নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬ প্রিন্ট ৪৮ বার পঠিত
দেশীয় ও বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশের বেসরকারিখাত প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে নাÑএমন মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। বৈশ্বিক সংঘাত, নতুন বাণিজ্য শুল্ক, অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জ্বালানি অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ সৃষ্টি করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোমবার (৯ মার্চ ২০২৬) রাজধানীর ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন, এসএসজিপি প্রকল্পের অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক এ.এইচ.এম. জাহাঙ্গীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন।
বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব: সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে তাসকীন আহমেদ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, এলডিসি উত্তরণ, মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, কৃষি ও শিল্পখাতের পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাত বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের শিল্পখাতেও পড়ছে।
এলডিসি উত্তরণ ও বাণিজ্য নীতি: ঢাকা চেম্বারের সভাপতি মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া যৌক্তিক হতে পারে। একই সঙ্গে বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করা, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনা জরুরি। প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো, ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ কমানো এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা সম্ভব।
মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতি: দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার হ্রাস, সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি পুনর্বিবেচনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেন। তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ ও অনশোর-অফশোর অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের প্রস্তুতির কথা জানালেন প্রতিমন্ত্রী: প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার সতর্ক রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অর্থনীতির সুফল যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায় সেটিই সরকারের মূল লক্ষ্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য বিকল্প পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
এসএসজিপি প্রকল্পের পরিচালক এ.এইচ.এম. জাহাঙ্গীর জানান, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতির ঝুঁকি: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। হঠাৎ সুদহার কমানো বা অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ অর্থনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, রাজস্ব আদায়ে অতিরিক্ত শুল্ক নির্ভরতা কমিয়ে কর কাঠামো সংস্কার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুরো কর ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, কৃষিখাত দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণের দিকে যাচ্ছে। তবে চাল উৎপাদন কম লাভজনক হয়ে পড়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। বাজেট, মুদ্রানীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
তৈরি পোশাক খাতের ঝুঁকি: বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্ক সুবিধা না থাকায় প্রতিযোগিতায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এজন্য দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে উদ্ভাবনী নীতি গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া সনদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারে মুক্ত আলোচনায় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজীব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
Posted ০৭:৫৭ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ ক্য
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ||||||
| ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ৭ | ৮ | |
| ৯ | ১০ | ১১ | ১ | ১৩ | ৪ | ১৫ |
| ১৬ | ১ | ৮ | ১৯ | ২০ | ২১ | ২২ |
| ২৩ | ২৪ | ২৫ | ২৬ | ২৭ | ২ | ৯ |
| ৩০ | ৩১ | |||||
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com