সজল সরকার
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ২৬ বার পঠিত
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়। এটি আবেগ, ইতিহাস, বীরত্ব, ট্র্যাজেডি এবং বিস্ময়ের এক অনন্য মঞ্চ। গত প্রায় এক শতাব্দীতে বিশ্বকাপ এমন অসংখ্য ম্যাচ উপহার দিয়েছে, যেগুলো সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। কোনো ম্যাচে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোল, কোথাও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, কোথাও আবার একজন খেলোয়াড় একাই বদলে দিয়েছেন পুরো ম্যাচের ভাগ্য।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচগুলোর তালিকা তৈরি করা সহজ নয়। তবু ফুটবল বিশ্লেষক ও ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে কিছু ম্যাচ বারবার উঠে আসে সর্বকালের সেরার তালিকায়। এসব ম্যাচ শুধু বিজয়-পরাজয়ের গল্প নয়; এগুলো বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেওয়া মুহূর্তের সাক্ষী। এরকম সেরা ১০ খেলার তালিকা করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম গিভমিস্পোর্ট ডট কম। নিচে এ তালিকা দেওয়া হলো:
১. আর্জেন্টিনা ৩-৩ ফ্রান্স (২০২২ ফাইনাল): সর্বকালের সেরা ফাইনাল?
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ম্যাচ বলে মনে করেন। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা একসময় ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোলে ম্যাচে ফিরে আসে ফ্রান্স।
অতিরিক্ত সময়ে আবার গোল করেন মেসি, এরপর হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে ম্যাচ সমতায় ফেরান এমবাপ্পে। ৩-৩ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জিতে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্নও পূরণ হয় এই ম্যাচে।
২. ইতালি ৪-৩ পশ্চিম জার্মানি (১৯৭০): শতাব্দীর ম্যাচ:
মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালটি এখনও “গেম অব দ্য সেঞ্চুরি” নামে পরিচিত।
নির্ধারিত সময় শেষে স্কোর ছিল ১-১। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে হয় পাঁচটি গোল—যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল ঘটনা। শেষ পর্যন্ত ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে ইতালি। নাটকীয়তা, আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং অবিশ্বাস্য উত্তেজনার জন্য ম্যাচটি আজও কিংবদন্তি।
৩. আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড (১৯৮৬): ম্যারাডোনার দুই মুখ:
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে অসাধারণ ম্যাচগুলোর একটি। প্রথম গোলটি করেন দিয়েগো ম্যারাডোনা হাতে বল স্পর্শ করে যা পরে “হ্যান্ড অব গড” নামে পরিচিত হয়।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর তিনি মাঝমাঠ থেকে একাই পাঁচজনকে কাটিয়ে যে গোলটি করেন, সেটিকে ফিফা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই ম্যাচে বিতর্ক ও শিল্প—দুটিই দেখিয়েছিলেন ম্যারাডোনা।
৪. পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪): বার্নের অলৌকিক ঘটনা:
১৯৫৪ সালের ফাইনালে অপ্রতিরোধ্য হাঙ্গেরি মাত্র আট মিনিটেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে পশ্চিম জার্মানি ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জয় পেয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় তারা।
এই ম্যাচই “মিরাকল অব বার্ন” নামে ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
৫. ফ্রান্স ৩-৩ পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২): টাইব্রেকারের নতুন ইতিহাস:
এটাই ছিল বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ, যার নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। ফ্রান্স ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ড্র করে বসে। পরে টাইব্রেকারে জয় পায় পশ্চিম জার্মানি।
গোলরক্ষক হ্যারাল্ড শুমাখারের বিতর্কিত ফাউল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
৬. ইংল্যান্ড ৪-২ পশ্চিম জার্মানি (১৯৬৬): বিতর্কিত গোলের ফাইনাল:
বিশ্বকাপ ফাইনালে জিওফ হার্স্টের হ্যাটট্রিক এখনও একমাত্র উদাহরণ। তবে সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত ছিল অতিরিক্ত সময়ে তার দ্বিতীয় গোল। বলটি গোললাইন পুরোপুরি অতিক্রম করেছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক এখনও থামেনি। সেই জয়েই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ড।
৭. উরুগুয়ে ২-১ ব্রাজিল (১৯৫০): মারাকানার নীরবতা:
দেড় লক্ষাধিক দর্শকে ঠাসা মারাকানা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ জয়ের উৎসবের প্রস্তুতি নিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু উরুগুয়ে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে সৃষ্টি করে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় অঘটন। “মারাকানাজো” নামে পরিচিত এই পরাজয় এখনও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি।
৮. ইতালি ১-১ ফ্রান্স (২০০৬): জিদানের শেষ ম্যাচ:
বার্লিনের সেই ফাইনাল শুধু ইতালির শিরোপা জয়ের জন্য নয়, বরং জিনেদিন জিদানের বিদায়ের জন্যও স্মরণীয়। মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করে লাল কার্ড দেখেন জিদান। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ফুটবলারের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি এভাবেই শেষ হয়।
টাইব্রেকারে জয় পেয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জেতে ইতালি।
৯. ব্রাজিল ১-১ চিলি (২০১৪): স্বাগতিকদের হৃদয় কাঁপানো রাত:
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের বিপক্ষে দারুণ লড়াই করে চিলি। শেষ মিনিটে চিলির মাউরিসিও পিনিয়ার শট ক্রসবারে লেগে ফিরে না এলে ব্রাজিল বিদায় নিতে পারত। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে সেলেসাওরা।
১০. ব্রাজিল ১-৭ জার্মানি (২০১৪): অসম্ভব এক দুঃস্বপ্ন:
এটি হয়তো সবচেয়ে সুন্দর ম্যাচ নয়, কিন্তু সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ম্যাচগুলোর একটি। নিজেদের মাঠে সেমিফাইনালে মাত্র ২৯ মিনিটের মধ্যে পাঁচ গোল হজম করে ব্রাজিল।
শেষ পর্যন্ত ৭-১ ব্যবধানে জিতে জার্মানি ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। আজও “মিনেইরাজো” বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা ম্যাচগুলো:
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর নতুন গল্প লিখে। কিন্তু কিছু ম্যাচ সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। কখনও একজন খেলোয়াড়ের জাদু, কখনও পুরো দলের অসাধারণ লড়াই, আবার কখনও অবিশ্বাস্য নাটকীয়তা—এসব কারণেই এই ম্যাচগুলো শুধু ফলাফলের জন্য নয়, ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও বেঁচে থাকবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালেও নতুন নতুন ইতিহাস লেখা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে যতই নতুন রোমাঞ্চ সৃষ্টি হোক না কেন, এই দশটি মহারণ ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে চিরকাল বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে।
Posted ০৭:৫৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com