সোমবার ১৫ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x
‘সাজানো এজিএম’ পরিচালনার অভিযোগ 

আর্থিক সংকটে ফিনিক্স ফাইন্যান্স     

বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫   প্রিন্ট   ২২৩ বার পঠিত

আর্থিক সংকটে ফিনিক্স ফাইন্যান্স     
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে এজিএমে (বার্ষিক সাধারণ সভা) অনিয়ম, বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দেওয়া এবং আর্থিক প্রতিবেদনে গুরুতর অসঙ্গতি আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন এক বিনিয়োগকারী। তার দাবি প্রতিষ্ঠানটি তথাকথিত সাজানো এজিএম আয়োজন করে ভুলে ভরা বার্ষিক প্রতিবেদন পাশ করিয়েছে। তবে এ অভিযোগের বাইরেও কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষনে দেখা যায় কোম্পানিটি নিয়মিত অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখ থেকে উত্তরণে আসতে পারছে না বরং আরও ধ্বসের দিকেই যাচ্ছে।
বিনিয়োগকারীর অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত ২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে আইডিইবি ভবনের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ফিনিক্স ফাইনান্সের এজিএমে বিনিয়োগকারীগণ উপস্থিত ছিলেন। একজন বিনিয়োগকারী বার্ষিক প্রতিবেদনের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন করার চেষ্টা করলে কোম্পানির কিছু কর্মকর্তা, কন্টাক্ট করা পক্ষের শেয়ারহোল্ডার এবং ভাড়া করা কিছু নন- শেয়ারহোল্ডার তাকে বাধা দেয়। এতে তিনি কোনো প্রশ্ন তুলতে বা আলোচনায় অংশ নিতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি লিখিতভাবে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর প্রশ্নপত্র জমা দিলেও দীর্ঘ সময়েও কোনো উত্তর পাননি। অভিযোগে বলা হয়, কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৪ অর্থবছরের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২৩৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, অথচ প্রতিবেদনে লস দেখানো হয়েছে ৮০৮ কোটি ২৩ লাখ টাকারও বেশি। এতে প্রভিশন হিসেবে দেখানো অর্থের হিসাবও প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে ভবিষ্যৎ ক্ষতির জন্য ৫০৪ কোটি টাকার বেশি সংস্থান করা হয় এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৫৭১ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয় যা প্রকৃত ক্ষতির চেয়ে বহুগুণ বেশি। এসব সংস্থান বাদ দিলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতে থাকার কথা থাকলেও প্রতিবেদনে তার কোনো উল্লেখ নেই।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন ১৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যার প্রায় ৪৯ শতাংশ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আমানত নেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৭১৮ কোটি টাকার বেশি, অথচ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকারও বেশি। বিনিয়োগকারীর প্রশ্ন- এই ঘাটতি পূরণের অর্থ কোথা থেকে এল এবং ১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকার প্রভিশন করার মতো তহবিলের উৎস কী?
বিনিয়োগকারী তার লিখিত অভিযোগে বলেছেন, ফিনিক্স ফাইনান্সসহ একাধিক কোম্পানি তথাকথিত “এজিএম পার্টি”র মাধ্যমে এজিএম পরিচালনা করেছে, যেখানে প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বা প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। এসব সভায় কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ভুলে ভরা প্রতিবেদন কোনো আলোচনা ছাড়াই পাশ করা হচ্ছে। ফলে কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আড়াল হয়ে যাচ্ছে এবং জবাবদিহিতা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিনিয়োগকারী বিএসইসির কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, ভাড়া করা লোক দিয়ে এজিএম আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং ফিনিক্স ফাইনান্সের অনিয়ম তদন্ত করে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নের উত্তর প্রদানের ব্যবস্থা করা হোক। তার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাধারণ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করে কেবল কিছু সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছে, যাদের মধ্যেই অনেকেই এজিএম অনিয়মে জড়িত।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সাজানো এজিএম এবং আর্থিক প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য উপস্থাপন বাজারে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করছে। যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আরও নিরুৎসাহিত হবে, যা সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করছে।
ফিনিক্স ফাইনান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:-এর আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোম্পানিটির বিনিয়োগ, টোটাল অ্যাসেট, ফিক্সড অ্যাসেট ও এফডিআর সব-ই কমেছে গত তিন বছরে। রিপোর্টে দেখা যায় ২০২৩ সালে কোম্পানির বিনিয়োগ ছিল ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা যা ২০২৪ সালে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে টোটাল অ্যাসেট ছিল ২ হাজার ৯১৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা কিন্তু ২০২৪ সালে তা কমে দাড়িয়েছে ২ হাজার ৭৫৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ফিক্সড অ্যাসেটের ক্ষেত্রেও নিয়মিত ধ্বস নেমেছে কোম্পানিটির। ২০২৩ সালে কোম্পানিটির ফিক্সড অ্যাসেট ছিল ৬৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকায়।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিনিক্স ফাইন্যান্সের মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৫৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যেখানে মোট দায় ৪ হাজার ১৮৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির ওপর দায় সম্পদের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি। এটি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এর ক্লাসিফায়েড বা শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ। প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের ৮৮.৬৬ শতাংশ এখন অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে যা দেশের যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনা করলে দেখা যায় বে লিজিংয়ের ৮০.৮৪ শতাংশ, ইসলামিক ফাইন্যান্সের ৫৮.৫৭ শতাংশ এবং প্রাইম ফাইন্যান্সের ৬০.২৯ শতাংশ ঋণ ক্লাসিফায়েড যেখানে ফিনিক্সের অবস্থান সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ফিনিক্স ফাইন্যান্স গত অর্থবছরে কর-পরবর্তী ক্ষতি দেখিয়েছে ৮০৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। একই সময়ে এর ইপিএস (ঊচঝ) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৮.৭৩ এবং এনএভি (ঘঅঠঝ) ঋণাত্মক ৮২.০১। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটি এখন নেতিবাচক ১ হাজার ৩৬০ কোটি ৩০ লাখ টাকা যা ইঙ্গিত করে যে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত মূলধন হারিয়ে ফেলেছে।
অন্যদিকে, মাইডাস ফাইন্যান্স বা প্রাইম ফাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে, যদিও তারাও সীমিত লাভ বা সামান্য ক্ষতির মুখে আছে। কিন্তু ফিনিক্স ফাইন্যান্সের আর্থিক অবস্থা অন্যদের তুলনায় বহুগুণে খারাপ। বিশেষত সম্পদ, আয় ও ঋণ পুনরুদ্ধারে ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে।
আর্থিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফিনিক্স ফাইন্যান্সের মূল সংকট হলো অকার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা ও দুর্বল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। বিগত বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি বড় পরিসরে লিজ ও অগ্রিম ঋণ প্রদান করলেও, সেগুলোর পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে লোনবুকের বেশিরভাগ অংশ এখন নন-পারফর্মিং অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের সুদ আয় মাত্র ৪৯.২০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণ বিতরণের অনুপাতে অত্যন্ত কম। অন্যদিকে খরচ ও সুদ দায় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, যার ফলে নিট ক্ষতি বাড়ছে।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিনিক্স ফাইন্যান্সের নেতিবাচক ইপিএস ও ইক্যুইটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করেছে। গত কয়েক বছরে কোম্পানিটি কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারেনি, ফলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা প্রায় সম্পূর্ণ ক্ষতির মুখে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রতিষ্ঠানটির জরুরি ভিত্তিতে পুনর্গঠন, মূলধন পুনঃবিনিয়োগ এবং অনাদায়ী ঋণ পুনরুদ্ধারে কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে কোম্পানিটি কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
ফিনিক্স ফাইন্যান্সের বর্তমান চিত্র পুরো আর্থিক খাতের জন্যও এক সতর্ক সংকেত যেখানে দুর্বল নজরদারি, অনাদায়ী ঋণ ও পুঁজির ঘাটতি একত্রে আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোম্পানির এমডিকে ফোনে পাওয়া যায়নি। জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক বছরে কোম্পানিটি কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারেনি
Facebook Comments Box

Posted ০৭:০২ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com