নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ প্রিন্ট ২১১ বার পঠিত
বাংলাদেশে টেকসই ও কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে হলে মৌলিক ব্যবসায়িক ও আর্থিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, বন্ড মার্কেট কেবল নীতিগত সংস্কার দিয়ে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা, ম্যাক্রো স্ট্যাবিলিটি এবং কাঠামোগত রূপান্তরের মাধ্যমেই শক্তিশালী হয়।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রেকমেন্ডেশন’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
গভর্নর বলেন, বৈশ্বিকভাবে বন্ড মার্কেটই সবচেয়ে বড়—প্রায় ১৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার। এরপর স্টক মার্কেট এবং মানি মার্কেট। অথচ বাংলাদেশে এই কাঠামো পুরোপুরি উল্টো—মানি মার্কেট সবচেয়ে বড়, স্টক মার্কেট মাঝামাঝি, আর বন্ড মার্কেট সবচেয়ে ছোট। এই কাঠামোগত দুর্বলতা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। এটি একটি বড় ব্যবসায়িক ও আর্থিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, বন্ড মার্কেটের ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ও কমিটমেন্ট। কোনো কোম্পানি যদি কুপন পেমেন্টে ব্যর্থ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সেটিকে ডিফল্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অতীতে ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমে দায় এড়িয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ভবিষ্যতে প্রসপেক্টাসে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে—জনস্বার্থ ছাড়া কোনো ব্যতিক্রম গ্রহণযোগ্য হবে না।
ব্যাংক নির্ভর অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করায় প্রকল্প ও ব্যাংক—দুই পক্ষই ঝুঁকিতে পড়ে। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে করপোরেট সেক্টরের অর্থায়নের একটি অংশকে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে এনে বন্ড মার্কেটমুখী করতে হবে। এজন্য বড় করপোরেটদের ক্ষেত্রে একক ঋণ সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে, যাতে তারা বন্ড মার্কেট বা বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি উৎসে যেতে উৎসাহিত হয়। বন্ড মার্কেট অটোমেটেড হলে খুব দ্রুতই এর আকার দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ছয় ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছাতে পারে। সরকার কথা ও কাজের মিল রাখতে পারলে ব্যাংক নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে।
ডিমান্ড সাইড শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, শক্তিশালী পেনশন ফান্ড ও ইনস্যুরেন্স খাত ছাড়া বন্ড মার্কেট টেকসই হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি পেনশন ব্যবস্থা মূলত নন-ফান্ডেড ‘পে-এজ-ইউ’ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর। নতুন সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ফান্ডেড পেনশন সিস্টেম চালু করা এবং বিদ্যমানদের গ্র্যান্ডফাদার করার মাধ্যমে একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শ্রেণি তৈরি করা সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, পাবলিক সেক্টর বন্ড মার্কেট শক্তিশালী না হলে প্রাইভেট সেক্টর বন্ড মার্কেট গড়ে ওঠে না। গত কয়েক বছরে সরকার নিয়মিত বন্ড ইস্যু ক্যালেন্ডার অনুসরণ করছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আর আগের মতো সব বন্ড কিনে নিচ্ছে না—এতে বাজারে ইতিবাচক সংকেত গেছে। তবে বাজারকে আরো গভীর ও লিকুইড করতে নীতিগত সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে।
সঞ্চয়পত্র বাজার প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র যদি ট্রেডেবল করা যায়, তাহলে বন্ড মার্কেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রযুক্তিগতভাবে এটি এখন সহজ এবং মূলত নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
গভর্নর বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ১৪–১৫ শতাংশ সুদের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড মার্কেট গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এক্সচেঞ্জ রেট, সুদের হার ও মূল্যস্ফীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে পারলে আগামী পাঁচ থেকে সাত কিংবা দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও ভাইব্রেন্ট বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম, সিটি ব্যাংক পিএলসি’র এমডি এন্ড সিইও মাসরুর আরেফিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ’র (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম,ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
Posted ০৫:৩৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com