নিজস্ব প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ৫১ বার পঠিত
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে দেশের ২৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামী সব ধরনের ব্যাংকই এ তালিকায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ কমেছে ন্যাশনাল ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকে।
তবে ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমে যাওয়াকে ব্যাংক খাতের প্রকৃত উন্নতির সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ খেলাপি ঋণ কমার পেছনে ঋণ আদায় যেমন একটি কারণ হতে পারে, তেমনি ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, অবলোপন কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে খেলাপি ঋণ কমার কারণ বিশ্লেষণ করাও জরুরি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫৭ কোটি টাকা কমেছে। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় ২ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকেও উল্লেখযোগ্য হারে খেলাপি ঋণ কমেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক প্রবণতা। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আবারও বেড়েছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান।
অর্থাৎ, কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকি এখনও অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ কমার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, অনেক ব্যাংক বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত সুবিধার আওতায় অনেক ঋণগ্রহীতা কম অঙ্কের অর্থ জমা দিয়ে পুরোনো খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে যেসব ঋণ আগে খেলাপি হিসেবে গণ্য হতো, সেগুলোর একটি অংশ নিয়মিত ঋণের তালিকায় চলে গেছে। এতে পরিসংখ্যানগতভাবে খেলাপি ঋণ কমে যায়, যদিও প্রকৃত অর্থে অর্থ আদায় সবসময় সমান হারে বাড়ে না।
দ্বিতীয়ত, কিছু ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আদায়-অযোগ্য ঋণ অবলোপন করেছে। অবলোপনের ফলে ওই ঋণ হিসাব থেকে বাদ যায়, কিন্তু ঋণগ্রহীতার দায় শেষ হয়ে যায় না। আইনগতভাবে ব্যাংক সেই অর্থ আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। তবু হিসাবের খাতায় খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমে আসে।
তৃতীয়ত, কিছু ব্যাংক বড় গ্রাহকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ আদায়েও সফল হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক গত এক বছরে আদায় কার্যক্রম জোরদার করেছে, তাদের ক্ষেত্রে বাস্তব আদায়েরও ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ার চেয়ে আরও কয়েকটি সূচক দেখা প্রয়োজন। যেমন প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততা, মুনাফা, নগদ প্রবাহ এবং নতুন করে কত ঋণ খেলাপি হচ্ছে। এসব সূচক ভালো না হলে খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কমলেও ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য খুব বেশি উন্নত হয়েছে বলে ধরা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের পাশাপাশি পুনঃতফসিলকৃত, অবলোপনকৃত এবং আদালতে আটকে থাকা ঋণ মিলিয়ে ব্যাংক খাতের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। ফলে শুধু খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান দেখে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়।
এদিকে খেলাপি ঋণ বেশি হলে ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। কারণ ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে অতিরিক্ত সংরক্ষণ (প্রভিশন) রাখতে হয়। এতে মুনাফা কমে যায় এবং নতুন বিনিয়োগে অর্থায়নের সক্ষমতাও হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে কমাতে হলে শুধু পুনঃতফসিলের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত, দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার, আদালতে ঝুলে থাকা মামলার নিষ্পত্তি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
২৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে যাওয়া একটি ইতিবাচক বার্তা হলেও এটিকে ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটিয়ে ওঠার চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না। বরং এটি একটি আংশিক অগ্রগতি, যার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে প্রকৃত ঋণ আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের ওপর। ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল পরিসংখ্যানের উন্নতি নয়, বরং ঋণের গুণগত মান ও সুশাসনের বাস্তব উন্নয়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
Posted ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com