সজল সরকার
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ৯ বার পঠিত
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বড় পর্যটন ও অর্থনৈতিক উৎসব। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপকে ঘিরে লাখো দর্শক দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করেন, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি ডলারের প্রবাহ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয় এই টুর্নামেন্টে এবং তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে এই মহাযজ্ঞ। তিন দেশের ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ম্যাচগুলো। তবে ব্যয়, ঐতিহ্য, পর্যটন আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অভিজ্ঞতার বিচারে কয়েকটি শহর অন্যগুলোর তুলনায় বিশেষভাবে এগিয়ে রয়েছে। নিচে আলোচিত, ঐতিহ্যবাহী ও ব্যয়বহুল ১০ টি শহরের তালিকা তুলো ধরা হলো:
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র:
বিশ্বকাপ উপলক্ষে সবচেয়ে আলোচিত ১ম স্থানের শহর নিঃসন্দেহে নিউইয়র্ক। বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল এই নগরী শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক রাজধানীই নয়, এটি বিশ্ব পর্যটনেরও অন্যতম কেন্দ্র। টাইমস স্কয়ার, সেন্ট্রাল পার্ক, স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ব্রডওয়ে এবং অসংখ্য জাদুঘরের কারণে সারা বছরই পর্যটকে মুখর থাকে শহরটি। বিশ্বকাপের সময় এখানে প্রতিদিনের থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত বাবদ একজন দর্শকের ১০০০ থেকে ১৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। ব্যয়বহুল হলেও অভিজ্ঞতার দিক থেকে নিউইয়র্ককে বিশ্বের অন্যতম সেরা গন্তব্য হিসেবে ধরা হয়।
লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র:
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস। চলচ্চিত্রের রাজধানী হলিউড, বেভারলি হিলস, সান্তা মনিকা সৈকত এবং আন্তর্জাতিক বিনোদন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় এই শহরের জনপ্রিয়তা আলাদা। বিশ্বকাপ দেখতে এসে একই সঙ্গে সিনেমার জগৎ, সমুদ্রসৈকত এবং আধুনিক নগরজীবনের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ মিলবে। তবে এর জন্য দৈনিক ৭০০ থেকে ১৪০০ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো:
ঐতিহ্যের দিক থেকে তালিকার অন্যতম শীর্ষে রয়েছে মেক্সিকো সিটি। এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নগরী। অ্যাজটেক সভ্যতার নিদর্শন, শতবর্ষী গির্জা, ঐতিহাসিক চত্বর এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এই শহরকে অনন্য করেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসেও মেক্সিকো সিটির বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল এখানেই। তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে—প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৬০০ ডলারের মধ্যে—এখানে ভ্রমণ সম্ভব।
টরন্টো, কানাডা:
কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টো আধুনিকতা ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের এক অসাধারণ উদাহরণ। সিএন টাওয়ার, উন্নত গণপরিবহন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নিরাপদ নগরজীবনের কারণে এটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের বসবাস এই শহরকে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মিলনস্থলে পরিণত করেছে। এখানে দৈনিক ব্যয় হতে পারে ৫০০ থেকে ৯০০ ডলার।
বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র:
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস জানতে চাইলে বোস্টন অন্যতম সেরা গন্তব্য। মার্কিন স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই শহর। পাশাপাশি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)-এর মতো বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থানও এখানে। ইতিহাস, শিক্ষা ও আধুনিকতার সমন্বয়ে বোস্টন বিশ্বকাপ দর্শকদের জন্য ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে। দৈনিক ব্যয় ৬০০ থেকে ১১০০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে।
সান ফ্রান্সিসকো, যুক্তরাষ্ট্র:
প্রযুক্তি ও পর্যটনের অনন্য সমন্বয় দেখা যায় সান ফ্রান্সিসকো শহরে। গোল্ডেন গেট ব্রিজ, আলকাট্রাজ দ্বীপ, কেবল কার এবং সিলিকন ভ্যালির নিকটবর্তী অবস্থান শহরটিকে বিশেষ আকর্ষণ দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর হওয়ায় এখানে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১০০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা:
কানাডার ভ্যাঙ্কুভার প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গ বলা যায়। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগর দুইয়ের মিলনে গড়ে ওঠা এই শহরকে বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বিশ্বকাপের দর্শকদের কাছে এটি অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।
সিয়াটল, যুক্তরাষ্ট্র:
সিয়াটল প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির শহর হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি, বিখ্যাত কফি সংস্কৃতি এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ এই শহরকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। ব্যয় তুলনামূলক বেশি হলেও নগরজীবন ও প্রকৃতির সমন্বয় দর্শকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করবে।
ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাষ্ট্র:
ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ফিলাডেলফিয়াও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং সংবিধানের সঙ্গে এই শহরের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে আগ্রহীদের জন্য এটি এক অনন্য গন্তব্য। অন্য বড় শহরগুলোর তুলনায় এখানে ভ্রমণ ব্যয়ও কিছুটা কম।
গুয়াদালাহারা, মেক্সিকো:
তালিকার শেষ হলেও গুরুত্বে পিছিয়ে নেই মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা। মারিয়াচি সংগীতের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই শহর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং প্রাণবন্ত উৎসবের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত। ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, স্থানীয় খাবার এবং সাশ্রয়ী ব্যয় এটিকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৫০০ ডলারের মধ্যেই এখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের লড়াই নয়; এটি উত্তর আমেরিকার পর্যটন শিল্পের জন্যও একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ। লাখো বিদেশি দর্শকের আগমনে হোটেল, বিমান, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এবং বিনোদন শিল্পে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হবে। অনেক শহর ইতোমধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং পর্যটকসেবা সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে।
তবে বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ফ্রান্সিসকোর মতো শহরে হোটেলের ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে। তাই যারা বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য আগাম বুকিং এবং সঠিক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইতিহাস, সংস্কৃতি, আধুনিকতা, প্রকৃতি ও অর্থনীতির এক অনন্য সংমিশ্রণ হয়ে উঠবে এই আসর। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শকদের কাছে এটি হবে একই সঙ্গে ফুটবলের উৎসব এবং উত্তর আমেরিকার বৈচিত্র্যময় নগরজীবনকে কাছ থেকে জানার এক বিরল সুযোগ।
Posted ০৮:৩৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com