|

Advertisement
×

কৃষি ও পল্লি ঋণে ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬   প্রিন্ট   ৭ বার পঠিত

কৃষি ও পল্লি ঋণে ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য

কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একই অনুষ্ঠানে কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালার ব্যবহার সহজতর এবং নীতি প্রণয়নে তথ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুত করা ওয়েবভিত্তিক ‘এগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস সফটওয়্যার’ উদ্বোধন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, চিফ ইকোনমিস্ট, নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকসহ কৃষি ঋণ বিভাগের কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে পল্লি অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো। কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের জন্য ২০ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ৩৯ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এবার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। কৃষি খাতে ঋণের চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ খাতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৫ একর পর্যন্ত জমিতে লবণ উৎপাদনের জন্য নীতিমালায় বর্ণিত চার্জ ডকুমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো চার্জ ডকুমেন্ট গ্রহণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণে ছাড়পত্রের পরিবর্তে জমির স্বত্ব বা মালিকানা সংক্রান্ত সহজতর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অর্থায়নে বিকল্প জামানত ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত জামানত, সামাজিক জামানত ও দলগত জামানতের মতো ব্যবস্থা রয়েছে।

কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ আরও কার্যকর করতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কমন ফান্ড’ পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালাও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মৎস্য চাষ ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাংকগুলোকে একক বা দলবদ্ধ কৃষক ও খামারির অনুকূলে ঋণ বিতরণে আরও নমনীয় হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় কয়েকটি বিশেষ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনের বিষয়টি কৃষি ও পল্লি ঋণ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক নতুন ও বিকল্প কর্মকাণ্ডেও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রবাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ১০ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন এবং ৩ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সংক্রান্ত নীতিমালা সংযোজনের বিষয়টিও নতুন কর্মসূচিতে রাখা হয়েছে। এসব পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে কৃষি ও পল্লি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি খাতে ব্যাংক ও কৃষক বা গ্রাহকের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মতির ভিত্তিতে গ্রাহককে বীমা সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।

কৃষিভিত্তিক পরিবেশবান্ধব উৎপাদনেও ঋণ সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিশুমূল, অশ্বগন্ধা, মিশ্রি দানা, রোজেলা, মাশরুম, শালবীজ, বেল, বরইয়ের ফল এবং ডিমের খোসা দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের মতো উদ্যোগকে কৃষি ঋণের আওতায় আনার বিষয়টি নীতিমালা ও কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া সারা বছর ধরে কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচুর মতো ফলের বাগান ও ফলনকেন্দ্রিক কৃষি কর্মকাণ্ডে ঋণ বিতরণে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফসল সংগ্রহের পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এতে কৃষকের আয় ও ফসল বিক্রির সময়ের সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সময়কে সামঞ্জস্য করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়নে কৃষি ও পল্লি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই নতুন অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালায় একদিকে যেমন ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতিমালার মাধ্যমে কৃষি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন এই নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নির্ধারিত ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রকৃত কৃষক ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

Facebook Comments Box

Posted ০৬:৩২ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com