নিজস্ব প্রতিবেদক
রবিবার, ১৮ মে ২০২৫ প্রিন্ট ২৬৩৫ বার পঠিত
দেশের বেসরকারি খাতের উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড রুগ্ন হয়ে পড়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা দেশের বাইরে অবস্থান করায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছাড়াই চলছে ব্যাংকটির কার্যক্রম। এরই মধ্যে গত ১২ মে কোম্পানির ৪২তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেয়ারহোল্ডারদের বিভিন্ন প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক অডিট কমিটির চেয়ারম্যান প্রফেসর ইকবাল আহমেদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী সম্পদ ও লোকবল কমলেও ব্যয় বেড়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০২৪ সালে পেইড-আপ ক্যাপিটাল বেড়ে হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা যা আগের বছরে ছিল ৭৪৬ কোটি টাকা। আগের বছরে বিনিয়োগ ছিল ৩৭৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা যেখানে এ বছরে কমে হয়েছে ২৬৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় ব্যাংকটির সরকারের কাছে কর পরিশোধও কমেছে। গত অর্থবছরে অগ্রিম কর হিসাবে ১০৫৯ কোটি ৭৮ লাখ দেয় যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২৭ কোটি টাকা কম। যদিও অন্যান্য ব্যাংক থেকে তাদের ধারের পরিমাণ কমেছে কিন্তু তা স্থিতিশীল সীমা থেকে এখনো অনেক দূরে। অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তারা ২০২ কোটি ১৪ লাখ টাকা ধার নেয়। উত্তরা ব্যাংকের অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৩৪৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা কমেছে। ২০২৩ সালে ব্যাংকটির অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৭৯৪ কোটি ২২ লাখ টাকা যা ২০২৪ সালের অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৪৪৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকায়। শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বাড়লেও তা কীভাবে বেড়েছে তার পরিষ্কার কোন তথ্য রিপোর্টে পাওয়া যায়নি। ২০২৩ সালে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৯১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং ২০২৪ সালে যা ১০৬১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উত্তরা ব্যাংক পিএলসি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সমাপ্ত হিসাববছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়। এর মধ্যে সাড়ে ১৭ শতাংশ নগদ এবং বাকি সাড়ে ১৭ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ। পুঁজিবাজার খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকটি নগদ লভ্যাংশ বেশি দিলে বাজারে অর্থের তারল্য থাকতো যা বাজার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ত এবং ব্যাংকটি ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিমুক্ত থাকত। ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুসারে, সর্বশেষ বছরে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয়সহ সমন্বিতভাবে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৫ টাকা ৭৭ পয়সা, আগের বছর যা ছিল ৩ টাকা ৮৪ পয়সা। এছাড়া ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সমাপ্ত বছরে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ৩২ টাকা ৭ পয়সা। বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যাংকের পুঁজিভিত্তি শক্তিশালী করতে এই লভ্যাংশ দেওয়া হবে। যে মুনাফা পাওয়া যায়নি, তার ভিত্তিতে এই লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি।
২০২৩ সালের জন্য বিনিয়োগকারীদের ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে উত্তরা ব্যাংক। এর মধ্যে সাড়ে ১৭ শতাংশ নগদ ও সাড়ে ১২ শতাংশ স্টক বা বোনাস লভ্যাংশ। এ ছাড়া ২০২২ সালে ১৪ শতাংশ নগদ ও ১৪ শতাংশ বোনাস; ২০২১ সালে ১৪ শতাংশ নগদ ও ১৪ শতাংশ বোনাস; ২০২০ সালে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ ও সমপরিমাণ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড।
ব্যাংকের শাখা ও বেতন বাবদ খরচ বাড়লেও মোট কর্মী সংখ্যা কমেছে। ২০২২ সালে ব্যাংকটির মোট কর্মী ছিল ৪ হাজার ৩ জন, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯শ ৫৮জন এবং ২০২৪ সালে কমে হয় ৩ হাজার ৯শ ২৭ জন কিন্তু গতবছরের তুলনায় বেতন বাবদ খরচ বেড়েছে ৪৯০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, ২০২৩ সালে যা ছিল ৪৬৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এই এক বছরে শুধু মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ব্যবস্থপনা পরিচালক) বেতনবাবদ খরচই বেড়েছে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং পরিচালকদের ফি বাবদ খরচ বেড়েছে ৮৪ লক্ষ টাকা যা অস্বাভাবিক।
অন্যান্য খরচের মধ্যে স্টেশনারি ও প্রিন্ট বাবদ খরচ ছিল ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা যা গতবছরে ছিল ১৬ কোটি ৭ লাখ টাকা। আইনগত খরচও বেড়েছে এ বছর। গত বছরে যে খরচ ছিল ৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা তা এবছরে বেড়ে হয়েছে ৫ কোটি ২ লাখ টাকা। আনুষাঙ্গিক খরচবাবদ এ অর্থবছরে মোট ৪৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, যা গতবছরের তুলনায় ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বেশি।
প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরের বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনার একটি চিত্র পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় ৯ বছরে আমানত বেড়েছে মাত্র ৮৭৮৫ কোটি টাকা বা ৬৫%। প্রতি বছর গড়ে মাত্র ৭.২%। গত ৪ বছরে বেড়েছে মাত্র ২৭৮৪ কোটি টাকা বা ১৪.৩%, প্রতি বছর গড়ে মাত্র ৩.৬%। ঋণ ও অগ্রিম-এর ক্ষেত্রে ৯ বছরে বেড়েছে ১০৪৮৫ কোটি টাকা বা ১২৪%। প্রতি বছর গড়ে মাত্র ১৩.৮%। গত ৪ বছরে বেড়েছে মাত্র ৪০১৪ কোটি টাকা বা ২৬.৯%, প্রতি বছর গড়ে মাত্র ৬.৭%।
শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি’র ক্ষেত্রে গত ৯ বছরে বেড়েছে মাত্র ১৩১৩ কোটি টাকা বা ৯৮.৪ %। প্রতিবছর গড়ে মাত্র ১০.৯%। গত ৪ বছরে বেড়েছে মাত্র ৮০৬ কোটি টাকা বা ৪৩.৮%। প্রতি বছর গড়ে মাত্র ১০.৯%। ২০২৪ সালে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে উচ্চ মূল্যে আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেভিংস ডিপোজিট বেড়েছে ৩১২ কোটি টাকা বা ৩.২২% কিন্তু এর বিপরীতে ব্যয় বেড়েছে ৫১ কোটি টাকা বা ৩৭.৫% যা অস্বাভাবিক বেশী, সামঞ্জস্যহীন ও ভবিষ্যৎ এর জন্যে অবহনযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বিগত ৪ বছরের ঘচখ ও ৎিরঃঃবহ ড়ভভ পর্যালোচনা করে দেখা যায় ঘচখ ও ৎিরঃঃবহ ড়ভভ মিলিয়ে ২৯২৯ কোটি টাকা, যা বিগত ৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্য। ২৯২৯ কোটি ঋণ ও অগ্রিম ১৮৯১২ কোটি টাকার ১৩.৫% যা উদ্বেগজনক।
২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে আমানত-এর প্রবৃদ্ধি ৮৭৮৫ কোটি টাকা, ঋণ ও অগ্রিমে প্রবৃদ্ধি ১০৪৮৫ কোটি টাকা, শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটি ১৩১৩ কোটি টাকা, এক্সপোট-এ ৩৬৩৮ কোটি টাকা, ইমপোর্টে ১০০৩ কোটি টাকা এবং মোট সম্পদের ক্ষেত্রে ১১৮৬৩ কোটি টাকা প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
উত্তরা ব্যাংক ৪২৬ কোটি টাকা ৎিরঃঃবহ ড়ভভ করার পরও শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৯১ কোটি টাকা থেকে ৭০ কোটি টাকা বা ৭.১% বেড়ে হয়েছে ১০৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাব স্ট্যান্ডার্ড ১৮৮ কোটি টাকা থেকে ১৫৫ কোটি টাকা বা ৮২% বেড়ে হয়েছে ৩৪৩ কোটি টাকা।
বিগত ৪ বছরের মধ্যে সাব স্ট্যান্ডার্ড সর্বোচ্চ যা প্রশ্নবোধক এবং এর সন্তোষজনক কোন ব্যাখ্যাও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি।
বিগত ৪ বছরের জনসম্পদ ও তাদের বেতনভাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শেষ দুই বছরে কর্মী কমেছে ৭৬ জন কিন্তু খরচ বেড়েছে ২৯ কোটি টাকা। ৫ বছরে রেমিট্যান্সের অনুপাত অস্বাভাবিক কমে যাওয়ার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ দেখায়নি উত্তরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ঋউজ বেড়েছে ৪৪৬ কোটি টাকা বা ৬.৫% যা মোট ডিপোজিট এর ৩২.৮% কিন্তু এর বিপরীতে ব্যয় বেড়েছে ৯৬ কোটি টাকা বা ২৫.৯% যেটা মোট ব্যয়ের ৫৬.২% যা অস্বাভাবিক বেশি এবং সামঞ্জস্যহীন ও ভবিষ্যতের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মার্চ ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ১.৮২ কোটি টাকা, খেলাপির হার ১১.১১%। কিন্তু মাত্র ৭ মাস পর খেলাপি ঋণ ৯০% বেড়ে হয়েছে ৩.৪৫ কোটি টাকা, খেলাপির হার ২০.২০%।
সুতরাং ইন্টারেস্ট /প্রফিট আয়ের এই উচ্চলম্ফন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রজ্ঞার ঘাটতি বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ঝুঁকি বহন করছে। ২০২৪ সালে উত্তরা ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম ৩১৬ কোটি টাকা থেকে ৫৬ কোটি টাকা বা ১৭.৭% বেড়ে হয়েছে ৩৭২ কোটি টাকা।
ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে উত্তরা ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি সম্পদ (ঘঅঠচঝ) ৩২.০৭ টাকা। অথচ গত ৮ মে কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের বাজার মূল্য ছিল ১৯.১০ টাকা। যা শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্যের (৪০.৪%) কম। অনুমান করা যায় ব্যাংকটি আস্থার সংকটে ভুগছে যা সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের জন্যে ক্ষতিকর।
এ বিষয়ে উত্তরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা এম আমিনুল ইসলাম বলেন, যেহেতু ব্যবস্থপনা পরিচালক মাকুসুদুল হাসানসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ দেশের বাহিরে অবস্থান করছেন তাই এ মুহূর্তে কোন বক্তব্য প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।
Posted ০৮:৩৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৮ মে ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com