অনলাইন ডেস্ক
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ২২ বার পঠিত
উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের চাপে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে জুলাই ২০২৬-এ বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ২৩ শতাংশের বেশি কমে প্রায় ১৯.৯৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণে। আমদানি বাণিজ্যে ব্যবহৃত বায়ার্স ক্রেডিট, বিলম্বিত আমদানি পরিশোধ এবং অন্যান্য ট্রেড ফ্যাসিলিটিসহ স্বল্পমেয়াদি দায় ৪২.৪৮ শতাংশ কমে ১০.২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালের শুরুর দিকে যেখানে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪.৯২ বিলিয়ন ডলার, জুলাই ২০২৬-এ তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯.৭৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সর্বোচ্চ ২৫.৯৫ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। দুই বছর আগে, অর্থাৎ ২০২০ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৩.২৩ বিলিয়ন ডলার।
ঋণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬৮ শতাংশই ছিল স্বল্পমেয়াদি—যার পরিমাণ ছিল ১৭.৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। চার বছর পর জুলাই ২০২৬-এ মোট বৈদেশিক ঋণ কমে ১৯.৯৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানোর পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের অংশও কমে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ প্রবণতা থেকে ধারণা করা যায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান দায় পরিশোধ করেছে এবং আমদানি ও চলতি মূলধন ব্যবস্থাপনায় বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে।
বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদ সাধারণত SOFR বা Secured Overnight Financing Rate-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ২০২৬-এ SOFR ছিল ৩.৮৭ শতাংশ। অথচ ২০২১ সালে এটি ছিল মাত্র ০.০৫ শতাংশের কাছাকাছি।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার শুরু হলে ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে SOFR বেড়ে ১.৫০ শতাংশে ওঠে। এর সঙ্গে বিদেশি ঋণদাতাদের ক্রেডিট রিস্ক স্প্রেড এবং বিদেশে পাঠানো সুদের ওপর ২০ শতাংশ উইথহোল্ডিং ট্যাক্স যুক্ত হওয়ায় ঋণের প্রকৃত ব্যয় আরও বেড়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (MGI) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, বিদেশি ঋণের ব্যয় এখন অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, “বিদেশি ঋণ এখন খুব ব্যয়বহুল—৭ থেকে ৮ শতাংশ।”
MGI বিভিন্ন উৎস থেকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের বিদেশি ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে চলতি মূলধনের জন্য স্বল্পমেয়াদি ঋণের পাশাপাশি পাঁচ থেকে ১০ বছর মেয়াদি প্রকল্প ঋণও রয়েছে।
মোস্তফা কামালের ভাষায়, ২০২০-২১ সালের তুলনায় বর্তমানে বিদেশি ঋণের খরচ অনেক বেশি। ফলে নতুন বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমেছে।
বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুন।
তার মতে, বৈশ্বিক উচ্চ সুদহার বিদেশি ঋণকে ব্যয়বহুল করেছে। পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ডলারে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে ব্যবসায়ীদের স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। ডলারের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত প্রাপ্যতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের দিকে ঝুঁকেছে।
স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের বড় অংশই আমদানি অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই খাতে ৪২.৪৮ শতাংশ পতনের পেছনে আমদানি কমে যাওয়া বা বিলম্বিত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমদানি পরিশোধ কঠিন বা ব্যয়বহুল হয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা আমদানি কমিয়ে বা পিছিয়ে দিতে পারেন। একই সঙ্গে তারা দেশীয় অর্থায়নের দিকে ঝুঁকতে পারেন কিংবা স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ট্রেড ক্রেডিট এবং অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি দায়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে ঋণ কমার পুরোটা সরাসরি ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ফল নয়; বাণিজ্যিক অর্থায়নের প্রবাহে পরিবর্তনও এর একটি কারণ হতে পারে।
বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়াকে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ও পুনঃঅর্থায়ন ঝুঁকি কমার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এটিকে সরাসরি ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, ঋণ কমার অর্থ হতে পারে ব্যবসাগুলো আগের ঋণ পরিশোধ করছে। তবে এর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ স্থগিত হওয়া, অর্থায়নে কঠোরতা, আমদানি কমে যাওয়া কিংবা উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়ও এতে প্রতিফলিত হতে পারে।
মোট বৈদেশিক ঋণ কমার অর্থ হতে পারে নতুন ঋণের তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হয়েছে। তবে ঠিক কোন কারণে এই পতন ঘটেছে, তা নিশ্চিতভাবে জানতে নতুন ঋণ গ্রহণ, ঋণ পরিশোধ, ট্রেড ক্রেডিট এবং বিনিয়োগের বিস্তারিত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের কাঠামোতে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—স্বল্পমেয়াদি ও তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমছে, আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্ব বাড়ছে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু আর্থিক কৌশল নয়, উচ্চ সুদহার, ডলারের সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্থরতার প্রভাবও রয়েছে।
Posted ১১:২১ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com