নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ প্রিন্ট ৫৮ বার পঠিত
রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি শুধু একটি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সেবার মান, রোগী নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাজধানীর রমনা, মালিবাগ, মগবাজার এলাকার বাসিন্দাদের জন্য প্রসূতি ও নবজাতক সেবাদানকারী হাসপাতালগুলোর মধ্যে মনোয়ারা হাসপাতাল, হলি-ফ্যামিলি হাসপাতাল ও আদ-দ্বীন হাসপাতাল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক আদ-দ্বীন হাসপাতালের শিশু মৃত্যু ও লাইসেন্স বাতিল নিয়ে নতুন করে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেক অভিভাবক জানতে চাইছেন, অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে রোগী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেবার মান কতটা কার্যকরভাবে তদারকি করা হচ্ছে কি না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, সন্তান জন্মদান একটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সময় চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসকদের দক্ষতা এবং হাসপাতালের অবকাঠামোর ওপর পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হয়। ফলে কোনো হাসপাতালে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থায় প্রভাব ফেলে।
একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন, তারা এখন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে চিকিৎসা সুবিধা, নবজাতক পরিচর্যা ইউনিট, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে আগ্রহী হচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, হাসপাতালগুলোর উচিত তাদের সেবার মান, চিকিৎসা প্রটোকল এবং রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জনসাধারণকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে মনোয়ারা হাসপাতালের অবস্থান ও প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো দায়িত্বশীল প্রতিনিধি আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোহাম্মদ আরিফ হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার পিএস ফোনে জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যস্ত রয়েছেন এবং পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়। মনোয়ারা হাসপাতালের মত নামী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলা অনেকের কাছেই সন্দেহ সৃষ্টি করবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, এমন একটি সময়ে যখন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখা জরুরি, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য আসা প্রয়োজন ছিল।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ ও তদারকির আওতায় রয়েছে। হাসপাতালের অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জনবল, লাইসেন্স, রোগীসেবা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যেকোনো হাসপাতাল প্রয়োজন হলে যে কোনো সময় পরিদর্শনের আওতায় আনা যায়। নিয়মিত মনিটরিংয়ের পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতেও তদন্ত করা হয়। কোথাও অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বা রোগী নিরাপত্তার ঘাটতি পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু উন্নত অবকাঠামো বা প্রযুক্তি থাকলেই যথেষ্ট নয়; রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অভিযোগ বা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হলে দ্রুত তথ্য প্রদান এবং বাস্তব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্তব্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে অনেক গুজব ও বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব হয়। এতে রোগী ও তাদের পরিবারের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে।
এদিকে রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠান হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পক্ষ থেকে নবজাতক ও প্রসূতি সেবার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালটির উপপরিচালক (মেডিকেল) এ কে এম জিয়াউর রহমান জানান, অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের জন্য বিশেষভাবে সাজানো পুনরুদ্ধার কক্ষ রয়েছে। সেখানে চিকিৎসক ও নার্সদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করা হয়। তিনি বলেন, কোনো জটিলতা দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। নবজাতকদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক দলের সরাসরি তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা হয়। মায়েদের কাছে নেওয়ার আগে এবং পরে প্রশিক্ষিত নার্সরা নবজাতকদের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা দিয়ে থাকেন।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের আস্থা পুনর্গঠন। হাসপাতালগুলোর সেবার মান, রোগী নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি নিয়মিত সরকারি তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তারা মনে করেন, কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার অভিযোগ উপেক্ষা করাও সমানভাবে ক্ষতিকর। সঠিক তদন্ত, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব।
আদ-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা খাতে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত রোগী নিরাপত্তা, সেবার মান উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো গেলে পুরো স্বাস্থ্যখাতই উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নিরাপদ, মানসম্মত এবং স্বচ্ছ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
Posted ০৮:০১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com