মঙ্গলবার ২৬ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x
নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি পুরস্কার দিতে পারে

আইডিআরএর অ্যাওয়ার্ড ঘিরে নানা বিতর্ক

শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬   প্রিন্ট   ১৩৩২ বার পঠিত

আইডিআরএর অ্যাওয়ার্ড ঘিরে নানা বিতর্ক

দেশের বীমা খাতের ১৩টি কোম্পানিকে ‘ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। তবে এই পুরস্কার প্রদানের পেছনে কোন ক্যাটাগরি ও কী ধরনের মূল্যায়ন মানদন্ড অনুসরণ করা হয়েছে-তা স্পষ্ট না হওয়ায় বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

এর পাশাপাশি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে-নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএর আদৌ কি কোনো কোম্পানিকে পুরস্কার দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে?

নিয়ন্ত্রকের মূল দায়িত্ব কী?

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী, আইডিআরএ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হচ্ছে বীমা ব্যবসার তত্ত্বাবধান, বীমা পলিসি গ্রাহক ও পলিসির অধীনে উপকারভোগীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বীমা শিল্পের নিয়মতান্ত্রিক উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ।
বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী আইডিআরএর প্রধান দায়িত্ব হলো-বীমা কোম্পানিগুলোর তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণ,আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করা, অনিয়ম, দুর্বলতা ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা মূলত বিচারক ও তদারকির, উৎসাহদাতা বা প্রশংসাকারীর নয়। বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে পুরস্কার প্রদান করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কারণ-আজ যাকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে, আগামীকাল সেই কোম্পানির বিরুদ্ধেই হয়তো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে নিয়ন্ত্রকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ক্ষুদ্র বা সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলো নিজেদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলতে পারে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি পুরস্কার দেয়, তাহলে সেটি এক ধরনের নৈতিক স্বীকৃতি হয়ে দাঁড়ায়, যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে দুর্বল করতে পারে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এবার যেসব কোম্পানিকে আইডিআরএ অ্যাওয়ার্ড দিতে যাচ্ছে এরমধ্যে এমনসব কোম্পানিও রয়েছে যারা বিভিন্ন সময়ে বীমা আইন ও বিধিমালা ভঙ্গ করে শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম আইডিআরএ তদন্তও করেছে। পুরস্কারের তালিকায় এমন কোম্পানিও রয়েছে যার প্রভিডেন্ড ফান্ডের কোটি কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে তছরুপ করা হয়।
ভালো কোম্পানিগুলোর কাজের মূল্যায়নের জন্য এই অ্যাওয়ার্ড দেয়া হচ্ছে আইডিআরএ এমন দাবি করলেও, অতীতে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যান পদে থাকা , অননুমোদিত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে এমন কোম্পানিকেও এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। এমনকি সম্পত্তি কেনায় অতিরিক্ত বিনিয়োগে আইন লঙ্ঘন করে আইডিআরএ’র তদন্তের মুখে পড়েছে এমন কোম্পানিও এই অ্যাওয়ার্ডের তালিকাভুক্ত হয়েছে।

আইনে কি পুরস্কারের কথা বলা আছে?

আইডিআরএ বা বীমা আইন বা সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বিধান নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে-এই উদ্যোগ কি নীতিগত সিদ্ধান্ত, নাকি প্রশাসনিক বিবেচনায় নেওয়া একটি কর্মসূচি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, “আইনে স্পষ্ট ভিত্তি ছাড়া এমন পুরস্কার ভবিষ্যতে আইনি ও নীতিগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।”

নিয়ন্ত্রকের পুরস্কার দেয়ার চর্চা নেই আন্তর্জাতিকভাবেও:
আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণত-নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো রেটিং দেয় না, পুরস্কার দেয় না বরং স্বচ্ছ রিপোর্ট, গ্রেডিং বা সতর্কতামূলক তালিকা প্রকাশ করে। পুরস্কার বা র‌্যাঙ্কিং সাধারণত দেয়-স্বাধীন রেটিং এজেন্সি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প সংগঠন। এমনকি ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কোনো ব্যাংককে পুরস্কৃত করার নজির নেই।
আইডিআরএর ব্যাখ্যার ঘাটতি

আইডিআরএ বলছে, বীমা খাতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি ও ভালো কোম্পানিগুলোর স্বীকৃতির লক্ষ্যে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত-বিস্তারিত ক্রাইটেরিয়া প্রকাশ হয়নি। সূচকভিত্তিক স্কোর জানানো হয়নি। কেন কোন কোম্পানি কোন স্থানে এসেছে-তার ব্যাখ্যা নেই।
ফলে উদ্যোগটি প্রশংসার চেয়ে বিতর্কই বেশি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান দায়িত্ব তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ। সেই অবস্থান থেকে সরাসরি পুরস্কার প্রদান করলে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। যদি ভালো পারফরম্যান্স স্বীকৃতি দিতেই হয়, তবে তা স্বাধীন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বা পূর্ণাঙ্গ, প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য মানদন্ডে হওয়াই শ্রেয়।

দেশি-বিদেশি, সরকারি-বেসরকারি ও ভিন্ন প্রজন্মের কোম্পানিকে এক কাতারে মূল্যায়ন কতটা যৌক্তিক?

নিয়ন্ত্রক সংস্থার পুরস্কার প্রদানের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে মূল্যায়নের কাঠামো ও শ্রেণিবিন্যাসের ঘাটতি।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশি-বিদেশি, সরকারি-বেসরকারি এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের বীমা কোম্পানিকে একই মানদন্ডে মূল্যায়ন করা হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে এক কাতারে আনা, বীমা খাতে কার্যরত বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর পুঁজি কাঠামো, রি-ইন্স্যুরেন্স সক্ষমতা, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দেশীয় অনেক কোম্পানির তুলনায় ভিন্ন ও অধিক শক্তিশালী। সেই বাস্তবতায় দেশি ও বিদেশি কোম্পানিকে একই ক্যাটাগরিতে মূল্যায়ন করা হলে ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই অসম প্রতিযোগিতার চিত্র তৈরি করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশ্ন উঠেছে বিদেশি কোম্পানির শাখা মেটলাইফকে নিয়েও। যে কোম্পানিটি দীর্ঘ দিনেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি, তাহলে এটি কীভাবে কর্পোরেট সুশাসনের শর্ত পূরণ করেছে, যে কারণে আইডিআরএ এটিকে পুরস্কৃত করছে।

সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির ভিন্ন বাস্তবতা:
সরকারি মালিকানাধীন বীমা কোম্পানিগুলোর রয়েছে-রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি, বড় বাজার কাভারেজ, নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক ব্যবসা।
অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাজার প্রতিযোগিতা ও ঝুঁকির ওপর নির্ভরশীল। এই ভিন্ন বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিকে একই সূচকে বিচার করায় পুরস্কারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেসরকারি নন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোকে একই কাতারে নিয়ে আসায়। যেখানে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি রিইন্স্যুরেন্স কোম্পানি হিসেবেও ব্যবসা করছে। দেশীয় অন্য কোম্পানিগুলো সেখানে রিইন্স্যুরেন্স করছে।

যে কোনো পুরস্কার প্রদানের আগে একটি বিচারিক প্যানেল বা জুরি বোর্ড গঠন করা হয়, এক্ষেত্রে আইডিআরএ সে ধরনের কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পুরস্কারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রজন্মভিত্তিক বিভাজন না থাকায় অসন্তোষ:
আপত্তি এসেছে প্রজন্মভিত্তিক মূল্যায়ন না থাকা নিয়ে। বীমা খাতে রয়েছে-
দ্বিতীয় প্রজন্মের (পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত) কোম্পানি, তৃতীয় প্রজন্মের, চতুর্থ প্রজন্মের (নতুন ও প্রযুক্তিনির্ভর) কোম্পানি।
নতুন প্রজন্মের কোম্পানিগুলো এখনো বাজার বিস্তার, ব্র্যান্ড তৈরি ও পোর্টফোলিও গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে কয়েক দশক পুরোনো কোম্পানির সঙ্গে একই স্কেলে মূল্যায়নকে অনেকেই অবাস্তব ও বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, “চতুর্থ প্রজন্মের একটি কোম্পানিকে যদি দ্বিতীয় প্রজন্মের কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে সেটি কখনোই সমান মাঠে খেলা হয় না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পুরস্কার দিতেই হয়, তাহলে অন্তত-দেশি ও বিদেশি কোম্পানির জন্য আলাদা ক্যাটাগরি সরকারি ও বেসরকারি আলাদা গ্রুপ, প্রজন্মভিত্তিক (২য়, ৩য়, ৪র্থ প্রজন্ম) শ্রেণিবিন্যাস থাকা উচিত ছিল। তা না হওয়ায় এই পুরস্কার অনেকের কাছে স্বীকৃতির বদলে বিভ্রান্তির কারণ হয়ে উঠেছে।

অংশীজনদের অনেকে বলছেন, এ ধরনের একটি অ্যাওয়ার্ড যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে দিতেই হতো, তাহলে আগে থেকেই পুরস্কার অর্জনের প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল। সে মামনদণ্ড অনুযায়ী কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনে কাজ কওে যেতে পারত।
এমনকি দেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে হঠাৎ কওে এ ধরনের উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা আনুকূল্য পাওয়ার দূরভিসন্ধি কি না সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।

অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান হবে অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত কোম্পানির টাকায়!

আইডিআরএ’র এই অ্যাওয়ার্ড প্রদানের বিষয়টি আরো বিতর্কিত হয়ে উঠেছে অ্যাওয়ার্ড ঘোষণার পর এক সভায় অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর টাকায় পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগে। সাম্প্রতিক ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান বাস্তবায়নের অর্থেও যোগান দিবে অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত কোম্পানিগুলোই। এমন খবরে এই অ্যাওয়ার্ড প্রদানে নিরপেক্ষতা এবং মানদন্ড নিয়ে আরো একবার প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।

 

Facebook Comments Box

Posted ০৮:৩৫ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com