সজল সরকার
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ২৮ বার পঠিত
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বিপুল খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং তারল্য সংকট। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখনো কাটেনি।
২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণের হার আবারও বেড়েছে।
এখানেই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বললেও পুরোনো ঋণখেলাপির বোঝা দ্রুত কমানো সম্ভব হয়নি। বরং চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। ফলে ব্যাংকের সম্পদের মান, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানিয়েছেন, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। সরকার খেলাপি ঋণ কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নয়, বেসরকারি ব্যাংকের একটি অংশও তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক এবং চতুর্থ প্রজন্মের কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংকের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।
২৯ ব্যাংককে ছয় মাসের সময়:
খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাইয়ে ২৯টি ব্যাংককে ছয় মাসের সময়সীমা দিয়েছে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি, তাদের তা ২০ শতাংশের নিচে নামাতে বলা হয়েছে। আর যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে, তাদের ছয় মাসের মধ্যে তা ১০ শতাংশের নিচে নামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এটি নতুন সরকারের সময়ে ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত বুঝিয়ে দিয়েছে, কেবল ঋণ পুনঃতফসিল বা নতুন করে সময় দেওয়ার মাধ্যমে সংকট আড়াল না করে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সম্পদের মান প্রকাশ করতে হবে।
দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে নতুন কাঠামো:
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত হস্তক্ষেপ, পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনে সুশৃঙ্খলভাবে সমাধানের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি পর্যালোচনাতেও আইনটিকে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সংকটে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ কমাতেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ‘এক্সিট পলিসি’ চালু করেছে। ব্যবসা বা প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের এককালীন সমঝোতার মাধ্যমে দায় নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো আটকে থাকা অর্থের একটি অংশ দ্রুত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক খাতের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি করা।
ঋণ প্রবাহে সতর্কতা:
ব্যাংকিং খাতের আরেকটি বড় চিত্র হলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধীরগতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
অর্থাৎ ব্যাংকগুলো নতুন করে বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে তুলনামূলকভাবে সতর্ক রয়েছে। খেলাপি ঋণের ভয়, দুর্বল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাংকের নিজস্ব ব্যালান্সশিটের চাপ এর অন্যতম কারণ। এর ফলে শিল্প ও ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হয়েছে। মে ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানত বেড়ে প্রায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা হয়েছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। মূলত মেয়াদি আমানত বৃদ্ধিই এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ছয় মাসের মূল্যায়ন:
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ বেড়েছে, কিন্তু সংকটের মাত্রা এখনো কমেনি। খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশের ওপরে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংক তারল্য সংকটে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে—এসবই খাতটির দুর্বল অবস্থার প্রতিফলন।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমাতে নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক্সিট পলিসির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই মূল প্রশ্ন।
আগামী ছয় মাস তাই ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২৯টি ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে পারে কি না, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিপুল খেলাপি ঋণ কতটা আদায় হয় এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনা যায়—এসবের ওপরই নির্ভর করবে বিএনপি সরকারের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের প্রথম বছরের সাফল্য।
Posted ০৮:১৩ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com