|

Advertisement
×

প্রণোদনা আছে, ঋণ পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৩৮ বার পঠিত

প্রণোদনা আছে, ঋণ পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা

৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ, বিতরণ ১২ হাজার কোটি

সংকটে থাকা ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, বন্ধ কারখানা চালু করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল গত মে মাসে। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও সেই অর্থ বিতরণে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই প্যাকেজ থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আরও আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া চলছিল।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে নেওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে এখনো কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি। এমনকি কর্মহীন তরুণদের লক্ষ্য করে নেওয়া উদ্যোগও ঋণ বিতরণের মুখ দেখেনি।

অর্থাৎ, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সব খাতে তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না।

কোথায় কত টাকা বিতরণ?

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্যাকেজের আওতায় দুটি তহবিল রয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর অর্থ দিয়ে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে, যার বিপরীতে রয়েছে সরকারের নিশ্চয়তা।

কর্মসূচিভেদে ঋণ বিতরণের চিত্রে বড় পার্থক্য দেখা গেছে।

রপ্তানি প্রাক্‌-জাহাজীকরণ ঋণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দের তুলনায় বেশি অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। ৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি।

কুটির ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশেষ কর্মসূচিতে ৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৫০ শতাংশ।

অন্যদিকে, ক্ষুদ্র, কুটির, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৯০৮ কোটি টাকা।

সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য নেওয়া কর্মসূচিতে বরাদ্দ করা ৫০০ কোটি টাকার পুরোটাই বিতরণ করা হয়েছে।

বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ঋণ কর্মসূচিতে ১ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ২০০ কোটি টাকা।

কৃষি ও গ্রামীণ খাতে ঋণ বিতরণে ধীরগতি

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সহায়তা করার জন্য নেওয়া কর্মসূচিতেও ঋণ বিতরণের গতি খুবই কম।

কৃষি ও গ্রামীণ খাদ্যনিরাপত্তা পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩ শতাংশ অর্থ উদ্যোক্তা ও ঋণগ্রহীতাদের কাছে পৌঁছেছে।

উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার কর্মসূচিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ৪৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে ঋণ বিতরণ শুরুই হয়নি।

ফলে প্যাকেজের সামগ্রিক অগ্রগতি থাকলেও যেসব খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেসব ক্ষেত্রে অর্থের প্রবাহ এখনো সীমিত।

ঋণ বিতরণে সময় লাগছে কেন?

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, সাধারণ ঋণ বিতরণ করতেই দুই থেকে চার মাসের বেশি সময় লেগে যায়। সে ক্ষেত্রে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা কিংবা সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও জটিল।

তিনি বলেন, ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংককে আবেদন যাচাই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা এবং একাধিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এই প্যাকেজের আওতায় বন্ধ কারখানাগুলোকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।

এ ছাড়া ঋণ বিতরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত বিভিন্ন শর্তও রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, অর্থ পাচারে জড়িত নন—এমন উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার শর্ত রয়েছে। কিন্তু কোনো আবেদনকারী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া ব্যাংকের জন্য সব সময় সহজ নয়।

আরেকটি সমস্যা হলো, ঋণ পেতে উদ্যোক্তাদের নিজে থেকে আবেদন করতে হয়। কিন্তু অনেকেই আবেদন করছেন না। গ্যাস সংকটসহ ব্যবসা পরিচালনার নানা সমস্যাও নতুন করে বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণগ্রহীতা ভবিষ্যতে সেই অর্থ ফেরত দিতে পারবেন কি না, তা নিশ্চিত করা।

ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে ঋণ বিতরণ শুরু করেছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়তে পারে বলে তিনি আশা করছেন।

অর্থ ছাড় হলেই কি বিনিয়োগ বাড়বে?

৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজের উদ্দেশ্য শুধু সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেওয়া নয়। এর মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালু করা, নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু অর্থ বিতরণের পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ পেয়ে কোনো কারখানা আবার চালু হলো কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলো কি না এবং উৎপাদন বাড়ল কি না—এসব ফলাফল দিয়েই কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে।

বিশেষ করে যেসব খাতে এখনো ঋণ বিতরণ হয়নি, সেসব কর্মসূচিতে বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকৃত উদ্যোক্তারা যাতে সহজে আবেদন করতে পারেন এবং ব্যাংকগুলো যাতে ঝুঁকি যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে বিনিয়োগের দুর্বলতা, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তা সহায়ক হতে পারে।

তবে বরাদ্দের অর্থ দ্রুত বিতরণ করাই শেষ কথা নয়। সেই অর্থ যেন প্রকৃত সংকটাপন্ন কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে—এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত এই প্যাকেজের সাফল্য নির্ভর করবে কত টাকা বিতরণ হলো, শুধু তার ওপর নয়; বরং কতটি কারখানা চালু হলো, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো এবং অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ কতটা বাড়ল, তার ওপর।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০২:৩৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com