অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ১৫ বার পঠিত
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের সম্ভাবনা নিয়ে রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মোংলা। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নাব্যতা উন্নয়ন, আধুনিক কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বড় অঙ্কের ঋণচুক্তি, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শন।
পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর শুধু আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে বন্দরের নাব্যতা, সড়ক-রেল-আকাশপথের সংযোগ, কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
মোংলা বন্দরের অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে গত ১০ অক্টোবর চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
এই অর্থায়নের অন্যতম লক্ষ্য বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিচালনব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করা। পাশাপাশি বন্দর চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে চ্যানেলের গভীরতা ও নাব্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ড্রাফটের জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় গভীরতা নিশ্চিত করা গেলে আরও বড় পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারবে। এতে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জাহাজ চলাচল ও পণ্য খালাসের সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে কোনো বন্দরের সরাসরি জাহাজ গ্রহণের সক্ষমতা এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দরের নাব্যতা, জেটি ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে বিদেশি জাহাজের জন্য বন্দরটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বিকল্প সুবিধা তৈরির সুযোগ থাকবে। তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও হিমায়িত চিংড়ির মতো রপ্তানি পণ্যের পরিবহনব্যবস্থা উন্নত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।
তবে মোংলাকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে শুধু বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। পণ্য পরিবহনের খরচ, জাহাজের অপেক্ষার সময়, কাস্টমস কার্যক্রম এবং নিয়মিত যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বন্দরকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে তুলতে বহুমাত্রিক যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা-মোংলা সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, খুলনা-ভাঙ্গা সংযোগ সড়কের উন্নয়ন এবং রেলপথে ওয়াগন ও কনটেইনার ট্রেন চলাচল সম্প্রসারণের বিষয় রয়েছে।
পাশাপাশি খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টিও আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের যাতায়াত সহজ হতে পারে।
সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগের সমন্বিত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, উৎপাদনকেন্দ্র এবং দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক এলাকার সংযোগ আরও কার্যকর হবে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
মোংলা বন্দরসংলগ্ন প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রত্যাশা রয়েছে। বন্দরের কাছাকাছি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কাঁচামাল আমদানি ও তৈরি পণ্য রপ্তানি তুলনামূলক সহজ হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
শিল্পায়নের বিস্তার ঘটলে শুধু বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা নয়, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পণ্য প্রক্রিয়াকরণ, সরবরাহব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সহায়ক সেবায়ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। ফলে খুলনা, বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটি এবং প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তাঁর প্রথম খুলনা সফর।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. সালাহ্ উদ্দিন কবির জানান, পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় নাব্যতা অর্জন এবং সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পরে তিনি প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলও পরিদর্শন করেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, চ্যানেলে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বাড়ানো গেলে অধিক ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে বন্দরের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা ও উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা গেলে মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করবে বলে তিনি আশা করেন।
তাঁর মতে, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। এ জন্য চ্যানেলে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
তাঁর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে এসব উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গতি আসবে।
মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়নের সম্ভাবনা শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে উপকূলীয় অঞ্চলের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রায়ও।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার যেসব মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন, তাঁদের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
তাঁর মতে, পরিকল্পিতভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং মানুষের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
মোংলা বন্দরের সামনে এখন বড় সুযোগের পাশাপাশি বেশ কিছু বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ঋণচুক্তির অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার, সময়মতো অবকাঠামো নির্মাণ, নিয়মিত ড্রেজিং, কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের উন্নয়ন সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
একই সঙ্গে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সুন্দরবনের নিকটবর্তী অঞ্চলে বন্দর ও শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর। পরিকল্পিত উদ্যোগগুলো সফল হলে মোংলা বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
Posted ১১:২২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন