নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ১৯ বার পঠিত
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু গোল, ট্রফি আর আবেগের গল্প নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক আয়োজনও। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আসরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয় শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্য। টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি, পর্যটন, হোটেল, পরিবহন, ক্রীড়াসামগ্রী, বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে বাজির বাজার সবখানেই বিশ্বকাপের প্রভাব পড়ে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিয়েছে এবং ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে দর্শকসংখ্যা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল সবাই সমানভাবে পায়নি। কোথাও এসেছে রেকর্ড আয়, কোথাও আবার বেড়েছে ব্যয়ের বোঝা। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসি দিয়েছে বিশ্বকাপের ব্যবসার হিসাব।
ফিফা’র আয় কত
বিশ্বকাপ মানেই ফিফার সবচেয়ে বড় আয়। চার বছরের আর্থিক চক্রে সংস্থাটির মোট আয়ের বড় অংশ আসে এই একটি প্রতিযোগিতা থেকেই।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফা প্রায় ৭৬০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছিল। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, ২০২৬ সালের আসরে সেই রেকর্ড সহজেই ছাড়িয়ে যাবে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান চক্রে ফিফার মোট আয় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
ফিফার আয়ের প্রধান উৎস সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, লাইসেন্স, আতিথেয়তা কর্মসূচি এবং টিকিট বিক্রি। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আনুষ্ঠানিক টিকিট পুনর্বিক্রয় ব্যবস্থা। এই প্ল্যাটফর্মে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষের কাছ থেকেই কমিশন নেওয়া হয়েছে, যা সংস্থার জন্য নতুন আয়ের পথ খুলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা আরও বাড়ানো হলে এশিয়ার বড় বাজারগুলো থেকেও ফিফার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে দর্শকদের বাড়তি ব্যয়:
বিশ্বকাপ মাঠে বসে দেখা কোটি সমর্থকের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে এবার অনেককেই গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
টিকিটের প্রাথমিক মূল্যই ছিল বেশ চড়া। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চাহিদাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা। ফলে জনপ্রিয় ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফাইনালের কিছু টিকিটের মূল্য এতটাই বেশি হয়েছিল যে সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে যায়।
টিকিট কিনেই ব্যয় শেষ হয়নি। আন্তর্জাতিক বিমানভাড়া, হোটেল, খাবার, স্থানীয় পরিবহন এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একজন দর্শকের মোট ব্যয় কয়েক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে আয়োজক শহরগুলোর গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। স্টেডিয়ামে যাতায়াতের ট্রেনভাড়া কয়েক গুণ বাড়ানো হয়। পরে কিছুটা কমানো হলেও তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের আয় বেড়েছে:
বিশ্বকাপ সম্প্রচারের অধিকার কিনতে আন্তর্জাতিক টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের বিপুল দর্শকসংখ্যা তাদের সেই বিনিয়োগকে লাভজনক করে তুলেছে।
বিশেষ করে বিজ্ঞাপনের বাজার ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। জনপ্রিয় ম্যাচগুলোতে কয়েক সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের মূল্যও কয়েক লাখ ডলারে পৌঁছায়।
এবারের বিশ্বকাপে খেলার মধ্যে পানি পানের বিরতি সম্প্রচারকারীদের জন্য নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করে। এই বিরতির সময় অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পাওয়ায় বিজ্ঞাপন বিক্রি আরও বেড়েছে।
স্পনসরদেরও বড় প্রাপ্তি:
বিশ্বকাপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা, হুন্দাইসহ বিশ্বকাপের বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছে নিজেদের প্রচারণায়। অন্যদিকে নাইকিও বিভিন্ন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে আলাদা প্রচারণা চালিয়েছে।
তারকা ফুটবলারদের কেন্দ্র করে তৈরি বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্মিত বিজ্ঞাপন বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক দিককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ শেষ হলেও এই প্রচারণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
আয়োজক শহরগুলো কতটা লাভবান?
বিশ্বকাপ উপলক্ষে লাখো পর্যটক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করেছেন। এতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ক্রেতা পেয়েছেন।
ফিফার হিসাব অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার যোগ করতে পারে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি এবং প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই এই হিসাব নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, বড় ক্রীড়া আসর চলাকালে সাধারণ পর্যটকদের একটি অংশ ভিড় এড়াতে ভ্রমণ বাতিল করেন। ফলে প্রত্যাশিত অতিরিক্ত আয় সবসময় বাস্তবে দেখা যায় না।
এ ছাড়া নতুন যেসব চাকরি সৃষ্টি হয়, তার অধিকাংশই অস্থায়ী এবং কম মজুরির আতিথেয়তা খাতে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত।
হোটেল ব্যবসায় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি:
বিশ্বকাপকে ঘিরে হোটেল ব্যবসায়ীরা ব্যাপক বুকিংয়ের আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক শহরেই সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ম্যাচের দিনগুলোতে কক্ষের চাহিদা বাড়লেও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে হোটেলগুলো পূর্ণ ছিল না। শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতে, আগের বছরের তুলনায় অনেক জায়গায় বুকিংও কম হয়েছে।
কিছু হোটেল মালিক অভিযোগ করেছেন, ফিফা আগাম বিপুলসংখ্যক কক্ষ সংরক্ষণ করায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল। যদিও ফিফা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
জার্সির বাজারে রেকর্ড বিক্রি:
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ব্যবসাগুলোর একটি হয়েছে জাতীয় দলের জার্সি বিক্রি।
ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের জার্সির চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল জার্সি এখন শুধু সমর্থনের প্রতীক নয়; এটি ফ্যাশনেরও অংশ। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পুরোনো নকশার জার্সির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।
তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশ্বজুড়ে নকল জার্সির বাজারও সমানতালে বিস্তৃত হয়েছে, যা মূল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজির বাজারে নতুন রেকর্ড:
ম্যাচের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রীড়া বাজির বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপে বাজির মোট পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আগে ম্যাচ শুরুর আগে বাজি ধরার প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন ম্যাচ চলাকালীন মুহূর্তভিত্তিক বাজির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং মোবাইলভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ক্রীড়া বাজি বৈধ হওয়ায় এই বাজারের বিস্তার আরও দ্রুত হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে লাভ কতটা?
বিশ্বকাপকে ঘিরে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হলেও অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল সীমিত।
যেসব দেশ নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করে, তারা অনেক সময় ভবিষ্যতে সেই অবকাঠামোর সুবিধা পায়। তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে অধিকাংশ স্টেডিয়াম, হোটেল ও পরিবহনব্যবস্থা আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। ফলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
এ কারণে এবারের বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব মূলত স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, আধুনিক ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি বহু বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক শিল্প। এই আয়োজন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ফিফা, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক স্পনসর, ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং বাজি কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে সাধারণ দর্শকদের বড় অংশকে বহন করতে হয়েছে উচ্চ টিকিটমূল্য, ভ্রমণ, আবাসন ও অন্যান্য খরচের চাপ। আয়োজক শহরগুলোর ব্যবসায়ীরা সাময়িক সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই লাভ কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
অর্থনীতির বিচারে তাই বিশ্বকাপের প্রকৃত চ্যাম্পিয়ন কোনো জাতীয় দল নয়; বরং বৈশ্বিক ক্রীড়া বাণিজ্যকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বড় বিজয়ী।
Posted ০৮:৩৫ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com