সোমবার ৮ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x
সাক্ষাৎকার: ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী, অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫   প্রিন্ট   ৬৭৪ বার পঠিত

অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেছেন, ‘চলতি অর্থবছরের বাজেটে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিগত তিন বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। তাদের সামনে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় যেসব চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে তার মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে এনে জনগণকে স্বস্তি দেয়াটা অন্যতম।’

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান একটি অর্থনীতিতে সাধারণভাবে ৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় বা স্বাভাবিক বলে মনে করা যেতে পারে। কিন্তু গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এ বছর (২০২৫) বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক খাদ্য মূল্যস্ফীতির লাল তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি (৯ দশমিক ২ শতাংশ)।’ দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন এম এ খালেক। সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো:

 

ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: দীর্ঘ মেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ এবং কিভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন?

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী: আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনীতিতে ৫শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি সহনীয় বলে মনে করা যেতে পারে। কিন্তু গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির গড় হার সাড়ে ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। মাঝে দু’একবার মূল্যস্ফীতির হতার কিছুটা কমলেও আবারো তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সব শ্রেণি পেশার মানুষ সমস্যার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষগুলোর জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে, আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে? উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কি কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তারা যে অর্থ আয় করছেন তা দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না। বলতে গেলে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। একজন শ্রমিক কাজ করে বছরে যে পরিমাণ মজুরি পান অথবা একজন চাকরিজীবীর বেতন বছরে যে পরিমাণে বৃদ্ধি পায় তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে তারা পরিবারের চাহিদাকৃত পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে পারছেন না। তাকে বাধ্য হয়েই কম পরিমাণ পণ্য ক্রয় করতে হচ্ছে। সার্বিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণের জায়গাটাকে সঙ্কুচিত করে। এখন প্রশ্ন হলো, এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রকৃত কারণ কি?
বাংলাদেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে কোভিড-১৯। কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। সেই ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে তুলে। কোভিড-১৯ এর কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এই সময় সার্বিকভাবে উৎপাদন কমে যায় এবং সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যাবার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। সেই সময় সাপ্লাই সংকুচিত হয়ে যাবার কারণে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন কোভিড-১৯ এর অভিঘাত থেকে ধীরে ধীরে উত্তরণের পথে ছিল ঠিক সেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আমরা যেহেতু বিশ্বায়নের যুগে বাস করছি তাই কোনো দেশ বা অঞ্চলে সমস্যার সৃষ্টি হলে অনিবার্যভাবে তার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির উপরও পড়ে। এই সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আঘাত আসে। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধাক্কা আসে। কোভিড-১৯ এর আঘাত মোকাবিলা করে যখন আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমে আসছিল ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মূল্যস্ফীতিকে আবারো উস্কে দেয়। কোভিড-১৯ থেকে উত্তরণের সময় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই সময় আমদানি ব্যয় ৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় আমদানির পরিমাণ থাকে ৫৮ থেকে ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে আমাদের রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সেই বৃদ্ধির হার আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম ছিল। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সেটা ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে। আমদানি-রপ্তানি আয়ের মধ্যে সৃষ্ট ব্যবধান বৃদ্ধি, আর্থিক হিসাবে ব্যাপক ঘাটতি এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমে যাবার কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। অভ্যন্তরীণ বাজারে মার্কিন ডলারের চাহিদা এবং বিনিময় হার বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস পায়। ফলে একই পণ্য আমদানির জন্য আগে স্থানীয় মুদ্রায় যে অর্থ ব্যয় হতো এখন তার চেয়ে বেশি ব্যয় হবে। কোভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সম্মিলিতভাবে আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের প্রাইস লেভেল বা মূল্যস্তর বৃদ্ধি পায়।

ব্যাংক বীমা অর্থনীতি : কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে কিন্তু আগের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ কি?

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী: অভ্যন্তরীণ বাজারে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি যতটা সামলে আনার কথা ছিল তা আমরা পারছি না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে চলেছে। গত কয়েকটি বাজেট যদি পর্যালোচনা করেন তাহলে দেখা যাবে, কোভিড-১৯ পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু সেই বৃদ্ধিটা কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় বাজেটে প্রতিবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ করা হয় তা অর্জিত হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি যা অর্জিত হচ্ছে তার বাস্তবতা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ করে তা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রদর্শিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে এক অথবা দেড় শতাংশ কম। তাহলে আমরা কার পরিসংখ্যান বিশ্বাস করবো? আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা যতটা মনে করি বাস্তব অবস্থায় তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় না। অর্থাৎ, অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থাকে কিছুটা ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখনোর একটি প্রবণতা সব সময়ই প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। এই কারণেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্খিত পর্যায়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

কোভিড-১৯ এর সময় দেশের মানুষ ভোগ ব্যয় যতটা কমিয়ে দিয়েছিল পরবর্তীতে সেই অবস্থা ধরে রাখা যায়নি। অর্থাৎ মানুষ তাদের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি করে। এটাই উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে একটি কারণ হিসেবে কাজ করেছে। কোভিড-১৯ চলাকালে আমাদের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু পরবর্তীতে অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে থাকলে চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই প্রবণতাও মূল্যস্ফীতিবাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ চাহিদা বৃদ্ধি জনিত কারণটিও মূল্যস্ফীতির উপর প্রভাব ফেলে।

ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: কোভিড-১৯ চলাকালে জ¦ালানি তেলের মূল্য ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। এটা কি মূল্যস্ফীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে?

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী: কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিগত সরকার মাত্র এক রাতের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের মূল্য ৪২ শতাংশের মতো বৃদ্ধি করে। এটাও উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেয়। জ্বালানি তেলের মূল্য এভাবে রাতারাতি বৃদ্ধি না করে ধীরে ধীরে বাড়লে তা মূল্যস্ফীতির এতটা বিরূপ প্রভাব ফেলতো না। মূল্য বৃদ্ধির সময় বলা হয়েছিল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পেলে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হবে। কিন্তু সেই অঙ্গিকার রক্ষিত হয়নি। কিছু দিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ৬৪ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে। কিন্তু তারপরও অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো হয়নি। জ্বালানি তেল এমনই এক উৎপাদন উপকরণ যা ছাড়া কোনো উৎপাদন কার্য সম্পাদিত হতে পারে না। অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টিতে জ্বালানি তেল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জ্বালানি তেলের মূল্য একবারে এতটা বৃদ্ধির কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে তা সঠিকভাবে কাজ করছে না। অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ দিন বিরাজমান থাকার পেছনে আমাদের নীতি নিধারকদের ভুল সিদ্ধান্তও অনেকাংশে দায়ি।প্রতি বছর যে হারে মূল্যস্ফীতি ঘটে মজুরি বৃদ্ধির পরিমাণ যদি তার চেয়ে বেশি হয় তাহলে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য খুব একটা দুর্ভোগ সৃষ্টি করতে পারে না। এই অবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রার মান তেমন একটা কমে না বরং কিছুটা বেড়েছে।

বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা সৃষ্টি হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়। সেই সময় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) বেশ কয়েকবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। এতে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমে যায়। পাশাপাশি আরো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল্যস্ফীতি কমিযে আনতে সমর্থ হয়। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও পলিসি রেট একাধিকবার বৃদ্ধি করেছে। আগে পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ । এখন তা ১০শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজার ভিত্তিক না করে কিছুদিন আগ পর্যন্তও সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে পড়ে। এতে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে যায়,যা প্রকারান্তরে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেয়।

ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কি?

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে বলে অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখনো কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণটি দায়ি তা হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার এখনো অস্থিতিশীল রয়েছে। ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা হলেও নির্ধারণ করা হলেও কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলার আরো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, মধ্যবর্তী পণ্য এবং ফিনিশড গুডস আমদানি করতে হয়। যদি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি পায় তাহলে স্থানীয় মুদ্রায় এসব পণ্য আমদানি ব্যয় বাড়বে। সে ক্ষেত্রে উৎপাদন কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে এবং তার অনিবার্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে অভ্যন্তরীণ বাজারেপণ্য মূল্য বৃদ্ধি পাবে। কাজেই এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কাজ হবে যে কোনো ভাবেই হোক স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়ন রোধ করা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা। বর্তমানে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল মনে হলেও এই অবস্থা কত দিন থাকবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকবে জনগণের মাঝে এমন একটি ধারনার সৃষ্টি করতে হবে।

অভ্যন্তরীণভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচন মূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু আগামীতে তারা এই নীতি ধরে রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর কিছুদিন আগে বলেছেন, আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। এর মধ্যে অন্তত ১০টি দেউলিয়া হবার পর্যায়ে রয়েছে। এই সমস্যাগ্রস্থ ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য অন্তঃব্যাংক ঋণদানের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তা কতটা কার্যকর হবে এটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদি এই উদ্যোগ সফল না হয় তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার দায় নিতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে গ্যারান্টি দিয়েছে। তাই সেই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন করে টাকা ছেপে পরিস্থিতি সামাল দিতে হতে পারে। এটা হবে সরকারের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিত এবং এতে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যেতে পারে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হয় রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে। বর্তমান অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার পুরোটাই সরকারকে ঋণের মাধ্যমে সংকুলান করতে হবে। এই ঋণ বিদেশ থেকেও আসাতে পারে। আবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগৃহীত হতে পারে। যদি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অর্থ যোগান দেয়া না যায় তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন করে টাকা ছেপে সরকারকে অর্থের যোগান দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাকের বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন মানুষ। তিনি অর্থনীতি ভালো বুঝেন। যে কারণে তিনি বলেছেন, নতুন করে টাকা ছাপানো হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই অঙ্গিকার রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারটাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা রোধ করতে হবে। প্রক্ষেপিত প্রবৃদ্ধি যদি অর্জিত না হয় তাহলে তা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয়। কাজেই প্রবৃদ্ধির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা যাতে অর্জিত হয় সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশতো অনেক দিন ধরেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলতে আমরা আসলে কি বুঝবো?

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী: কোনো একটা দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হিসাবায়নে জনমিতির একটি লভ্যাংশের কথা বিবেচনা করা হয়। একটি দেশের জনসংখ্যা যদি বয়স কাঠামোর বিবেচনায় প্রবৃদ্ধি সহায়ক ভূমিকা পালন করে তাহলে সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা যেতে পারে। কোনো দেশের জনসংখ্যাকে সাধারণত দু’টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কর্মক্ষম জনসংখ্যা এবং অন্যটি হচ্ছে নির্ভরশীল জনসংখ্যা। কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার বা সংখ্যা যদি নির্ভরশীল জনসংখ্যার চেয়ে বেশি হয় তাহলে সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা যেতে পারে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার যদি মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি হয় তাহলে সেটাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা।

বিশ্বব্যাপীই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে একটি দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য আশির্বাদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারো কারো মতে, একটি দেশে একবারই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সৃষ্টি হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন একটি দেশে হাজার বছরে একবার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সৃষ্টি হয়। যেসব দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল ভালোভাবে এবং পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগাতে পারে তারাই উন্নতির শীর্ষে আরোহন করতে পারে। বর্তমানে বিশ্বে যেসব দেশকে আমরা উন্নত দেশ হিসেবে জানি তারা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে বলেই তারা উন্নতির শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে, যেসব দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে তারা কাঙ্খিত মাত্রায় উন্নয়ন অর্জন করতে পারেনি। কাজেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সৃষ্টি হলেই একটি দেশ উন্নয়নের শিখরে আরোহন করতে পারবে সব সময় তা নাও হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে আমরা কি দেখতে পাই? স্বাধীনতার পর অর্থাৎ, ১৯৭২ সালে দেশের টোটাল ফার্টিলিটি রেইট ছিল গড়ে ৬ দশমিক ৭ পয়েন্ট। অর্থাৎ প্রতিটি মহিলা তার সন্তান ধারন ক্ষমতাকালে গড়ে ৭টি করে সন্তান জন্ম দিতো। বর্তমানে তা গড়ে দুইয়ের নিচে চলে এসেছে। অর্থাৎ প্রতিটি মহিলা এখন গড়ে ২টি করে সন্তান জন্ম দিচ্ছে। এখন টোটাল ফার্টিলিটি রেইট ১ দশমিক ৯ পয়েন্ট। একটি শিশু জন্ম গ্রহণ করলেই তো আর কর্মক্ষম হয় না। কর্মক্ষম হবার জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আবার নির্ভরশীল জনসংখ্যা বাড়ার জন্যও একটি সময়ের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছে আরো এক দশক আগে অর্থাৎ ২০১২ সালে। ২০৪০ সালে গিয়ে আমাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে। তবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা শেষ হবে ২০৫০ সালে।
অর্থনীতির পরিভাষায় কর্মক্ষম জনসংখ্যা বলতে ১৫ বছর থেকে ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত জনসংখ্যাকে বুঝায়। কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি হলেই তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশই এখন কর্মক্ষম। এই কর্মক্ষম বিশাল জনসংখ্যাকে আমরা যদি শিক্ষা,প্রশিক্ষণ,স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যায় তাহলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল কাজে লাগানো সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ জনসংখ্যা একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জনসম্পদ তখন মানব পুঁজি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার জনসংখ্যা যদি অপ্রশিক্ষিত এবং অদক্ষ হয়ে গড়ে উঠে তাহলে তা একটি জাতির জন্য ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হয়। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। নির্ভরশীল জনসংখ্যার আবার দু’টি ভাগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে নিচের দিকের আর একটি উপরের দিকের। নিচের দিকে নির্ভরশীল যে জনসংখ্যা থাকে তারা এক সময় পরিণত বয়সে পদার্পন করে এবং কর্মক্ষম হয়। কিন্তু উপরের দিকে নির্ভরশীল যে জনসংখ্যা থাকে তারা ক্রমশ আরো অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নিচের যে নির্ভরশীল জনসংখ্যা তা হচ্ছে যাদের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত। আর উপরের দিকের নির্ভরশীল জনস্যংখ্য হচ্ছে ৬৫ বছর থেকে তার বেশি বয়সী মানুষগুলো। আমাদের যে ৬৮ শতাংশ কর্মক্ষম জনসংখ্যা আছে তাদের হিউম্যান ক্যাপিটালে পরিণত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যদি আমি ডিভিডেন্ড নিতে চাই।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন অর্জনের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সৃষ্টি হয়। জাপান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধাকে পরিকল্পিতভাবে তাদের উন্নয়নের ব্যবহার করতে পেরেছে। একই ভাবে চীন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছে। যে কারণে চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে গেছে। কয়েক বছর আগে চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪৪ বছর ধরে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থানকারি জাপানকে সরিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসতে সমর্থ্য হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন বা মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চীন অত্যন্ত সফলতা প্রদর্শন করে চলেছে। জাপানে এখন প্রবীণ নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জাপানের প্রবৃদ্ধি এখন আগের তুলনায় মন্থর হয়ে পড়ছে। নিকট প্রতিবেশি দেশ ভারতও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হচ্ছে।

একটি দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যখন নির্ভরশীল মানুষের চেয়ে বেশি হয় তখন সংশ্লিষ্ট দেশটি শ্রমশক্তির যোগান নিশ্চিত করতে পারে। শ্রমের যোগান বেশি থাকলে সেখানে তুলনামূলক কম মূল্যে শ্রম ক্রয় করা যায়। এতে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায়। তুলনামূলক ব্যয় তত্ত্ব বিবেচনায় নিলে বলা যায় বাংলাদেশ এখন নিশ্চিতভাবেই পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে কম মজুরিতে শ্রম শক্তির যোগান দিতে পারছে। তুলনামূলক কম মজুরিতে শ্রম শক্তির যোগান নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের সুযোগ তৈরি করে। শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলকভাবে কম হলে আমরা বাইরের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবো। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা রপ্তানিভিত্তিক পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে অধিকতর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। নানা চ্যালেঞ্জ সত্বেও আমাদের তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে তার অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে এই খাতের তুলনামূলকভাবে সস্তা শ্রমশক্তির নিশ্চিত যোগান। এটা সম্ভব হচ্ছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কারণেই।

ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল ধরে রাখার জন্য আমাদের কি করা প্রয়োজন ছিল?

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী: মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশই যখন কর্মক্ষম তাদের যদি উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তা দেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বিরাট সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মক্ষম প্রতিটি মানুষের জন্য আনুষ্ঠানিক খাত অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রীয় ভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একটি দেশ যদি প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত মাত্রায় এগিয়ে যায় তখন সেই দেশটির জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যখন ভূমিকা রাখে তখন সেই দেশটি প্রতিটি সূচকে এগিয়ে যেতে থাকে। প্রবৃদ্ধি যখন উচ্চ মাত্রায় হতে থাকে তখন সেই দেশটির জনগণের আয় বৃদ্ধি পায়, সঞ্চয়ের সামর্থ্য বাড়ে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঞ্চয় বৃদ্ধির নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশ যদি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নত দেশে পরিণত হতে চায় তাহলে মোট জিডিপি’র ৩৪ থেকে ৩৬ শতাংশ সঞ্চয় করতে হবে। বর্তমানে দেশের সঞ্চয়ের হার হচ্ছে জিডিপি’র ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুবিধা নিতে হলে আমাদের প্রথমেই জনসংখ্যাকে জনশক্তিকে পরিণত করতে হবে। জনসংখ্যাকে প্রবৃদ্ধি সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রবৃদ্ধি এবং সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধি হলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। অর্থাৎ আমরা প্রবৃদ্ধিকে দু’দিক থেকে সহায়ক ভূমিকা পালন করাতে পারি। একটি হচ্ছে,সঞ্চয় বৃদ্ধি করে বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা এবং অন্যটি হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষের জন্য উপযুক্ত কাজের ব্যবস্থা করে উৎপাদনের সহায়ক অবদান রাখা।

এখন প্রশ্ন হলো, তুলনামূলক খরচ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য দিক বিবেচনা করে আমরা কি শুধু অর্থনৈতক উন্নয়ন অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে? নাকি অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই ভাবে উন্নয়নের জন্য চেষ্টা চালাতে হবে? ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে একটি দেশ যখন উন্নয়ন অর্জন করতে থাকে তখন সংশ্লিষ্ট দেশটির অর্থনীতি বড় হতে থাকে। বাজেট বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন বাজেটের মাধ্যমে সামাজিক খাতের উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে পারে। সামাজিক খাত বলতে এখানে স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষাখাত, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা এসব কাজকে বুঝানো হয়েছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা বড় ধরনের অবদান রাখতে পারি।

সবার জন্য উপযুক্ততা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কার জন্য কোন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজন আছে, কাকে দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন, কাকে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেবেন এসব নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কর্মক্ষম হলেই সবাই একই রকমের কাজ করতে পারবে না। কাজের ধরন অনুযায়ী কর্মক্ষম মানুষের শ্রেণি বিভাজন করে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য যদি তার যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় তাহলে তা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে। কর্মক্ষম মানুষের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য রাষ্ট্রীয় বাজেটে আলাদা ব্যয় বরাদ্দ থাকতে হবে। অর্থাৎ নীতি,কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রের বাজেট এই তিনটির সমন্বয় করে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যে শ্রম সম্পদ উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না এবং কর্মক্ষম যেসব মানুষ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। কর্মক্ষম কিন্তু অব্যবহৃত শ্রম সম্পদ একটি দেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে থাকে। স্থানীয়ভাবে কি কি কর্মক্ষেত্র রয়েছে সেখানে উপযুক্ত কর্মীর যোগান নিশ্চিত করার জন্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। কোন্ সেক্টরে কত সংখ্যক এবং কি ধরনের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী কর্মী যোগানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেক্টর অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবল যাতে সরবরাহ করা যায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশে কারিগড়ি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল তুলনামূলকভাবে কম। এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী শ্রমের গুরুত্ব কতটা বলে মনে করেন?

ড. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী: আমরা বাংলাদেশকে যদি কার্যকর এবং টেকসই উন্নয়নের পথে ধাবিত করতে চাই তাহলে নারী শ্রমশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। বাংলাদেশের লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন প্রত্যক্ষ করি তাহলে দেখবো, মোট শ্রম শক্তিতে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ হচ্ছে ৮০ শতাংশ। আর নারী শ্রম শক্তির অংশগ্রহণ হচ্ছে ৪৩ শতাংশ। পুরুষদের লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশনের তুলনায় নারীদের পার্টিসিপেশন হচ্ছে অর্ধেক। শ্রম শক্তিতে নারীদের অংশ গ্রহণ যদি ৮০ শতাংশে উন্নীত করা যায় তাহলে তা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। নারীরা যখন আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ করবে তখন নারী-পুরুষের সমতা বিধান এবং নারীর ক্ষমতায়নে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে। নারী কর্মীদের ৯৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত আছেন। বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতকে কিভাবে আনুষ্ঠানিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।বাংলাদেশকে যদি আমরা উন্নত দেশে পরিণত করতে চাই তাহলে অনানুষ্ঠানিক খাতের একটি বড় অংশকেই আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশে যারা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন তাদের সম্ভবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। কিন্তু তারা নানা সামাজিক প্রতিকূলতার জন্য সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারছেন না। বিশেষ করে তারা পুঁজি স্বল্পতায় ভোগেন। কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে খুব একটা আগ্রহ প্রদর্শন করে না। এই সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ করা একান্ত প্রয়োজন। নারীরা যাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের চাহিদা মতো ঋণ সহায়তা পেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ করা যায়। বর্তমানে চতুর্থ শিল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। নারীরা টেকনোলজিতে পিছিয়ে থাকার কারণে তারা ক্রমশ কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নারীদের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে।

Facebook Comments Box

Posted ০৬:৪৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com