|

Advertisement
×

শ্রমিক পাঠানোর আগে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাধ্যতামূলক চুক্তি চায় অধিকার সংগঠন

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৭ বার পঠিত

শ্রমিক পাঠানোর আগে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাধ্যতামূলক চুক্তি চায় অধিকার সংগঠন

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ আবারও বড় পরিসরে শুরু করার আগে দুই দেশের মধ্যে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক শ্রমচুক্তি করার দাবি জানিয়েছে দুটি মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, আগের চুক্তিগুলো অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, বেতন না দেওয়া, ঋণের ফাঁদ ও শ্রমিক নির্যাতন ঠেকাতে কার্যকর হয়নি।

মাইগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্ক (MWN) ও ফোর্টিফাই রাইটস এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, আগের অনিবন্ধিত বা অ-বাধ্যতামূলক সমঝোতা স্মারকের (MoU) পরিবর্তে এমন একটি দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি করতে হবে, যার শর্ত লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে চললেও এখনো নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নির্দেশনা পায়নি বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন ইতোমধ্যে চাহিদাপত্র সত্যায়ন শুরু করেছে। তবে কর্মী বাছাই, মেডিকেল পরীক্ষা, প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কার্যক্রম কখন ও কীভাবে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

‘আগের নির্যাতন যেন আবার না হয়’

৩০ সেপ্টেম্বর দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটি বলেছে, অতীতে বাংলাদেশি কর্মীরা যেসব নির্যাতন ও অনিয়মের শিকার হয়েছেন, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত নতুন করে কর্মী পাঠানো উচিত নয়।

মাইগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্কের সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অতীতে শ্রমিকদের যে ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, তা আর পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।

ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি বলেন, কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর আগেই কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তাদের অভিযোগ জানানোর এবং প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও থাকতে হবে।

আগের চুক্তিতেও ছিল শ্রমিক সুরক্ষার বিধান

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সর্বশেষ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এর আগে ২০০৩, ২০১২ ও ২০১৬ সালেও দুই দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি হয়েছিল। তবে শ্রমিক নির্যাতন ও দুর্নীতির অভিযোগে এসব ব্যবস্থার কার্যক্রম একাধিকবার স্থগিত হয়েছে।

২০২১ সালের চুক্তিতে নিয়োগকর্তার ওপর বিমানভাড়া, অভিবাসনসংক্রান্ত ব্যয়, আবাসন এবং স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিমার খরচ বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটি, ওভারটাইমের পারিশ্রমিক, বার্ষিক ছুটি এবং কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও ছিল।

তবে MWN ও Fortify Rights-এর দাবি, বাস্তবে এসব বিধানের অনেকটাই কার্যকর হয়নি।

অতিরিক্ত ফি ও বেতন না দেওয়ার অভিযোগ

চলতি বছরের জুলাইয়ে সংগঠন দুটি ১৮ জন সাবেক বাংলাদেশি কর্মীর সাক্ষাৎকার নেয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট জব্দ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করার মতো নানা সমস্যা ছিল।

নোয়াখালীর ২৩ বছর বয়সী এক কর্মী একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় গুরুতর মেরুদণ্ডের আঘাত পান। তার অভিযোগ, কাজ শুরুর আগে তাকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটি তার চিকিৎসার খরচ বা ক্ষতিপূরণ দেয়নি। এমনকি তার ১৬ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত বেতনও বকেয়া ছিল।

মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ওই কর্মী একটি ব্যাংক ঋণ এবং স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন।

আরেক ২২ বছর বয়সী কর্মী জানান, ২০২৩ সালে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য তিনি এক দালালকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেন, যা সরকার নির্ধারিত নিয়োগ ব্যয়ের সাত গুণেরও বেশি।

তার অভিযোগ, রিক্রুটিং এজেন্সি তাকে ও অন্য কর্মীদের একটি ভিডিওতে বলতে বাধ্য করেছিল যে তারা মাত্র ৭৯ হাজার টাকা দিয়েছেন।

পাসপোর্ট জব্দ ও অবৈধ অবস্থানের অভিযোগ

মানবাধিকার সংগঠন দুটি আরও জানিয়েছে, কিছু বাংলাদেশি কর্মীর পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছিল। অনেক শ্রমিককে অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে এবং অতিরিক্ত সময় কাজ করেও পারিশ্রমিক পাননি।

কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করায় তারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই মালয়েশিয়ায় অবস্থানের ঝুঁকিতে পড়েন।

এক সাবেক বাংলাদেশি কর্মী জানান, নিয়োগকর্তা তার ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করার পর এবং পরে তাকে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে অস্বীকার করায় তাকে মুয়ার ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে ৪৬ দিন আটক থাকতে হয়।

ফোর্টিফাই রাইটসের দাবি, ২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ার অভিবাসন হেফাজতে অন্তত ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দুর্নীতির অভিযোগে বাংলাদেশেও মামলা

বাংলাদেশেও মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও মামলা হয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৩১ জনের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা করে। অভিযোগ ছিল, মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে ১ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগে ব্যাপক প্রতারণা ও শোষণের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অল্পসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির একটি বন্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ পরিচালনার অভিযোগও উঠে আসে।

মালয়েশিয়ায় ৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি সক্রিয় ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করছেন। বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে বাংলাদেশই বর্তমানে মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় শ্রমের উৎস।

MWN ও Fortify Rights বলেছে, নতুন শ্রমচুক্তিতে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, ঋণের ফাঁদ, বেতন না দেওয়া, পাসপোর্ট জব্দ এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সুরক্ষা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং দ্রুত ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলির ভাষায়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার আরেকটি দুর্বল সমঝোতা স্মারক নয়, বরং শ্রমিক নির্যাতন ও দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি প্রয়োজন।

Facebook Comments Box

Posted ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com