বিশেষ প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ৭০ বার পঠিত
যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অজিত চন্দ্র আইচকে আপাতত কোম্পানিটির পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।তাঁর সাবেক কর্মস্থল সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের একটি ব্যাংক হিসাব থেকে ২০২২ সালে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা উত্তোলনের একটি চেকে তাঁর স্বাক্ষর থাকার বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত সিইও হিসেবে তাঁকে নিয়োগ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আইডিআরএ’র একটি দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সোমবার আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনের সঙ্গে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান বদরুল আলম খানের নেতৃত্বে কোম্পানির একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। বৈঠকে কোম্পানিটির সার্বিক পরিস্থিতি এবং অজিত চন্দ্র আইচকে সিইও হিসেবে নিয়োগ প্রস্তাবের অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হয়। এসময় আইডিআরএর পক্ষ থেকে যমুনা লাইফের পর্ষদকে কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য মুখ্য নির্বাহীদের পুল থেকে কাউকে সিইও হিসেবে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আর যেহেতু অজিত চন্দ্র আইচের নেতৃত্বে কোম্পানিটির সার্বিক কার্যক্রম ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সেজন্য তাকে পরামর্শক পদে নিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়। অজিত চন্দ্র আইচ আইডিআরএর সম্ভাব্য মুখ্য নির্বাহীদের পুলে শীর্ষে রয়েছেন।
বৈঠকে আইডিআরএর পক্ষ থেকে বলা হয়, সোনালী লাইফের চেক-সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে অজিত চন্দ্র আইচের বীমা খাতের যে কোনো কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেতে বাধা থাকার কথা নয়। ওই বৈঠকে আইডিআরএ চেয়ারম্যানের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সদস্য (লাইফ) আপেল মাহমুদও উপস্থিত ছিলেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে অজিত চন্দ্র আইচকে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ অনুমোদনের প্রস্তাব আইডিআরএতে পাঠায় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। এতে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য নিয়োগ অনুমোদনের অনুরোধ জানান কোম্পানির চেয়ারম্যান বদরুল আলম খান।
অজিত চন্দ্র আইচ যমুনা লাইফে যোগদানের পর থেকে তার সুদক্ষ ব্যবস্থাপনায় কোম্পানিটির ব্যয় সংকোচন, শতভাগ প্রিমিয়াম জমা, ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে কর্মীদের পেমেন্ট গ্রহণ এবং নতুন নতুন শাখা স্থাপন হয়েছে। তিনি যোগদানের পর থেকে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে যেখানে কোম্পানিটির ব্যয় ছিল ২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সেখানে চলতি বছরের ৬ মাসে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে ব্যবস্থাপনা ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে এনেছেন তিনি।
চেকে স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন:
আইডিআরএর নথি অনুযায়ী, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি হিসাব থেকে ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি ড্রাগন ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেডের অনুকূলে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি চেক ইস্যু করা হয়। ওই চেকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে অজিত চন্দ্র আইচের স্বাক্ষর ছিল।
তবে আইডিআরএর নথি অনুযায়ী, অজিত চন্দ্র আইচ ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সোনালী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। এরপর ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আইডিআরএর অনুমোদন নিয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ফলে ২০২২ সালে সোনালী লাইফের সিইও পদে না থেকেও কীভাবে তাঁর স্বাক্ষর ওই চেকে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আইডিআরএ। এ বিষয়ে সোনালী লাইফ কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়।
গত ২ জুলাই কোম্পানিটি যে জবাব দেয়, তাতে চেকে অজিত চন্দ্র আইচের স্বাক্ষরের বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে কর্তৃপক্ষের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে স্পষ্ট বক্তব্য দিতে সোনালী লাইফকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোনালী লাইফ কর্তৃপক্ষ অবশ্য লিখিত প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, চেক-সংক্রান্ত বিষয়টি তদন্তাধীন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি অজিত চন্দ্র আইচের সাত বছরের দায়িত্বকালকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ করেছে।
অজিত চন্দ্র আইচ ২০২০ সালের ৩০ জুন সোনালী লাইফ থেকে বিদায় নেন। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার সঙ্গে ২০২২ সালের একটি চেকের স্বাক্ষরকে যুক্ত করা হচ্ছে।
সোনালী লাইফের ব্যাখ্যা:
আইডিআরএকে দেওয়া চিঠিতে সোনালী লাইফের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হিসাব থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার চেক ইস্যু ও স্বাক্ষরের বিষয়ে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ রেকর্ড পর্যালোচনা করা হয়েছে।
কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই লেনদেনের সময় ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মূল দায়িত্বে ছিলেন রাশেদ বিন আমান। সোনালী লাইফ দাবি করেছে, ওই লেনদেন তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ বিন আমানের মাধ্যমে সংঘটিত অনিয়মের অংশ ছিল এবং এর সঙ্গে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বা অজিত চন্দ্র আইচের ব্যক্তিগত বা আর্থিক সম্পৃক্ততা ছিল না।
চিঠিতে আরও বলা হয়, অজিত চন্দ্র আইচসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে বীমা খাতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের দীর্ঘ কর্মজীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের প্রতিও বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ শ্রদ্ধাশীল।
সোনালী লাইফ আরও জানিয়েছে, সাবেক সিইও রাশেদ বিন আমান ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, জালিয়াতি ও কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। একটি মামলায় আদালত রাশেদ বিন আমানকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অজিত চন্দ্র আইচের ব্যাখ্যা:
অজিত চন্দ্র আইচও আইডিআরএকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ২০২০ সালের জুনের পর সোনালী লাইফে তিনি কোন দায়িত্ব ছিলেন না । ১ জুলাই ২০২০ থেকে তিনি আইডিআরএর অনুমোদন নিয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পূর্ণকালীন সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর বক্তব্য, ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি সোনালী লাইফের কোনো ব্যাংক হিসাবে তাঁর অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী বা সিগনেটরি হিসেবে থাকার আইনগত বা যৌক্তিক সুযোগ ছিল না।
ব্যাংক হিসাবে কারা অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী থাকবেন, তা নির্ধারণ ও হালনাগাদ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কোম্পানির। আর ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী সঠিক ব্যক্তি চেকে স্বাক্ষর করেছেন কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব ব্যাংকের -এমনটাই উল্লেখ করেছেন তিনি।
অজিত চন্দ্র আইচ বলেন, তাঁর সিগনেটরি প্যানেলে না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বা কোন পরিস্থিতিতে ওই চেকে তাঁর স্বাক্ষর ব্যবহার বা প্রদর্শিত হলো, তার ব্যাখ্যা সোনালী লাইফ ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষই দিতে পারে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
বীমা ব্যক্তিত্ব অজিত চন্দ্র আইচ দেশের চতুর্থ প্রজন্মের শীর্ষ বীমা কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে প্রতিষ্ঠাকালীন সিইও ছিলেন। ২০১৩ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সাফল্যের সঙ্গে সোনালী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
Posted ০৩:৪০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com