিশ্চিত করে না। অর্থাৎ বাজারে কোনো পণ্য থাকলেই ক্রেতা তা কিনতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার ক্রয় করার সামর্থ্য সৃষ্টি না হবে। কাজেই ক্রয়ক্ষমতা বা পারচেজিং পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
করোনার কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। কাজেই তারা বাজারে গিয়ে উদ্দিষ্ট পণ্য ক্রয় করতে পারছে না। কাজেই এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আর এটা সম্ভব মানুষের ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে। করোনার প্রকোপ অনেকেটাই কমে এসেছে। আর কিছু দিন পরই শুরু হবে অর্থনৈতিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। সেই উদ্যোগে দেশের সব মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
Posted ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com